Sunday, April 30, 2023

কবিতা- নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

উড়াল



সোনার জলে চুবিয়ে তোলা 
মায়াবী রোদ্দুরে 
মেঘগুলো সব উড়ে বেড়ায় 
সারা আকাশ জুড়ে।

ঝড়বাদলে বন্দি থাকার 
দিন কেটেছে, তাই 
উড়াল দিচ্ছে কোটর থেকে 
পাখিরা সব্বাই।

অনেক পাখি, অঢেল পাখি, 
যায় না হাতে গোনা, 
শালিখ চড়ুই ময়না ফিঙে 
বুলবুলি চন্দনা।

আম্মি বলে, ‘নেই ডানা, তাই 
কেমন করে উড়ি ?
আয় বাবুয়া, আমরা ওড়াই 
রংবেরঙের ঘুড়ি।’


কৃতজ্ঞতা : 'আলোর ফুলকি'র অনুমতিক্রমে প্রকাশিত

কবিতা- পবিত্র সরকার

তখন খেলা, এখন খেলা


তোমরা মাতো ক্রিকেট নিয়ে,
আমরা ছিলাম গোল্লাছুটে, 
স্টেডিয়াম কী, আমরা গ্রামে
বল খেলেছি কাদায় লুটে।

দমের খেলা হা-ডু-ডুও,
সুযোগ ছিল না দুষ্টুমির।
খেলেছ কি দাঁড়িয়াবাঁধা ?
এক্কা-দোক্কা, কুমির-কুমির ?

এখন কোথায় পাশা খেলে
গ্রামের বুড়ো বটতলাতে ?
দুপুরবেলায় বউ-মেয়েরা 
কড়িখেলায় আর কি মাতে ?

ইশকুলের রাস্তাতে গেছ
টিনের কৌটো পায় লাথিয়ে ?
লাগিয়ে শিকে তারের চাকা
দৌড়েছ কি রাস্তা দিয়ে?

নৌকো নিয়ে খেলেছ বাইচ ?
পাটের খেতে লুকোচুরি ?
গোলোকধাম কি খেলেছ কেউ ?
দোল খেয়েছ বটের ঝুরির ?

যাচ্ছে মুছে খেলা অনেক,
থাকছে না গ্রাম, ছেলেবেলা ;
এখন শুধু রাজনীতি আর
দুর্নীতিরই চলছে খেলা।  

কবিতা- নির্মলেন্দু গুণ

আমরা জন্মের আগে যেখানে ছিলাম


মৃত্যুর ঠিক পূর্বমুহূর্তে প্রতিটি মানব-মানবীই একটা দৃশ্যকাব্য প্রত্যক্ষ করে-
যে-দৃশ্যকাব্য আমরা বহুবার কল্পনা করেছি। 
সমস্ত জীবনভর ভেবেছি, প্রকাশ করতে পারিনি। 

আমরা কি জানি না? জানি তো, জানি।
আমাদের জন্ম হয়নি কোনো দৈবদুর্বিপাকে।
জন্মের সে-উষালগ্নের কথা, কে মনে রাখে?

ঐ অনিবার্য, অনতিক্রম্য মিলনদৃশ্যটি
আমি জীবদ্দশায় কীভাবে দেখলাম?
আদৌ দেখলাম কি? 
আশা করি এই প্রশ্ন করে
আমাকে কেউ বিব্রত করবেন না। 
আপনার প্রশ্নের উত্তর আপনার কাছেই আছে।

তিনি আমাকে এও বলেছেন--
জন্মও সত্য নয়, মৃত্যুও সত্য নয়।
অথবা দুটোই সত্য।
আসল সত্য হলো এই--
আমরা জন্মের আগে যেখানে ছিলাম, 
মৃত্যু হলে পর আমরা ঠিক সেখানেই যাবো। 

কবিতা- অসীম সাহা

তোমাকে দেখার ছলে


তোমাকে দেখার ছলে যতোবার আকাশে তাকাই
ততোবার দিগন্তের মেঘ এসে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সম্মুখে।

শূন্য আকাশখানি নয় জানি মেঘেদের ঘর
হয়তো বা দূর কোনো দেশ থেকে করতে সফর
পর্যটক হয়ে তারা এসেছে এখানে
কিছুটা সময় পরে অন্য কোথাও তারা চলে যাবে
তবুও কিসের কথা আকাশের কানে কানে/
বলে যায় তারা,
আমার দৃষ্টিপথে অন্য কেউ দিয়ে যায় কেবলি পাহারা!
আমি তাই তোমাকে পাই না খুঁজে আকাশের বুকে
এই মন তবুও তোমাকে পেতে অন্য কোনো সুখে
দিনরাত ছুটে যায় দিগন্ত পার হয়ে অন্য কোনো দিগন্ত অবধি
পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও সোমেশ্বরী নদী
পার হয়ে অবশেষে এই চোখ খুঁজে পায় তোমার হৃদয়;
তুমি কি বোঝো না মেয়ে, বোঝে না কি গিরিশৃঙ্গ, স্নিগ্ধ হিমালয়?

লিমেরিক- তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

লিমেরিক


ওভারকোট চশমা চোখে মাথায় টুপি যার
হয়তো হবে জলদস্যু কিংবা ডাকাত আর 
মগের খুনে হতেও পারে 
এই না ভেবে বিলটু তারে
কলার ধরে টানতে দ্যাখে, এ তো অঙ্কস্যার!

ঘ্যাঙরঘ্যাং ঘ্যাঙরঘ্যাং ঘ্যাঙরঘ্যাং ঘ্যাং 
জুটল এসে ডোবার ধারে মাথায় তুলে ঠ্যাং 
বসল সবাই মজলিশে
হুল্লোড় আর গান-শিসে
নাচতে নাচতে এ ওর পায়ে মারল দেদার ল্যাং।

Saturday, April 29, 2023

কবিতা- ভবানীপ্রসাদ মজুমদার

কাদের তরে লিখছো দাদা?


কাদের তরেই লিখছো দাদা, লিখছো কাদের তরে?
ভোর-না-হতেই আঁধার নামে যাদের কুঁড়েঘরে! 
দুধের বাটি ছেড়েই যারা ক্ষুদের বাটি ধরে 
তারা কি আর কেউ কোনও দিন বইপত্তর পড়ে?

কাদের তরেই লিখছো দাদা, লিখছো কাদের তরে?
গাঁইতি-শাবল-কোদাল-কাঁধেই ফিরছে যারা ঘরে?
বুকের উপর সদাই যাদের বাঘের থাবা নড়ে
তারা কি আর কেউ কোনও দিন বইপত্তর পড়ে?

করছি মাথা হেঁট-গো দাদা, করছি মাথা হেঁটে
তোমার লেখায় ওদের কি আর ভরবে কারও পেট?
তোমার কেতাব রাজবাড়িতেই পাঠিয়ে দিও ভেট 
মিলবে খেতাব, মিলবে খাতির, বাড়বে খ্যাতির 'রেট'!

