Tuesday, January 8, 2019


নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী: টিনটিনের বাঙালি পরিচয়
অনন্যা দাশ 

“ছোটদের জন্যে না লিখলে হাত শুদ্ধ হয় না” বলতেন শ্রী নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। ভালোবাসতেন ছোটদের জন্যে লিখতে। দীর্ঘকাল আনন্দমেলা পত্রিকাটির সম্পাদনা করেছিলেন, সেই থেকেই হয়তো এই উপলব্ধি। লেখকদের মর্যাদা দিতেন তিনি। ভালো লেখার জন্যে লেখকের বাড়ি পর্যন্ত গিয়েও লেখা নিয়ে এসেছেন ।

বাঙ্গুরে নীরেনবাবুর বাড়ির পাশেই থাকতেন আমার পরিচিত একজন। নীরেনবাবুর মৃত্যুর খবরটা শুনে তিনি আক্ষেপ করে বললেন, “আহা খুব ভাল মানুষ ছিলেন, উনি আর ওঁর স্ত্রী দুজনেই! জানি অনেকেই ওই ওই কথা বলবে হয়তো কিন্তু আমি বলছি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ভীষণ সাদাসিধে ছিলেন দুজনেই। বোঝাই যেত না এত বড়ো নাম করা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আমার বাবার মৃত্যুর পর প্রচুর সাহায্য করেছিলেন আমাদের। সে কথা কোনদিনও ভুলব না। তখন ঘন ঘনই চলে যেটাম ওঁদের বাড়ি। আমি তখন শিশু, কমই বুঝি কিন্তু আমার ওই ভয়ঙ্কর ক্ষতির সময় নীরেনজেঠু আর ওঁর স্ত্রী ছিলেন আমার কাছে দুটো খুঁটির মতন। ওনাদের আঁকড়ে ধরে আমি মনে শান্তি পেইয়েছিলাম। স্বজনহারা এক শিশুকে যে ভাবে আপন করে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন ওঁরা দুজন তাই থেকেই বোঝা যায় যে ওঁদের মন কত নির্মল ছিল! তখন আমি কিছুই বুঝি না তেমন। জানতাম ওঁদের বাড়িটা আমার আবদারের জায়গা,। কিছু খেতে ইচ্ছে করলে ওঁদের ওখানে গিয়ে হাজিত হতাম। জেঠিমার কাছে আবদার করতাম এবং প্রম স্নেহে সেই সব রেঁধে খাওয়াতেন জেঠিমা। তখন অঁদের সাধারণ ভাল মানুষ বলেই মনে হয়েছিল আমার। সেই বয়সে বুঝতামও না কিছু! পরে জেনেছিলাম জেঠু তো সেলিব্রিটি! এখন মনে করি আর ভাবি কত স্নেহময় মানুষ ছিলেন দুজনেই। জেঠিমা তো আগেই চলে গেছেন আর এখন জেঠুও জেঠিমার কাছে চলে গেলেন!”

এবার আসি আমার কথায়। আনন্দমেলায় টিনটিনের কমিক্স থেকেই নীরেনবাবুর কাজের সঙ্গে আমার পরিচয়। দি অ্যাডোভেঞ্চার্স অফ টিনটিন ২৪টা কমিক বইয়ের একটা সিরিজ। বেলজিয়ামের এক কার্টুনিস্ট জর্জ রেই (যিনি হার্জে ছদ্মনামে লিখতেন) টিনটিনের চরিত্রটি গড়ে তোলেন। প্রথম প্রথম কমিকটি বের হত বেলজিয়ামের এক বিখ্যাত দৈনিক খবরের কাগজে এবং পরে বিশাল সফলতা পাওয়ার পর টিনটিন ম্যাগাজিন হিসেবে বেরতে থাকে। টিনটিন একজন খুব সাহসী সাংবাদিক এবং যাকে বলা হয় অ্যাডভেনচারার। নিজের কুকুর স্নোইকে (বেলজিয়ান নাম মাইলো) সঙ্গে করে নিয়ে সে সারা বিশ্বে (এবং মহাকাশে) নানা রকমের কীর্তি কলাপ করে বেড়ায়! সঙ্গে থাকে বদমেজাজিই ক্যাপটেন হ্যাডক, প্রচন্ড বুদ্ধিমান কিন্তু কানে কালা প্রোফেসার ক্যালকুলাস, দুই ভয়ঙ্কর অপটু গোয়েন্দা থমসন ও থম্পসন এবং (সু)গায়িকা বিয়াঙ্কা ক্যাস্টাফিয়োর! টিনিটিনের এই কমিক বিশ্বের সত্তরটির বেশি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। এবং বাংলায় টিনিটিনকে আমাদের খুব কাছের মানুষ করে তোলেন শ্রী নীরেন্দ্রনাথ।    

