।। কাব্যের ডালিতে পূর্ণ কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সৃষ্টিরাজি ।
তারই মধ্য
থেকে ৩টি জনপ্রিয়তম কবিতা ।
কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী স্মরণে ।।
উলঙ্গ রাজা
সবাই দেখছে যে রাজা উলঙ্গ, তবুও
সবাই হাততালি দিচ্ছে ।
সবাই চেঁচিয়ে বলছে ; শাবাশ !
শাবাশ !
কারও মনে সংস্কার, কারও ভয় ;
কেউ-বা নিজের বুদ্ধি অন্য মানুষের
কাছে বন্ধক দিয়েছে ;
কেউ-বা পরান্নভোজী, কেউ
কৃপাপ্রার্থী, উমেদার, প্রবঞ্চক
;
কেউ ভাবছে, রাজবস্ত্র সত্যিই
অতীব সূক্ষ্ম, চোখে
পড়ছে না যদিও, তবু আছে,
অন্তত থাকাটা কিছু অসম্ভব নয়
।
গল্পটা সবাই জানে ।
কিন্তু সেই গল্পের ভেতরে
শুধুই প্রশস্তিবাক্য- উচ্চারক
কিছু
আপাদমস্তক ভিতু, ফন্দিবাজ অথবা
নির্বোধ
স্তাবক ছিল না ।
একটি শিশুও ছিল ।
সত্যবাদী, সরল, সাহসী একটি শিশু
।
নেমেছে গল্পের রাজা বাস্তবের
প্রকাশ্য রাস্তায় ।
আবার হাততালি উঠছে মুহুর্মুহু
;
জমে উঠেছে
স্তাবকবৃন্দের ভিড় ।
কিন্তু সেই শিশুটিকে আমি
ভিড়ের ভিতরে আজ কোথাও দেখছি না
।
শিশুটি কোথায় গেল ? কেউ কি কোথাও
তাঁকে কোনো
পাহাড়ের গোপন গুহায়
লুকিয়ে রেখেছে ?
নাকি সে পাথর-ঘাস-মাটি নিয়ে খেলতে
খেলতে
ঘুমিয়ে পড়েছে
কোনো দূর
নির্জন নদীর ধারে, কিম্বা কোনো
প্রান্তরের গাছের ছায়ায় ?
যাও, তাকে যেমন করেই হোক
খুঁজে আনো ।
সে এসে একবার এই উলঙ্গ রাজার
সামনে
নির্ভয়ে দাঁড়াক ।
সে এসে একবার এই হাততালির ঊর্ধ্বে
গলা তুলে
জিজ্ঞাসা করুক :
রাজা, তোর কাপড় কোথায় ?
(‘উলঙ্গ রাজা’ প্রকাশকাল; জুলাই,
১৯৭১ – কাব্যগ্রন্থ থেকে )
কলকাতার যিশু
লাল বাতির নিষেধ ছিল না,
তবুও ঝড়ের-বেগে-ধাবমান কলকাতা
শহর
অতর্কিতে থেমে গেল ;
ভয়ঙ্করভাবে টাল সামলে নিয়ে দাঁড়িয়ে
রইল
ট্যাকসি ও প্রাইভেট, টেম্পো,
বাঘমার্কা ডবলডেকার ।
‘গেল গেল’ আর্তনাদে রাস্তার দু’দিক
থেকে যারা
ছুটে এসেছিল –
ঝাঁকামুটে, ফিরিওয়ালা, দোকানি
ও খরিদ্দার –
এখন তারাও যেন স্থির চিত্রটির
মতো শিল্পীর ইজেলে
লগ্ন হয়ে আছে ।
স্তব্ধ হয়ে সবাই দেখছে,
টালমাটাল পায়ে
রাস্তার এক-পার থেকে অন্য-পারে
হেঁটে চলে যায়
সম্পূর্ণ উলঙ্গ এক শিশু ।
খানিক আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে চৌরঙ্গিপাড়ায়
।
এখন রোদ্দুর ফের অতি দীর্ঘ বল্লমের
মতো
মেঘের হৃদপিণ্ড ফুঁড়ে
নেমে আসছে ;
মায়াবী আলোয় ভাসছে কলকাতা শহর
।
স্টেটবাসের জানলায় মুখ রেখে
একবার আকাশ দেখি, একবার তোমাকে
।
ভিখারি-মায়ের শিশু,
কলকাতার যিশু,
সমস্ত ট্রাফিক তুমি মন্ত্রবলে থামিয়ে দিয়েছ ।
জনতার আর্তনাদ, অসহিষ্ণু ড্রাইভারের
দাঁতের ঘষটানি,
কিছুতে ভ্রূক্ষেপ নেই ;
দু’দিকে উদ্যত মৃত্যু, তুমি তার
মাঝখান দিয়ে
টলতে টলতে হেঁটে যাও ।
যেন মূর্ত মানবতা, সদ্য হাঁটতে
শেখার আনন্দে
সমগ্র বিশ্বকে তুমি পেতে চাও
হাতের মুঠোয় । যেন তাই
টালমাটাল পায়ে তুমি
পৃথিবীর এক-কিনার থেকে অন্য-কিনারে
চলেছ ।
(‘কলকাতার যিশু’ প্রকাশকাল; অগ্রহায়ণ,
১৩৭৬ – কাব্যগ্রন্থ থেকে )
অমলকান্তি
অমলকান্তি আমার বন্ধু,
ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম ।
রোজ দেরি করে ক্লাসে আসত, পড়া পারত না,
শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে
এমন অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে
থাকত যে,
দেখে ভারী কষ্ট হত আমাদের ।
আমরা কেউ মাস্টার হতে চেয়েছিলাম,
কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল ।
অমলকান্তি সে-সব কিছু হতে চায়নি
।
সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল !
ক্ষান্তবর্ষণ কাক-ডাকা বিকেলের
সেই লাজুক রোদ্দুর,
জাম আর জামরুলের পাতায়
যা নাকি অল্প-একটু হাসির মতন
লেগে থাকে ।
আমরা কেউ মাস্টার হয়েছি, কেউ
ডাক্তার, কেউ উকিল ।
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি
।
সে এখন অন্ধকার একটা ছাপাখানায়
কাজ করে ।
মাঝে-মাঝে আমার সঙ্গে দেখা করতে
আসে ;
চা খায়, এটা-ওটা গল্প করে, তারপর
বলে, “উঠি তা হলে ।”
আমি ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে
আসি ।
আমাদের মধ্যে যে এখন মাস্টারি
করে,
অনায়াসে সে ডাক্তার হতে পারত
;
যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল,
উকিল হলে তাঁর এমন কিছু ক্ষতি
হত না ।
অথচ, সকলেরই ইচ্ছেপূরণ হল, এক
অমলকান্তি ছাড়া ।
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি
।
সেই অমলকান্তি – রোদ্দুরের কথা
ভাবতে-ভাবতে
ভাবতে-ভাবতে
সে একদিন রোদ্দুর হয়ে যেতে চেয়েছিল
।
(‘অন্ধকার বারান্দা’ প্রকাশকাল;
চৈত্র, ১৩৬৭ – কাব্যগ্রন্থ থেকে )
গ্রন্থঋণ –ঃ ‘নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর
শ্রেষ্ঠ কবিতা’, দে’জ পাবলিশিং )

No comments:
Post a Comment