সত্যি ভীষণ জ্বালা দাদা, সত্যি ভীষণ জ্বালা 
ছড়ার মালা চায় না ওরা, চায় না ছড়ার মালা! 
রূপকথার ওই রাজমহলে ঝুলছে ক্ষুধার তালা 
ওদের চোখে স্বপ্ন আঁকে পাত্তা-ভাতের থালা !

পাঁচতলাতে নয়কো যারা গাছতলাতেই থাকে 
তোমার কলম তাদের গোপন ব্যথার কি খোঁজ রাখে?
ডুবছে যারা জটিল-জীবন চোরাবালির পাঁকে
তাদের চোখের জলে ক'জন চালচিত্তির আঁকে?

কবিতা- কৃষ্ণা বসু

ভূতের সংগে বন্ধুতা


ভূত দেখা যায় মধ্য রাতে বাগানবাড়ির দিকে,
অমাবস্যার নিবিড় রাতে ঘুম হয়েছে ফিকে । 
ফিকে ঘুমের মধ্য দিয়ে ভূতই বাজায় শিঙা,
ভূত-পেত্নি মধ্য রাতে নদীতে বায় ডিঙা।
ভূতের পিসি ভূতের মাসি ভূতেরি ভাইবোন-
ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ছে দখন করছে কোণ। 
কোণে কোণে ভূতের হাসি, ভূতের কান্না ঝরে,
ভূত যে কারুর বন্ধু সখা, ভূতকেই নাও ঘরে।

আপন করো বপন করো, বন্ধুতারই কাছে-
ফুল ফুটেছে ফল ধরেছে শাখার কাছে কাছে,
ভূতকে কেন ভয় পাবো গো? ভূতেরি হাত ধরবো,
ভূতের সংগে ভালোবাসার নতুন সেতু গড়বো। 
ভূতকে করবো অনুগত, ভূতের সেবাই নেবো,
যা চাইবে তাই, ভূতকে আমি জব্দ কোরেই দেবো। 
"ভূত বন্ধু" বলেই সবাই সন্মাননা দেবে,
আমি নকল আনুগত্য ভূত-বাবাজিই নেবে। 
ভূতকে যদি বশ করেছি শক্তি অনেক পাবো,
ভূতের দেশে ভূতের বাড়ি ভালোবেসেই যাবো।

কবিতা- রহীম শাহ

রংছবি


হঠাৎ আকাশে সূর্য উঠেছে খেপে
পৃথিবী পুড়িয়ে করবে সে ছারখার
আসবে না আর বৃষ্টিরা ঝেঁপে ঝেঁপে
করতে থাকুক মানুষেরা হাহাকার।

তোমরা মানো না-মানো
কারণও তোমরা জানো;
পৃথিবীর যত গাছপালা ছিল মানুষ নিয়েছে কেটে
এখন তাদের কষ্ট বাড়–ক তপ্ত বালুতে হেঁটে।

বৃষ্টি বলছে, ‘বাড়ি ফিরে যাই চল্,‘
পাখিরা বলছে বন্ধ আমার সুর,
মেঘেরা বলছে, ‘ঢালব না আর জল‘,
মানুষ দেখুক আগুন-সমুদ্দুর।

তোমরা মানো না-মানো
কারণও তোমরা জানো;
ভরাট করেছে যারা পৃথিবীর খালবিল জলাশয়
সজল মেঘের বৃষ্টির ধারা তাদের জন্য নয়।

মানুষ না হয় করেছে কিছুটা ভুল
তাই বলে তার এতটা কষ্ট পাওয়া?
কেন ফুটবে না বাগানে বাগানে ফুল
কেঁদে কেঁদে বলে রৌদ্রতপ্ত হাওয়া।

তোমরা মানো না-মানো
কারণও তোমরা জানো;
জলাশয় আর গাছপালা যদি না থাকে মাটির বুকে
মেঘবৃষ্টিরা কীভাবে থাকবে মানুষের সুখে-দুখে।

দু-একটা ফুল যা ছিল লতায় ঝুলে
তারাও পড়েছে তপ্ত মাটিতে টুপ
এসব হচ্ছে মানুষের মহাভুলে
এভাবে কদিন পৃথিবী থাকবে চুপ।

তোমরা মানো না-মানো
কারণও তোমরা জানো;
অল্প কিছুটা গাছ আছে বটে নেই পাতা, নেই লতা
দোয়েল শালিক মৌটুসি তাই বন্ধ করেছে কথা।

এভাবে মানুষ বাঁচতে কি পারে?
তা তো কোনোদিন নয়,
আকাশ বলছে, ‘মানুষেরা কেন
এত নিষ্ঠুর হয়!‘

আমি এসে বলি, ‘আমি পৃথিবীর কবি
এই দেখো এক কবিতা লিখেছি আজ।
যেখানে রয়েছে ফুল পাখি মেঘ রবি
যেখানে রয়েছে স্বপ্নের কারুকাজ।‘

একটি দোয়েল ছুটে এসে বলে, ‘দেখি!‘
কালো অক্ষরে পুরো কবিতাটি পড়ে-
এবার দোয়েল বলল, ‘তাই তো, এ কী!
তাড়াতাড়ি দাও রং করে রং করে।‘

এই কথা শুনে উঠে দাঁড়লেন শিল্পী হাশেম খান
এসে বললেন, ‘দাও দেখি কবিতাটি!‘
তারপর তিনি রংধনু রঙে অবিরাম এঁকে যান
ফুল পাখি গাছ নদী খালবিল মাটি।

এইসব দেখে সূর্য বলছে, ‘বেশ!
আয় মেঘ আয়, ছুটে আয় পৃথিবীতে
আবার বানাব স্বপ্ন-সবুজ দেশ
সবাই আসুক সুকোমল শ্বাস নিতে।’

এই কথা শুনে বৃষ্টি নামল জোরে
এই কথা শুনে মাটিও পেয়েছে প্রাণ
এই কথা শুনে নদীও হাসল ভোরে
এই কথা শুনে পাখিরা গাইল গান
এই কথা শুনে প্রজাপতি ফুল ছুঁল
এই কথা শুনে হেসে ওঠে নদীতীর
এই কথা শুনে গাছ লতাপাতাগুলো
শীতল বাতাসে কেঁপে ওঠে তিরতির।

কবিতা- হাসনাত আমজাদ

বৈশাখ 


বৈশাখে খরতাপ, চারদিকে রুক্ষ
চৈত্র তো রেখে গেছে কিছু ছাপ সুক্ষ
সকলের হাসি মুখ নেই কোনো দুঃখ
নতুনের আহবান, এইটাই মুখ্য।

শুভদিন, শুভমুখ নেই কোনো কান্না
দেশী ভাত, দেশী মাছ, হয়েছে যে রান্না
দেশী ভাত চেনো না কি ? সেতো ভাই পান্তা
বৈশাখী মেলাতে যে সকলেই খান তা ।

বৈশাখী মেলা মাসে বাঙালির পর্ব
এই দেশ, এই মাটি, আমাদের গর্ব
মেলা মানে হই চই গ্রামে আর গঞ্জে
মেলা মানে আমাদের মিলনের ক্ষণ যে ।

কবিতা- তরুণ মুখোপাধ্যায়

অগ্নি স্নানে


সীমাহীন পাপে ডুবে আছে দেশ, 
দেশের মানুষ। তাই এত রোদ, তাপ
তাই  এত খরা—


আকাশে মেঘের ডানা ভাসে না তো,
তৃষ্ণার জল বড়ই আকাল;
চারিদিকে ধ্বনি ওঠে : জল দাও, জল...


