Sunday, January 20, 2019


নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী 
অক্টোবর ১৯, ১৯২৪ – ডিসেম্বর ২৫, ২০১৮) 


শ্রদ্ধেয় কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী আমাদের মধ্যে আর নেই । এখবর দুঃসহ হলেও সত্য । যদিও আমরা বিশ্বাস করি তিনি চির অমর তাঁর সৃষ্টির মাঝে । বঙ্গ জীবনের হৃদয়ে তাঁর আসন চিরস্থায়ী । অচিনপাখি ব্লগের এই বিশেষ সংখ্যাটি তাই প্রিয় কবির স্মৃতির উদ্দেশ্যে অর্পিত । এই সংখ্যায় আমরা কাব্য-কবিতায়, স্মৃতিচারণায়, তাঁর লেখার আলোচনায় নানভাবে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছি । ভবিষ্যতে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর জীবন-সাহিত্য আলোচনা ভিত্তিক আরও বড় পরিসীমার সংখ্যা করতে আমরা পরিকল্পনাবদ্ধ । এই ওয়েব সংখ্যাটি আমাদের কবিতার ঈশ্বরের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি ।





এই সংখ্যায় সাহিত্য অর্ঘ্য নিবেদন করেছেন 

তরুণ মুখোপাধ্যায়
অজিত বাইরি
রবীন বসু
অপূর্বকুমার কুন্ডু 
অর্কজ্যোতি ভট্টাচার্য 
রবীন্দ্রনাথ ভৌমিক 
কাণ্ডারি সুদিন রহমান
টুম্পা মিত্র সরকার
সোমা ধর ঘোষ
সুদীপ ঘোষাল
বিদ্যুৎ মিশ্র
শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়
শঙ্কর দেবনাথ
স্বপন কুমার বিজলী
রমেশ পালিত 
অনন্যা দাশ 
এবং অচিনপাখির স্মৃতিচারণা
ধর্মেন্দ্র বিশ্বাস, সুমন্ত কুন্ডু ও পিঙ্কি চক্রবর্তী 

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সংক্ষিপ্ত জীবনী


বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে আবির্ভূত বাঙালি কবিদের মধ্যে অন্যতম নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী  । তিনি ১৯২৪ সালের ১৯শে অক্টোবর বাংলাদেশের ফরিদপুরের চান্দা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ।  তাঁর পিতা জিতেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও মাতা প্রফুল্লনলিনী দেবী । কৈশোর ও শৈশব বাংলাদেশে কাটানোর পর তিনি ১৯৩০ সালে কোলকাতায় আসেন ।
কোলকাতায় স্নাতক উত্তীর্ণ করার পর ১৯৫১ সালে তিনি যোগ দেন আনন্দবাজার পত্রিকায় । দীর্ঘ সময় তিনি আনন্দমেলা পত্রিকার সম্পাদনার সাথে যুক্ত ছিলেন ।  

তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৪ সালে । এরপর তিনি একাধিক কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন তার মধ্যে বিশেষ উল্লেখ্য – অন্ধকার বারান্দা (১৯৬১), নীরক্ত করবী (১৯৬৫), কোলকাতার যীশু (১৯৬৯), উলঙ্গ রাজা (১৯৭১), কবিতার বদলে কবিতা (১৯৭৬), পাগলা ঘন্টি (১৯৮১), যাবতীয় ভালোবাসাবাসি (১৯৮৯), চল্লিশের দিনগুলি (১৯৯৪), সত্য সেলুকাস (১৯৯৫), দেখা হবে (২০০২), অনন্ত গোধূলিবেলা (২০০৮) ইত্যাদি ।
কবিতা রচনার পাশাপাশি কবিতা বিষয়ক একাধিক আলচনাধর্মী গ্রন্থ রচনা করেছেন যা পাঠক সমাজে বিপুল ভাবে সমাদৃত হয় । উল্লেখ্য – কবিতার ক্লাস (১৯৭০), কবিতার কি ও কেন (১৯৮২) প্রভৃতি । ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর কাব্যনাটক ‘প্রথম নায়ক’(১৯৬১) ।
একাধিক ছোটগল্প ও উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে তিনি গদ্যসাহিত্যেও উজ্জ্বলতার সাক্ষর রাখেন । তাঁর সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্র চারুচন্দ্র ভাদুরী ওরফে ভাদুরী মশাই বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে ।  এই চরিত্রকে নিয়ে তিনি ‘বিষানগড়ের সোনা’, ‘পাহাড়ি বিছে’, ‘কামিনির কণ্ঠহার’, ‘ভোর রাতের আর্তনাদ’, ‘আংটি রহস্য’, ‘বিগ্রহের চোখ’  প্রভৃতি রহস্য কাহিনী রচনা করেন ।  

কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী একাধিক পুরস্কার ও সম্মানে বিভূষিত হয়েছেন ।  ১৯৫৮ সালে পেয়েছেন ‘উল্টোরথ পুরস্কার’, ১৯৭০ সালে ‘তারাশঙ্কর পুরস্কার’ সহ ১৯৭৪ সালে ‘সাহিত্য আকাদেমি’ এবং ১৯৯৬ সালে ‘আনন্দ পুরস্কার’ লাভ করেন ।  ২০০৭ সালে তাঁকে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ডি লিট উপাধি প্রদান করে সম্মানিত করে  এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে  ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে সম্মানিত করে ।  বহুদিন তিনি পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করেন ।



২০১৮ সালের ২৫শে ডিসেম্বর কোলকাতায় কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী পরলোক গমন করেন ।

কবিতার ঈশ্বরের আশীর্বাদে ঋদ্ধ অচিনপাখি



নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী – একটি নাম মাত্র কিন্তু আমাদের কাছে তিনি ঈশ্বরকবিতার ঈশ্বর  বাংলা কবিতার ছন্দের সাথে যাদের হৃদস্পন্দন অভিন্ন নয় তাদের কাছে তো তিনি ঈশ্বর-ই   কি বিরাট এক মানুষকি বিশাল তাঁর ব্যাপ্তিকি প্রবল তাঁর দ্যুতি 
বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডার কখনই অপূর্ণ নয়  নানা সময়ে নানা ক্ষণজন্মা কবিসাহিত্যিক তাঁদের অমর কলমের জোরে এ বঙ্গভান্ডার পূর্ণ করেছেন কানায় কানায়তারই মাঝে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এক মহীরুহ   চল্লিশের দশকের টালমাটাল সময়ের নানান অনুপুঙ্খভালোবাসার নির্জনতায় অমোঘ প্রবাহ আর তারই সাথে আটপৌরে জীবনের অলিন্দ থেকে খুঁজে আনা কাব্যবস্তু সোনার অক্ষরে বাঁধিয়ে তিনি আমাদের নতুন করে কবিতা পড়তে শিখিয়েছেনচিনতে শিখছেন সর্বপরি লিখতে শিখিয়েছেন   
তাঁর ‘কবিতার ক্লাসএই আমাদের কবিতা শেখা   এতো দরদী শিক্ষকএতো মরমী শুভাকাঙ্ক্ষী বাংলা ভাষার কবিতা অনুরাগী পাঠকেরা নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছাড়া বোধহয় আর কাউকে পায়নি   তাঁর ক্লাসেই আমাদের ছন্দ শেখাকবিতার গ্রন্থন শেখাকবিতার আবরণব্যঞ্জনা শেখা   ‘আমি শুধু কবি, দোষ নেই কিছু আর’ এই সামান্য স্বীকারোক্তিকেই তিনি অসামান্য করেছেন তাঁর অক্ষয় কলমের আঁচড়ে ।  
আটপৌরে কথা, সাদামাটা জীবন আর তীব্র এক অন্তর্ভেদী দৃষ্টি এই হাতিহার করেই তিনি কখনও রোদ্দুর হয়ে উঠতে চাওয়ার বাসনা রাখা কোন অমলকান্তিকে চিনেছেন, কখনও চলমান শহুরে ব্যস্ততাকে স্তব্ধ করে দেওয়া উলঙ্গ গরীব শিশুর বুকে কোলকাতার যিশুকে খুঁজে পেয়েছেন আবার কখনও নির্লজ্জ সমাজের সামনে তীব্র আশ্লেষে কোন শিশুর কণ্ঠ মুখরিত করতে চেয়েছেন প্রতিবাদে ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়’ ।
