Friday, October 12, 2018


।। কাব্যের ডালিতে পূর্ণ কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সৃষ্টিরাজি ।
 তারই মধ্য থেকে ৩টি জনপ্রিয়তম কবিতা ।
 কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী স্মরণে ।।  



উলঙ্গ রাজা

সবাই দেখছে যে রাজা উলঙ্গ, তবুও
সবাই হাততালি দিচ্ছে ।
সবাই চেঁচিয়ে বলছে ; শাবাশ ! শাবাশ !
কারও মনে সংস্কার, কারও ভয় ;
কেউ-বা নিজের বুদ্ধি অন্য মানুষের কাছে বন্ধক দিয়েছে ;
কেউ-বা পরান্নভোজী, কেউ
কৃপাপ্রার্থী, উমেদার, প্রবঞ্চক ;
কেউ ভাবছে, রাজবস্ত্র সত্যিই অতীব সূক্ষ্ম, চোখে
পড়ছে না যদিও, তবু আছে,
অন্তত থাকাটা কিছু অসম্ভব নয় ।

গল্পটা সবাই জানে ।
কিন্তু সেই গল্পের ভেতরে
শুধুই প্রশস্তিবাক্য- উচ্চারক কিছু
আপাদমস্তক ভিতু, ফন্দিবাজ অথবা নির্বোধ
স্তাবক ছিল না ।
একটি শিশুও ছিল ।
সত্যবাদী, সরল, সাহসী একটি শিশু ।  

নেমেছে গল্পের রাজা বাস্তবের প্রকাশ্য রাস্তায় ।
আবার হাততালি উঠছে মুহুর্মুহু ;
জমে উঠেছে
স্তাবকবৃন্দের ভিড় ।
কিন্তু সেই শিশুটিকে আমি
ভিড়ের ভিতরে আজ কোথাও দেখছি না ।

শিশুটি কোথায় গেল ? কেউ কি কোথাও তাঁকে কোনো
পাহাড়ের গোপন গুহায়
লুকিয়ে রেখেছে ?
নাকি সে পাথর-ঘাস-মাটি নিয়ে খেলতে খেলতে
ঘুমিয়ে পড়েছে
কোনো দূর
নির্জন নদীর ধারে, কিম্বা কোনো প্রান্তরের গাছের ছায়ায় ?
যাও, তাকে যেমন করেই হোক
খুঁজে আনো ।
সে এসে একবার এই উলঙ্গ রাজার সামনে
নির্ভয়ে দাঁড়াক ।
সে এসে একবার এই হাততালির ঊর্ধ্বে গলা তুলে
জিজ্ঞাসা করুক :
রাজা, তোর কাপড় কোথায় ?

(‘উলঙ্গ রাজা’ প্রকাশকাল; জুলাই, ১৯৭১ – কাব্যগ্রন্থ থেকে )   



কলকাতার যিশু

লাল বাতির নিষেধ ছিল না,
তবুও ঝড়ের-বেগে-ধাবমান কলকাতা শহর
অতর্কিতে থেমে গেল ;
ভয়ঙ্করভাবে টাল সামলে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল
ট্যাকসি ও প্রাইভেট, টেম্পো, বাঘমার্কা ডবলডেকার ।
‘গেল গেল’ আর্তনাদে রাস্তার দু’দিক থেকে যারা
ছুটে এসেছিল –
ঝাঁকামুটে, ফিরিওয়ালা, দোকানি ও খরিদ্দার –
এখন তারাও যেন স্থির চিত্রটির মতো শিল্পীর ইজেলে
লগ্ন হয়ে আছে ।
স্তব্ধ হয়ে সবাই দেখছে,
টালমাটাল পায়ে
রাস্তার এক-পার থেকে অন্য-পারে হেঁটে চলে যায়
সম্পূর্ণ উলঙ্গ এক শিশু ।

খানিক আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে চৌরঙ্গিপাড়ায় ।
এখন রোদ্দুর ফের অতি দীর্ঘ বল্লমের মতো
মেঘের হৃদপিণ্ড ফুঁড়ে
নেমে আসছে ;
মায়াবী আলোয় ভাসছে কলকাতা শহর ।

স্টেটবাসের জানলায় মুখ রেখে
একবার আকাশ দেখি, একবার তোমাকে ।
ভিখারি-মায়ের শিশু,
কলকাতার যিশু,
 সমস্ত ট্রাফিক তুমি মন্ত্রবলে থামিয়ে দিয়েছ ।
জনতার আর্তনাদ, অসহিষ্ণু ড্রাইভারের দাঁতের ঘষটানি,
কিছুতে ভ্রূক্ষেপ নেই ;
দু’দিকে উদ্যত মৃত্যু, তুমি তার মাঝখান দিয়ে
টলতে টলতে হেঁটে যাও ।
যেন মূর্ত মানবতা, সদ্য হাঁটতে শেখার আনন্দে
সমগ্র বিশ্বকে তুমি পেতে চাও
হাতের মুঠোয় । যেন তাই
টালমাটাল পায়ে তুমি
পৃথিবীর এক-কিনার থেকে অন্য-কিনারে চলেছ ।

(‘কলকাতার যিশু’ প্রকাশকাল; অগ্রহায়ণ, ১৩৭৬ – কাব্যগ্রন্থ থেকে )



অমলকান্তি

অমলকান্তি আমার বন্ধু,
ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম ।
রোজ দেরি করে ক্লাসে  আসত, পড়া পারত না,
শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে
এমন অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকত যে,
দেখে ভারী কষ্ট হত আমাদের ।

আমরা কেউ মাস্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল ।
অমলকান্তি সে-সব কিছু হতে চায়নি ।
সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল !
ক্ষান্তবর্ষণ কাক-ডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর,
জাম আর জামরুলের পাতায়
যা নাকি অল্প-একটু হাসির মতন লেগে থাকে ।

আমরা কেউ মাস্টার হয়েছি, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল ।
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি ।
সে এখন অন্ধকার একটা ছাপাখানায় কাজ করে ।
মাঝে-মাঝে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে ;
চা খায়, এটা-ওটা গল্প করে, তারপর বলে, “উঠি তা হলে ।”
আমি ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি ।

আমাদের মধ্যে যে এখন মাস্টারি করে,
অনায়াসে সে ডাক্তার হতে পারত ;
যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল,
উকিল হলে তাঁর এমন কিছু ক্ষতি হত না ।
অথচ, সকলেরই ইচ্ছেপূরণ হল, এক অমলকান্তি ছাড়া ।

অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি ।
সেই অমলকান্তি – রোদ্দুরের কথা ভাবতে-ভাবতে
ভাবতে-ভাবতে
সে একদিন রোদ্দুর হয়ে যেতে চেয়েছিল ।

(‘অন্ধকার বারান্দা’ প্রকাশকাল; চৈত্র, ১৩৬৭ – কাব্যগ্রন্থ থেকে )

গ্রন্থঋণ –ঃ ‘নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর শ্রেষ্ঠ কবিতা’, দে’জ পাবলিশিং )  

No comments:

Post a Comment