আমরা অশুচি আজ : নিষ্ফলা, নির্জল— 
হে বরুণ, হে ইন্দ্র 
অগ্নিস্নানে শুচি করো ধরা!

কবিতা- তৈমুর খান

সাক্ষাৎ
   
 
স্বপ্নে দেখা হোক তবে আমাদের
বাস্তব তো বড় অবাস্তব
চলে যাওয়ার রাস্তা দেখায় শুধু
রাস্তা তো ওই একটাই!

 খোলা দরজায় শুধু নিশি চলাচল করে
 রোজ সকালে ভাঙা সূর্য
 টুকরো মেঘের আড়ালে লুকিয়ে যায়
 অস্তিত্ব ক্ষয় হচ্ছে বলে
এইসব নিঃস্ব দিন একে একে পার হয়

 মৃত ডালিম-গাছের তলে
তোমার নিঃশ্বাসের শব্দ আজও 
                                খুঁজে ফিরি
 শরীরেও অশরীরী আলো
                 উপলব্ধির ঢেউ তোলে

 অবশেষে স্বপ্নের কাছে গিয়ে বসি
 তুমি এসে সমস্ত আড়াল মুছে দাও।

কবিতা- অমর চক্রবর্তী

মায়াবিন্যাস


আমাদের আকাশে মেঘ নেই, মেঘ দাও
অবিশ্বাসী ছায়ায় ডেকে যাচ্ছে সব পাখি
ডেকে ডেকে বলছে কাঠফাটা রোদ্দুর ফিরিয়ে নাও  
একটু লাজুক হও সূর্যসকাল

যত বলি ততই আলো গম্ভীর হয়, আইসক্রিমের দোকানের পাশ দিয়ে যেতে যেতে আলোর বোন একটা আইসক্রিমের আবদার জানায়
ওপরতলা থেকে পিতা সূর্য দেব
বৃক্ষের ফল দেখায়...

তখনই তাকে ঠিক চিনবে
অশ্রু থেকে যেদিন বৃক্ষ জন্ম নেবে
সেদিনই তাকে কাছে নেবে
যেদিন সে সো অহম ধ্বনিতে
তোমার হৃদয়কে বিশ্ববিদ্যালয় করে দেবে
শত ভাঙনের পরেও...

কবিতা- মিলনকান্তি বিশ্বাস

চরৈবেতি


গাছের মধ্যে বটের ছায়া
বড়োই আরাম দেয়, 
স্নেহের মধ্যে মায়ের স্নেহ 
বড়োই শান্তি দেয় ।

ভাষার মধ্যে মায়ের ভাষা 
বড়োই মধুর শোনায়, 
বন্ধুর মধ্যে প্রাণের বন্ধু 
বাঁচার রসদ জোগায়।

জলের মধ্যে বৃষ্টি ধারা 
প্রাণ জুড়িয়ে দেয়, 
গানের মধ্যে পাখির কূজন 
মন ভরিয়ে দেয়।

কবিতা- সুকুমার রুজ

বিবর্ণ বাতিদান অথবা পুরনো প্রেমপত্র 


আকাশ মেঘলা হলে সূর্যোদয় দেখা যায় না...  
প্রকৃতি সময়ের হাত ধরে হাঁটে,   
সূর্য ক্রমশ অক্ষাংশ, দ্রাঘিমা, গোলার্ধ পাল্টায়...   
ভগ্নাংশের হিসেব কষে আবহাওয়ার প্রকৃতি বোঝা যায় না। 

বিশ্বাস উদ্বায়ী হলে হৃদয় দেখা যায় না... 
সময় মৃত্যুর পথ ধরে হাঁটে,   
হৃদয় ক্রমশ অভিমান, দুঃখ কিংবা বেদনা পাল্টায়...  
আকাঙ্ক্ষার হিসেব কষে ভালোবাসার প্রকৃতি বোঝা যায় না।   

মেঘ ও সূর্যের মধ্যে কোনও সংঘাত নেই 
অথবা বিশ্বাসের সঙ্গে হৃদয়ের,     
তবুও বিবর্ণ বাতিদান নিজস্ব অস্তিত্ব বজায় রাখে,  
আর পুরনো প্রেমপত্র হাওয়ায় দুঃখ ভাসায়... 

আসলে, বিবর্ণ বাতিদান কিংবা পুরনো প্রেমপত্র 
কোনটাই সূর্যের অথবা হৃদয়ের প্রতিভূ হয়ে ওঠে না।  

কবিতা- সিদ্ধার্থ সিংহ

চিঠি



আজ এই পঁচিশে বৈশাখের দিন
আমি তোমাকে খোলাখুলিই জানিয়ে দিতে চাই
আমি এত দিন তোমাকে যা বলেছি, সব মিথ্যে
সব মিথ্যে সব মিথ্যে...
আসলে একজন নয়, আমার তিন জন প্রেমিকা
তিন-তিন জন
প্রথম জন অসম্ভব ভাল আবৃত্তি করে, তার নাম--- ম 
দ্বিতীয় জন দারুণ অণুগল্প লেখে, তার নাম ম
এবং তৃতীয় জন আমাকে পাগলের মতো ভালবাসে
তার নামও ম
এ বার তুমি ভেবে দ্যাখো, এই তিন জনকে টপকে
তুমি আসতে পারবে কি না
ভেবে দেখো... ভেবে দেখো... ভেবে দেখো ম...