টিনটিনের বাংলা অনুবাদ ১৯৭০ সাল থেকে শুরু হয়। সেকালে আনন্দমেলায় টিনটিনের কমিক্স ধারাবাহিক ভাবে বের হত। হা পিত্যেস করে বসে থাকতাম আমরা সেই কমিক্সের পরবর্তি কিস্তির জন্যে। তখন আমরা অনেক ছট টিনটিন যে বেলজিয়ান সেই সব কিছুই জানি না। নীরেনবাবুর অনুবাদ এতটাই ঝরঝরে যে টিনটিন যে আদৌ বাঙালি নয় সেটা কোনদিন বুঝতেই পারিনি! এমনিতেও যার কুকুরের নাম কুট্টুস সে বাঙালি না হয়ে যায় নাকি! ক্যাপটেন হ্যাডক রেগে গেলে বা একটু বেশি মদ্যপান করে ফেললে ‘বেবুন, বেজি, বেল্লিক’ ইত্যাদি বলে চিৎকার করেন সেটাও খুব বিশ্বাসযোগ্য ছিল! নীরেনবাবুর অনুবাদ এতটাই সহজ সরল ছিল যে ছোটদের মনে গেঁথে যেত। আজো আমার বইয়ের তাকে টিনটিন সমগ্র শোভা পায় এবং মন খারাপ হলে আমি সেগুলোকে পড়তেই পছন্দ করি!

প্রোফেসার ক্যালকুলাস কানে কম শোনেন তাই তাঁর কথাগুলোকে অনুবাদ করা বেশ কঠিন কারণ হাসির উপকরণ অক্ষত রেখে অনুবাদ করতে হবে। যেমন ক্যালকুলাসের কান্ডে ক্যাপটেন হ্যাডক প্রোফেসারকে জিজ্ঞ্যেস করলেন, “দূরে কোথাও যাচ্ছ নাকি প্রোফেসার?” প্রোফেসার ক্যালকুলাস শুনে অম্লান বদনে উত্তর দিলেন, “না, না, দূরে যাচ্ছি”। তারপর স্লাই ফক্সকে চিকেন পক্স শোনাটা, বা স্টিকিং প্লাস্টারের হাতে হাতে ঘোরার মজা সব কিছুই আসলের মতন রয়ে গেছে। ঠিক একই রকম শক্ত ক্যাপটেন হ্যাডকের কথাগুলোকে অনুবাদ করা কারণ হাসির উপাদান বাদ পড়লে চলবে না মোটেই তাই বিস্তর মাথা খাটানোর প্রয়োজন ছিল ওগুলোর জন্যে।   

হার্জে বলেছিলেন যে দা ব্লু লোটাস থেকে তিনি অন্য দেশের লোকজন এবং তাদের হাব্বহাব পোশাকআশাকের প্রতি নজর দিতে শুরু করেন যাতে পাঠকরা সেই দেখগুলো সম্পর্কে কিছু জানতে পারে। আমরাও তাই নীলকমল থেকে চিনদেশের লোকজন এবং তাদের সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছিলাম নীরেনবাবুর অনুবাদের সুবাদে! লক্ষ লক্ষ বাঙালি ছেলেমেয়ে যে আজ টিনটিন ভক্ত তার জন্যে নীরনবাবুর অবদান অশেষ। একে একে আমেরিকায় টিনটিন, আশ্চর্য উল্কা, বিপ্লবীদের দঙ্গলে, বোম্বেটে জাহাজ, পান্না কোথায়, চাঁদে টিনটিন, চন্দ্রলোকে অভিযান ইত্যাদি টিনটিনের সব কটি বই অনুবাদ করে ফেলেন আমাদের মতন পাঠকদের জন্যে।  

অসম্ভব শুদ্ধ হাতে ছোটদের জন্যে যে সব অসংখ্য গল্প, ছড়া ইত্যাদি লিখেছেন নীরনবাবু সেগুলো চিরকাল বাঙালির সম্পদ হয়ে থাকবে। আর যতদিন বাঙালি টিনটিন পড়বে নীরেনবাবু বেঁচে থাকবেন ওই সাহসী রিপোর্টারের মধ্যে।  
টিনিটিন ছাড়াও নীরেনবাবুর ‘বাংলা কি লিখবেন কেন লিখবেন’ ও ‘কবিতার ক্লাস’ অসামান্য দুটি বই। লেখক ও ছড়াকারদের জন্যে অবশ্য পাঠ্য! 

১৯৭৪ সালে উলঙ্গ রাজা কবিতার বইটির জন্যে সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরষ্কার পেয়েছিলেন শ্রী নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।
তবে আমার পছন্দ ‘কিছু ধুলোবালি, কিছু ছাই’ কবিতার এই অংশটি
“চারিদিকে যত দেখি, তত এই চেনা
পৃথিবী অচেনা হতে থাকে।” 
না, লেখকের মৃত্যু হয় না।


                     

No comments:

Post a Comment