কবিতা- অনীশ ঘোষ

এপিটাফ: শঙ্খ ঘোষ


কবিতায় লিখি পাপ ও পুণ্য
অক্ষরে রাখি জন্মের দোষ
যাপনমন্ত্র শিখিয়ে দিয়েছেন
আমার ঈশ্বর শঙ্খ ঘোষ।

লাল গোলাপের শ্রদ্ধা রেখেছি
তাঁর অবাক কবিতা-খাতায়
কবির বিবেক সদাজাগ্রত
অজস্র আলোয় পাতায় পাতায়।

ঘুমের দেশে পৌঁছেও জানি
পাঠাবেন তিনি স্বপ্ন-ছবি
তবু আমাদের মন ভালো নেই
চোখের জলে ভাসছেন কবি।

কবিতা- সুস্মেলী দত্ত

স্বীকারোক্তি



আগে ভাবতাম পাহাড় ঝরনা এখন সর্বনাশ
নিমেষে বাষ্প সার্বিক স্রোত কিম্বা জলোচ্ছাস

নদী হতে হতে নিংড়ে ভূগোল বিষন্ন সংক্ষেপে
চলে যায় রাই পাঁচ খেয়ালীর বৃষ্টি ব্যাপক ঝেঁপে

যুগের অতীত তার থেকে প্রিয় ক্রোমোজোম নাকি জিন
ধুৎ ভাবনারা বাতাসে মিলালো ফালতু অর্বাচীন...

নিষিক্ত ভ্রূণ সর্বনামেও এক চোখে চোখ রাখি
আকাশের নীল বাতাসি পাগল শরীর অচিন পাখি ।

কবিতা- অঞ্জনা সাহা

উদাসীন


বৃক্ষপ্রেমে থাকি বৃক্ষের খুব কাছাকাছি;
কিন্তু অধিক থাকি তার মনে-প্রাণে মিশে;
ইট-কাঠের এই কঠিন শহরে শুধুই বাতাসের দীর্ঘশ্বাস; 
প্রকৃতির হাহাকারে আমারও কান্না মিশে থাকে!
প্রতিকারহীন কতো স্বপ্ন মিশে যায় কঠিন মাটিতে-
মিশে যায় অসহায় বৃক্ষপ্রেম, ব্যর্থ অনুরাগে;
বৃক্ষের অভিমান আর কান্নায় পাতা ঝরে পড়ে।
তারও আছে আকণ্ঠ অভিমান- তাই সে তো কাঁদে।
হয়তো এ-মন জানে তার ব্যথা, কতোটা কান্না
মিশে থাকে প্রতিকারহীন পথের উদাসীন ধুলোয়।

আহা উদাসীন ধুলো, হা দীর্ঘশ্বাস, হা আকণ্ঠ অভিমান!

কবিতা- কালিদাস ভদ্র

মনে আসে


বেঞ্জামিন মলোয়েজের নাম মনে আসলে
ফাঁসির দড়ি
সযত্নে কবিতা পংক্তি সাজায়
শুদ্ধ করে প্রতিবাদী শব্দে আত্মচেতনা

নির্লোভ ফাঁসির মঞ্চ
গেয়ে ওঠে বিদ্রোহের গান
ক্ষুদিরাম ঋজু দাঁড়ান চোখে চোখ রেখে

শব্দের আগুনে বর্ণমালা
বিষাদ পুড়িয়ে লালন করে
নির্মোহ কবিতা

মানুষ আগুন জ্বালে
আগুন চেনে না মানুষ...

কবিতা- শুভদীপ রায়

প্রজাপতির মৃত্যু 


কোনো নীরব সন্ধেবেলা
দেখেছিলাম এক প্রজাপতি
তার নরম ডানায় আঁকা ছিল
এক আশ্বাসের ছবি, ঘর বাঁধার স্বপ্ন।
আমার ঊষর হৃদয়ে তখন চৈত্র তাপের খড়া।

তারপর আবার দেখি সেই প্রজাপতিকে
যখন সে তার মৃত খোলসের পাশেই সংসার পেতেছে।
আমার শরীরে তখন শীতের জড়ত্ব,
কুঁকড়ে যাওয়া চামড়ায় পুরাতন মলিনতা।

এরপর এল বসন্ত।
শরীরে ফুটেছে নতুন ফুল;
পুরনো কুঁকড়োনো চামড়ার স্থান নিয়েছে নতুন পরিপাটি বাকল।
আবার দেখি সেই প্রজাপতিটা;
সেদিন সে ফুলের মধু সংগ্রহে ব্যস্ত ছিল।
আর তার ডানায় ভর করেছিল একাকিত্বের বোঝা।

কবিতা- অমরেশ বিশ্বাস

মন খারাপ 


যাচ্ছি চলে অন্য কোথাও 
অন্য কোন পাড়া
আমরা ছিলাম এই পাড়াতে
অনেক বছর ভাড়া।

বলল বাবা, 'মাকে ডেকে 
গোছাও তাড়াতাড়ি 
বাড়িওয়ালা দিচ্ছে তাড়া
ছাড়তে হবে বাড়ি।'

অনেক করে বলল বাবা
বাড়িয়ে দেব ভাড়া
বাড়িওয়ালা দেয়নি তবু 
বাবার কথায় সাড়া।

বন্ধু তোদের ছেড়ে যেতে
হবে আমার তাই
এছাড়া তো অন্য কোন 
উপায়ও আর নাই।

সময় পেলে তোদের সাথে 
করব এসে দেখা
তোদের ছাড়া লাগবে আমার
ভীষণ একা একা।

অন্য পাড়ার ছেলেরা কি
খেলতে আমায় নেবে
মনটা খারাপ হচ্ছে আমার 
এই কথাটা ভেবে।

কবিতা- আশিসকুমার মুখোপাধ্যায়

হারানো বাংলা



রাত উজানো যাত্রাপালা
মা-ঠাকুমার ছড়া
পট, পটুয়া, রাইবেঁশে, সং
হারায় পরম্পরা ।

পানের বাটা, পান
ঘুমপাড়ানি গান
গরুর গাড়ি, পাল্কিতে বউ, 
এসব এখন Fun  ।

বোলান গিয়ে 'ব্যান্ড' এসেছে
'পপ' খেয়েছে কীর্তন 
ডারউইনের 'কারসাজি'তেই
এই নয়া বিবর্তন ? ?

কালের স্রোতেই হারিয়ে গেলো
ঢোল, সাথে তার ঢুলি
নববর্ষের খেরোর খাতা
পুজোর কোলাকুলি।

গানে সুরের গন্ধ নেই
ছড়া আছে, ছন্দ নেই
গাজন, চড়ক আছে বটে 
কিন্তু সে আনন্দ নেই।

কবিতা- তারাশংকর চক্রবর্তী

পিয়ালের বনে অচিন পাখি


হিজলের গাছে পিয়ালের পাখি ডাকছে,
ধানসিঁড়ি নদী পলাশের বনে
পাহাড়ের কোলে বাঁকছে;
মেঘের মাখন তারিয়ে তারিয়ে
রুপোলি ও চাঁদ চাখছে
হিজলের কাছে পিয়ালের পাখি ডাকছে ।
শুধু ডাকছে ।

যখন হরিণ বিতত বিরাগে
ছুটছিল একা একা
ফাল্গুনী প্রেমে গীতিময়তায়
তোমার সঙ্গে দেখা।

বার মাসে তেরো পার্বণে প্রিয়
তুমি তো আমার গর্বের !
অতি গর্বের !
না দেখার চোখে দেখি প্রতিদিন
প্রতিপলে প্রতি পর্বের !

তুমি তো কবির কলমিলতিকা
প্রতি ছন্দের ছত্রে,
তোমার শাড়ির চিহ্নিত সুতো 
শালপিয়ালির পত্রে !

পিয়ালের বনে অচিন পাখি
ডাকছে টিটির ! টিটির !
আমি তো পেয়েছি শামীমা শ্রাবণী
তোমার গন্ধ চিঠির ।

কবিতা- অসীম বিশ্বাস

কবিতার কোলাজ 


তুষার শৃঙ্গের ধবল অমৃত ধারায়
সৃষ্টি হয় কত শত নতুন কবিতার
দুরন্ত জলরাশি হয়ে ধাবমান হয় সৃজনশীলতার পথে

ধোপে টেকেনা কোথাও পেশীবহুল দানব পাথুরে বাধায়
শুভ্র ফেনিল জলরাশির দুরন্তপনায় -
সন্ধ্যা আরতির উজ্জ্বল আলোক প্রতিবিম্বিত হয়ে ওঠে!

ওপারে তখন এক ঝাঁক নগ্ন সন্ন্যাসী
কবিতার চিতাভস্ম লেপে সারা শরীরে ।

কত না কাব্যগ্রন্থ সৃষ্টি হয়
বহমান জলরাশির দুকুল ছাপিয়ে
কখনও আবার ব্যর্থ প্রেমের কবিতারা জলে ভাসে
রাত জাগা বাইজির গুমরানো কান্না হয়ে!

আমিও ভেসেছি ছ'টা বছর 
পতিতার শরীর বেয়ে কবিতার কোলাজ হয়ে 
আজ ভাসিয়ে দিলাম বাসি মালাখানি 
নতুন সৃষ্টির অন্বেষণে।

কবিতা- গোবিন্দ বিশ্বাস

খুনির  প্রতি 


আমাকে খুন করার মুহূর্তে 
যে কাজে আমি ডুবে ছিলাম 
সে তোমারই জন্য 

যদি পুনর্জন্ম ঘটে 
আমি তোমার কথা ভেবেই
আবারও ডুবে যাব কাজে... 

কারণ, আমি নিজেকে খুন করতে 
পারিনি কখনো।

কবিতা- উত্থানপদ বিজলী

কেবল রবিঠাকুর


রবিঠাকুর 
বুকের ভেতর বাদ্যি বাজে
রবিঠাকুর 
সুখের দিনে শত কাজে।

রবিঠাকুর 
দুখের রাতের যতো কালো
রবিঠাকুর 
তোমার গানে রাত পোহালো।

রবিঠাকুর 
আশার বাণী ছড়িয়ে দিলে
রবিঠাকুর 
ফুটল শালুক খালে বিলে ।

রবিঠাকুর 
আমরা সবাই তোমায় চিনি
রবিঠাকুর 
হৃদমাঝারের রিনিঝিনি ।

কবিতা- চৈতন্য দাশ

গাছ


ও দাঁড়িয়ে আছে
ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়
ওকে দাঁড়িয়ে থাকতেই হবে

ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সকল চলমানতার কাছে...
ঘুমোতে যাওয়ার আগে কাকে যে যেতে হয়
কত পথ তার হিসাব কে রাখে…
সবকিছু চলমান দিনরাত্রির মাঝে।

কবিতা- বিষ্ণুপদ বালা

এবলব্য

এখনো ঘরে ঘরে একলব্য
দ্রোণাচার্য্যের খপ্পরে;
বৃদ্ধাঙ্গুলী চলে যায় গুরুদক্ষিণায়!

খাঁচার ভিতর ঝিমুনো মুরগীর মতো
          অথচ-
কাস্তে-খোন্তা-শাবল-তীর বিশেষজ্ঞ...

সূর্যও ফিরিয়ে নেয় মুখখানা

পৃথিবীর তিনভাগই পাপ...

কবিতা- তুষারকান্তি সাহা

ইচ্ছের দাস

এই যে সাজানো আসবাব, বসন-ভূষণ
ইট বালি সিমেন্ট গ্রানাইট, রঙের দেয়াল
মায়ার সংসার সব আপন খেয়াল
কখন অজান্তে জেগে ওঠে ভোরে 

কারো ইচ্ছের দাস হয়ে অনিচ্ছায় চলে যাওয়া
কিংবা বাধ্যবালিকার মতো ফিরে আসা 
ছেড়ে যাওয়া আপন সেই বাসা...
ক্ষত নিয়ে, জলের দাগের ঘোরে 

আমি তো আসিনি আর, এসেছে অভ্যাস
আতিপাতি খুঁজে ফেরে গভীর ছায়ায়
মেঘ-বৃষ্টি-আলো-রোদ নিজের ইচ্ছায়
অচেনা উঠোনে মৃত গাছ-লতা-ফুলের বাহুডোরে 

কি জানি লুকিয়ে আছে যদি কোনো স্বপ্ন
কারো গোপন ইশারায়, মহাবৃক্ষতলে
একটিবার ভালোবাসায় কানে কানে বলে
এই শেষ, আর যেতে হবে না কখনো আমায় ছেড়ে।

কবিতা- সুখেন্দু মজুমদার

কথার কথা

কথাতে             উসকে দিয়ে
সহজে              যায় তাতানো,
সে কথা            বললে জানি
যায় না              ভাব পাতানো। 

কথায়               বাড়ছে কথা
দিব্যি                 কলকলিয়ে,
ছুটছে                কথার নদী
পাহাড়               যায় তলিয়ে।

চাই না               কথার কথা
গোপনে             দুঃখে ভরাক, 
দেখি তো           আঁধারটুকু 
পারলে              ঠেলে সরাক।

এই যে               শোনাও কথা
শুধুই                 ঝকমকানি, 
এবার                বলছি শোনো
থামাও               বকবকানি।

কবিতা- মোঃ আশতাব হোসেন

বাংলা নববর্ষ 


পান্তা ভাতে ইলিশ ভাজা 
হলদে রাঙা জামা পরে, 
উৎসব হবে নববর্ষের 
বাংলাজুড়ে ঘরে ঘরে। 

শিল্পীগণের সঙ্গীত সুরে 
লালনগীতি একতারাতে,
রমনা পার্ক বকুল তলে
এলো বৈশাখ নাচ-গান সাথে। 

এবার বাংলায় অপরূপ সাজ
সৌরভ দিচ্ছে চারদিক পানে,
জারি সারি কবি গানে
শহর বন্দর সকলখানে।

কবিতা- দীপঙ্কর বিশ্বাস

অচিন্ত্য প্রকাশ হোক...



এবার আমায় ঘুমাতে দাও নিশ্চিন্তে কবরে।

দীর্ঘদিনের জমানো স্মৃতিগুলো রেখে দাও,
কত কথা, কত মান অভিমান,
সুখ-দুঃখের বাগিচায় ফোটা রঙিন স্বপ্ন!
রেখে দাও কিছু আপন মণিকোঠায়।
এক নিমেষে মুছে ফেলো না সবটুকু,
দাফনের শেষ জিয়ারত হতে হতে।

কিছুটা হলেও মনে গেঁথে যাক,
আমৃত্যু জমে উঠুক পাথরের মতো;
হৃদয়ে গড়ে দিক এক অভেদ্য প্রাচীর।

যখন একাকিত্ব যাপন করবে
ভালোবাসার মানুষের জন্য,
নিজের মনে কিছু ভাববে, বলবে, গাইবে,
সেই উন্মাদ কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হবে
ওই আপন প্রাচীর থেকে;
তোমার একাকিত্ব দূর হবে এক লহমায়।

অচিন্ত্য প্রকাশ হোক তোমার
হোক শিষ্ট জীবনের স্রোত। 

এবার আমায় ঘুমাতে দাও নিশ্চিন্তে কবরে। 

কবিতা- ভীষ্মদেব সূত্রধর

এক ছিপি বীষ বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া


এরকম একটি নিঃস্তব্ধ রাত্রিতে
খুব অস্থির একটি সময়ে জানালার কাচ বেয়ে নেমে আসে হলদে পোকার দল,
পেছনে ফেলে আসে লহরীর বিদ্রুপাত্মক ভাষা।
অসময়েই যেন নিয়ে গেছে তাজা হৃদপিন্ডের ভেতরের গপ্প
নিয়ে গেছে সমস্ত বিকেলের পেয়ালার চা..
নিয়ে গেছে অলস দুপুরে নিপুণ সন্ধিতা।
যদি নিত জীবনের ক্লেদ মাখা অফুরন্ত সময়, জঞ্জাল, স্তুপের উপর আরো কতক অসম্পৃক্ত তেষ্ঠা!
কিংবা ওষ্ঠের ব্রীজে চুবিয়ে রাখতো দীঘল চুরুট
ছাইপাস গদগদ করে গিলে খাচ্ছি, শুধু একটি রঙিন নখের বর্বরতার জন্যে।
হলদে পোকারারা আছড়ে পড়ছে দ্বিতল থেকে মাটিতে
যেন একে একে আত্মহত্যা করছে ভীষণ প্রতীক্ষার পর
প্রতিজ্ঞার স্বার্থে..
কোথাও একটি কাকের কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই, শেয়ালের, গৃহকর্তার পালিত কুকুরের,
আমি আমার শব্দের ভিতরে ক্রোধিত ক্রন্দন
ধ্বনিকে আত্মহত্যায় সঁপে দিই
এক ছিপি তীব্র বীষ
নীল করে সমগ্র শরীর,
ধ্বংস স্তুপে গড়ে ওঠে আরেকটি জীবন বিধ্বংসী।

Friday, April 28, 2023

কবিতা- স্বপন চক্রবর্তী

স্বাগত নববর্ষ


চোদ্দোশো ত্রিশ এসো
স্বাগত জানাই
এ বছরটি যেন সবে
ভালোভাবে পাই।

আসুক সবার প্রাণে
চেতনার আলো
নববর্ষ সকলের 
কাটে যেন ভালো।
 
দূর হোক মন থেকে
ক্ষোভ-দ্বেষ-ক্রোধ
দাও সংস্কৃতি-মন 
দাও শুভ বোধ।

ঘুচে যাক গ্লানি যত
দুঃখ-অমানিশা
নববর্ষে পাই যেন
নতুনের দিশা।

কবিতা- শিবরাম বিশ্বাস

মানুষ প্রসব করে যন্ত্রণা


মানুষ প্রসব করে যন্ত্রনাণা !
স্থির থাকতে পারে না 
যেভাবে পদ্মপাতায় টলমল করে জল।

অস্থির সময় ঢেউ খেলে যায় 
ঢেউয়ের দোলায় দুলে ওঠে এলোমেলো হাওয়া  
চারিদিকে বরফের মতো জমে যায় নিস্তব্ধতা।

নিরুপায় শিশু মায়ের কোলে বসে বসে দেখে 
লেলিহান আগুনে পুড়ে যাচ্ছে বাংলার মুখ!

এই শূন্যতা মাঝে...
মানুষ প্রসব করে যন্ত্রণা !
আমিও দেখেছি শ্মশানে চিতায় পুড়ে ছাই হতে
নিজের কাঁধে বয়ে নিয়ে আসা নিজের শব। 

অণুগল্প- স্বাগতা ভট্টাচার্য

উত্তরণের পথে



এই টুলু খেলা করছিস,স্কুলে যাসনি আজ? না দিদি পাশের বাড়িতে নেমন্তন্ন আছে যে। আজ অনুষ্ঠান? কীসের?  কৌতুহল বশত পা বাড়ালাম দত্ত বাড়ির দিকে। বাড়ি ঢুকেই দেখলাম উঠোনে ছাদনাতলা। আত্মীয় স্বজনে বাড়ি ভর্তি। তা হলে বিয়ে বাড়ি! কার বিয়ে! একটা ঘর থেকে বেরিয়ে এলো টুম্পা। নাইনে পড়ে। পরনে হলদে শাড়ি। আমার বুঝতে আর কিছু বাকি থাকলো না। মুহুর্তের মধ্যে সতেরো বছর আগের স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠল। টুম্পাকে কিছু না বলে আমি ওর বাবা মাকে একটা ঘরে ডেকে নিলাম। কয়েকজন আত্মীয় স্বজনও ভিড় করল। এত কম বয়সে বিয়েটা না দেবার জন্য অনুরোধ করলাম।
বিফল হয়ে বাইরে এসে ফোনটা করেই ফেললাম।  এরপর যা করার প্রশাসন করবে। 


মে মাসের মস্ত দুপুর গড়িয়ে কখন যে সন্ধে নেমেছে আজ টের পাইনি। দরজায় পায়ের শব্দে ঘোর কাটলে পিছন ফিরে দেখি টুম্পা আর ওর মা পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকছে। বুঝলাম বিয়েটা হয়নি। আমি টুম্পার মায়ের কটু কথা শোনার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করলাম। ছুটে এসে ওর মা আমার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলল- আপনার জন্য আমার মেয়েটা বেঁচে গেল দিদিমণি। মনে পড়ে গেল সে দিন স্কুলের লীলা দিদিমনিও  আমার বিয়েটা না আটকালে আজ কেন্দুয়াডিহি গ্রামের স্কুলটার দিদিমনি হয়ে আসা আমারও হতো না।

কবিতা- বিদ্যুৎ মিশ্র

একটা নদী 


আঁকন বাঁকন একটা নদী  
বইছে গাঁয়ের পাশে, 
ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের সারি  
খিলখিলিয়ে হাসে।

রাতেরবেলা হাজার তারা 
নদীর জলে খেলে, 
পূর্ণিমার ওই চাঁদের আলো 
তখন দেখা মেলে।

নদীর ওপর একটা সাঁকো 
সেই রয়েছে রাখা, 
ছোট্টবেলার স্মৃতিগুলো 
আজও সোহাগ মাখা।

আঁকন বাঁকন নদীর কথা 
আজও মনে ভাসে, 
ছোট্টবেলার স্মৃতিগুলো 
আমায় দেখে হাসে।

কবিতা- স্বপন কুণ্ডু

মনের কথা


মুখে তো জোগায় না ভাষা বক্তা আমি নই,
আমি কেবল কলম দিয়ে মনের কথা কই।

অন্য জনের মনের কথা নিজের মতো লিখি,
ভিন্ন মনে ভিন্ন স্বাদে সমাজটাকে দেখি।

কল্পনাতে ফোটাই যে ফুল সত্য নয়তো মোটে,
দারিদ্রতার কান্না এসে পাষানে মাথা খোঁটে।

ধর্ম আছে কর্ম তো নাই, নাই রাজত্বে থাকি,
হতাশাকে লুকিয়ে রেখে ভগবানকে ডাকি।

মাংসাশী সব শেয়াল কুকুর দাঁত খিঁচিয়ে আসে,
হাড় ক'খানা আড় করে দিই যমদূতদের পাশে।

শক্ত দাঁতে চিবায় যে হাড় নরম বিছানায়,
আমার কলম সেই শব্দেই বাঁচার গান শোনায়।

কবিতা- শুভশ্রী রায়

প্রকৃতি পাঠ

টলটলে পুকুর তাতে ঝলমল খেলছে সোনা রোদ,
পাঠশালায় যাব না, হয়ে গিয়েছে অক্ষরের বোধ।
আজ সারাদিন দেখব জল-আলোর হাজার খেলা,
ক্রমে দুপুরের পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে বেলা।
মাগো, মূর্খ বলে বদনাম আমার রটুক দিকে দিকে,
তবু পড়বই আজ গ্রামবাংলার পরমাপ্রকৃতিকে।

যারা অনেক বিদ্যা শেখার জন্য জন্মেছে, শিখুক,
শেলেট ভরে ভরে অক্ষর ও সংখ্যার জাল লিখুক।
একটা বেলা পড়ার থেকে দাও না আমায় ছুটি!
বেলা যে যায়, বাইরে সোনারোদ হেসেই কুটিকুটি,
কি এমন ক্ষতি, একটা দিন পাঠশালে না গেলে?
তুমি মা, তেমন আমি গ্রামীণ মাটিরও তো ছেলে।

কবিতা- নূরুল ইসলাম

আকাশ ভরা তারা


সাঁঝের পরে দেখতে আকাশ
ব্যস্ত যখন মন,
ঘন্টা খানেক হারিয়ে গেল
পড়া-পড়ার ক্ষণ ।

পাহাড় ঘেঁষা আধফালি চাঁদ
জাগায় মনে সারা,
মিটি-মিটি বলছে কথা
আকাশ ভরা তারা।

বিস্ময়ে আজ হৃদয় মাঝে
ইচ্ছে নদীর ধারা,
দিগন্তরেখা ছুঁয়ে আছে
আকাশ ভরা তারা।

ঘুম জড়ানো ভোর আকাশে
ঊষার লগন শুরু,
আকাশ ভরা তারার জন্যে
বুক করে দুরু-দুরু।

শিশির ভরা ঘাসের মাঠে
চোখ মেলতেই ধরা,
রাত আকাশে ছড়িয়ে থাকা
আকাশ ভরা তারা।

কবিতা- প্রবীররঞ্জন মণ্ডল

স্বাধীনতার মানে

ওই যে বালক মাঠের মাঝে গরুর বাথান আনে
বলদ জুড়ে ওই যে চাষী লাঙল খানা টানে
ভাটিয়ালি সুরে মাঝি ভরিয়ে রাখে গানে 
তেমন করে কেউ কী জানে? স্বাধীনতার মানে?

যে মেয়েটি পাথর ভাঙে মাঠের কাজে থাকে 
কাপ পেয়ালায় যে ছেলেটি নরম হাতটি রাখে 
অন্ধমানুষ ফুটপাতেতে ভরিয়ে রাখে গানে
তেমন করে কেউ কী জানে? স্বাধীনতার মানে?

নিষেধ গলির ওই পথেতে যে মেয়েটি হাঁটে
ভিক্ষাঝুলি নিয়ে যাদের সবার দ্বারে কাটে 
ফসল ফলায় ওই যে মাঠে যারা মাটির টানে 
তেমন করে কেউ কী জানে? স্বাধীনতার মানে? 

যে ছেলেটি বেকার এখন কাজের আশায় ছোটে 
যে মেয়েটি কাজের আশায় রাখছে হাসি ঠোঁটে 
অন্ধগলির পাঁকে পড়ে যারা নেশার টানে 
তেমন করে কেউ কী জানে? স্বাধীনতার মানে?

কবিতা- দিলীপ পাল

ও মেয়ে


ও মেয়ে
তোর মিষ্টি মুখের আদল হাসি
দেখেই আমি -
হাজার বছর হাঁটতে পারি  
তোর চোখের তারায় মৃদুল মেলায় 
সাঁওতালি বন মন যে নাচায় 
যাই হারিয়ে নদীর সীমায়  । 
তোর ফাগুন বুকের আগুন নিয়ে
তপ্ত রোদে রাঙিয়ে তুলি 
আমের মুকুল কুসুম কলি 
পলাশ শিমুল তাকেও বলি। 

ও মেয়ে তুই এমনি করে 
ক্যাকটাসের ওই শরীর থেকে 
সবুজ নিয়ে আমায় দিলি 
তাতেই ভুলে পাগল হয়ে 
হাত দিতে যাই কাঁটার গায়ে 
লাজুক ছোঁয়া মাটির পায়ে 
লজ্জাবতী যাস হারিয়ে 
পাগলপারায় আমন ধানে 
শীষের ডগায় তোকেই ছুঁয়ে
যাই হেঁটে যাই অনেক দূরে ।

কবিতা- শফিউল্লাহ নান্নু

ইচ্ছে শামুক


ইচ্ছে করে সামাজিক শামুক হই
চষে বেড়াই মানুষের দুয়ারে দুয়ারে 
কেটে-কুটে খেয়ে ধ্বংস করি মানুষের ভেতরের মানুষ।

ইচ্ছে করে রাষ্ট্রীয় শামুক হই 
বৈষম্য ও নাগরিক পাপের মুখে ত্যাগ করি শামুকবিষ্ঠা
দুর্নীতির পত্র-পল্লব ছেঁটে ছেঁটে খাই...

ইচ্ছে করে বারুদ শামুক হই 
আচমকা ফেটে ধূলিসাৎ করি অহংকার, হিংসার প্রাচীর 
একাকার করি রাজনৈতিক বিরোধ, জুলুম, স্বৈরাচার। 

ইচ্ছে করে রোজ সূর্য শামুক হই
ভূতের ছায়া গিলে আঁধার মাড়িয়ে আনি নতুন ভোর—লাল-সবুজের স্বপ্ন-রঙিন সূর্যোদয়...

কবিতা- সুব্রত চৌধুরী

খুশির ডানা মেলে


নতুন দিনের সুরুজ মামা
যখন মারে উঁকি
সবার মনে খুশির ঝরনা
সুখের আঁকিবুকি।

হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে আসা
নববর্ষের গানে
খুশির খেয়ায় যায় ভেসে যায়
সৃষ্টি সুখের বানে।

নববর্ষের সুবাস ছড়ায় 
ফুটে থাকা রঙ্গন
খুশির সিকি ঝিকিমিকি 
যায় ভেসে যায় অঙ্গন।

নববর্ষের আলোকছটা
ঘরে ঘরে আজ
সবার গায়ে পায় যে শোভা
রংগীন জামার সাজ।

নববর্ষে সব ভেদাভেদ
দু’পায়েতে ঠেলে
সাম্যের গানে মাতে সবাই 
খুশির ডানা মেলে।

কবিতা- বাপন হাজরা

মানসী
                      

বৈদিক যুগের এক অব্রাহ্মণ ঋষি 
তোমার ভিতরে পূর্বমুখী পদ্মাসনে 
তোমার ভিতরের মানসীকে দেখতে
সহস্র বছর ধরে ধ্যানমগ্ন তপস্যায় ।

একবিংশ শতকে চোখ খুলে দেখি 
হৃৎপিন্ডের রক্ত তৈরীর উদ্দামতা 
ফুসফুসে বায়ু চলাচলের চঞ্চলতা,
রক্ত -মাংসের গন্ধে অস্থির হয়ে উঠি ।

ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি
তুমি আজ অনেক দূরে কিংবা কল্পনায় 
বাইরে থেকে মানুষের চোখে ভিতর দেখি
ভিতরের মানসীর প্রতি ভালোবাসা জন্মায় ।

কবিতা- রুচিরা দাস

হাত 

 
একটা ভীষণ উত্তাপ ছিল তোমার হাতে।
হাতের ওপর রাখলে
আমি পোড়া গন্ধ পেতাম।
মাংস পোড়ার গন্ধ।
যেমন পেয়েছি শ্মশানে। অথবা উদ্দাম পার্টিতে।
আমার মাংস গলে গলে পড়তো রাস্তায়।
কংকাল বেরিয়ে আসত। 
কঠিন এবং সাদা।
তুমি শক্ত করে চেপে ধরেছিলে সেই হাত।
সেই হাড়।
ধোঁয়ার সঙ্গে স্পর্শ মিশলে-
তৈরি হত শিরদাঁড়া।
  
এখন আবার মাংস লেগেছে হাতে,
যেন অতি সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচার ।
সরীসৃপের  ঠান্ডা রক্তে অসার এই শরীর।
হাতের সাথে হাতের আর তফাৎ পাইনা কোনো।

কবিতা- সুমন্ত কুন্ডু

একদিন


কলের পুতুলের মতো দম দিয়ে
কে যেন ছেড়ে দিয়েছে ওকে ।
পাথর ভেঙে ভেঙে, পথ কেটে কেটে
ও পাহাড় চূড়ায় উঠছে।
উঠেই যাচ্ছে ক্রমশ – 
উঁচু থেকে আরও উচ্চতম শৃঙ্গে
তারপর – 
সর্বোচ্চ অতিক্রম করলেই পথ শেষ,
ওখান থেকে ঝাঁপিয়ে পড়বে গভীর খাদে,
নিম্নতম উপত্যকায় ! 

ভালোবাসি বললে এখনও কয়েকটা দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।
সংসার করতে করতে আমরা ভালোবাসি বলতে ভুলে যাই।
কলের পুতুলের মতো দম দেওয়া মানুষটা
পাহাড়ের চূড়া থেকে খাদে পড়তে পড়তে
একদিন অবুঝ সত্যিটা বুঝে যাবে ।

কবিতা- বিপ্লব ঠাকুর

নৌকার বিলে চিরায়ত সন্ধ্যা


দল ঘাসের সলতে দিয়ে মাটির প্রদীপ জ্বালাই! 
চিরায়ত সন্ধ্যা নামে নৌকোর বিলে,
তুলসী মঞ্চে, বাঁশ ঝাড়ে, গাব গাছে, পাখির বাসায়... 
পাক..পাক.. হাঁসগুলো ডাকে,
কালো জলে জানিনা কার হাঁস 
এখনো ফেরেনি ঘরে... ফেরেনি ঘরে... 


সন্ধ্যাতারা জ্বল জ্বল করে ওদের অক্ষিগোলকে-
বাতাসে মৃদু দোলে ঘাস,
পশ্চিমে জনৈক নারী হাঁকতে থাকে 
আয়..আয়..আয় ..আয়...
গ্রীবা তোলে হাঁস !

কবিতা- মণিকা বিশ্বাস

মধুর ছেলেবেলা

খুশির সানাই বাজায় খোকন 
আপন মনের সুরে 
সে সুর নাকি পৌঁছে গেছে 
উদাস পাগলপুরে ।

খুশির বাতাস মিঠে রোদ্দুর 
সবুজ মাঠটা ছুঁয়ে 
রিমঝিমাঝিম বৃষ্টি পড়ে 
মালতির ডাল নুয়ে ।

খুশির আলো ফুটছে এবং 
মেঘে ভাসছে ভেলা 
উদাসপারা খোকনের মন 
খেলছে সারাবেলা ।
 
খুশির নদীটা জল থইথই 
রাজহাঁস করে খেলা 
খুশির আমেজ কেটে যায় ওর 
মধুর ছেলেবেলা ।

কবিতা- ধর্মেন্দ্র বিশ্বাস

আর কতদিন প্রেমহীনতায় 

বৃত্তের ভিতর ঘুরতে ঘুরতে 
এ-জীবন খুঁজে চলে অমোঘ বিশালতা ।
প্রেমহীনতায় আর কতদিন ?
টুকরো কথারা ভেসে আসে 
যৌনতা মুক্তি পাবে না এ বৃত্তে 
নারীকণ্ঠে পুরুষ বিভোর নিত্য 
সুপ্রাচীন ইতিহাস সাক্ষী,
বহুদিন নিজেকে বিবস্ত্র করেছে 
আর কতদিন ?
সময়ের প্রবাহে শেষ হয় গল্প,
সে গল্প মুখে ফেরে ।
নীরবতার প্রাচীর চোখে ফুটে ওঠে 
স্বীকার করেনি একাকীত্বের বোধ,
আর কতদিন প্রেমহীনতায় ?