তিনি কবিতার ঈশ্বর । আচিনপাখি সে ঈশ্বরের দু’হাত ভরা স্নেহাশিস মাথায় পেয়ে ভাগ্যবান হয়েছে । আমাদের প্রকাশিত প্রথম কাব্য সংকলন ‘একশো কবিতায় প্রেম’এর প্রথম কবিতাটিই নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর লেখা মানব-সংসারে । গত ২৩শে নভেম্বর তাঁর বালিগঞ্জের বাসভবনে অচিনপাখির পক্ষ থেকে তাঁকে ‘জীবন কৃতি সম্মাননা’ তুলে দেওয়া হয় । তিনি তখন অসুস্থ, চলাফেরা করতে অক্ষম, প্রায় বাকশক্তি হীন – তবু তিনি এলেন, ঠিক যেমন তিনি চেয়েছিলেন ‘আসবার ছিল না কথা, তবুও সম্রাট এসেছেন’  
আমরা তাঁর হাতে তুলে দিলাম আমাদের প্রকাশিত কাব্য সংকলনটি । দুর্বল দৃষ্টির ওপর জোর দিয়ে বইটির পাতা উল্টে পড়লেন । তাঁকে উত্তরীয়, পুস্পস্তবকে বরণ করে নিতে হাসলেন সেই বিভাময় দ্যুতিতে । কাঁপা কাঁপা হাতে শারীরিক অক্ষমতাকে জয় করে অচিনপাখির জন্য লিখে দিলেন দু’কলম শুভেচ্ছা । দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করলেন, শুধু আমাদেরই নয় সাহিত্যচর্চার সাথে যুক্ত সকলকেই ।  ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া সে আশীর্বাদই আমাদের আগামীর পথচলার পাথেয় ।  ঈশ্বরের পায়ে হাত ছুঁয়ে প্রণাম করতে পেরেছি এ আমাদের আজীবন অমুল্যরতন ।
তারই প্রায় এক মাস পড়ে ২৫শে ডিসেম্বর প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে তিনি আমাদের এই মাটির পৃথিবী ছেড়ে আরও ঊর্ধ্বলোকে যাত্রা করলেন । তাঁর নশ্বর দেহটি নেই কিন্তু তিনি থাকলেন চির অমর হয়ে । আমাদের কবিতার ক্লাস শেষ হয়নি । আমাদের ভুল ভ্রান্তিতে যখনই অসহায় হয়ে পড়বো জানি তাঁর অক্ষর দেবে নতুন পথের দিশা ।  অনেক নতুন কবিরা আরও লিখবে কবিতা, ছন্দে ভুল করা কেউ শুধরে নেবে তার ছন্দ ।  কবিতার ঈশ্বর, কবিতার শিক্ষক সৃষ্টির নানা পথের হদিশ রেখে গেছেন অকাতরে ।  
তাঁর আশীর্বাদ সবসময় আমাদের সাথে আছে, থাকবে ।  সামান্য মৃত্যুতে তিনি সমাপ্ত হয়ে যাওয়ার নয় । তিনি অফুরান, অনন্ত ।  বাংলার সাহিত্য অনুরাগী উত্তরসূরিরা কালে কালে, স্থানে স্থানে তাঁকে কাছে পাবেন, তাঁর সৃষ্টিতে ঋদ্ধ হবেন তাঁর চরনে সাজিয়ে দেবেন শ্রদ্ধাঞ্জলি । অচিনপাখি ভাগ্যবান যে কবিকে জীবনের শেষ সম্মাননা আমরা হাতে তুলে দিতে পেরেছি ।  অচিনপাখির উড়ান পথে তাঁর আলো পথ দেখাবে আজীবন এ বিশ্বাস আমাদের অটুট ।  তিনি আলোর দিশারী, মুক্ত হাওয়ার আহ্বায়ক । তিনি নিজেই সে অভিলাষ রেখে গেছেন –

এখন যাবার বেলা, এখন জানালা বন্ধ করে
থাকা ঠিক নয় ।
যতই এগিয়ে আসে যাবার সময়,
ততই মলিন এই ঘরে
জানালার পথে যেন আসে আরও আলো, আরও হাওয়া ।
অন্ধকারে কে নেবে বিদায় ।
যে যাবে সে পিছনে খানিকটা আলো দেখে যেন যায়
তা নইলে কীসের জন্য যাওয়া ।  



।। অচিনপাখির পথচলা শুরু হয়েছে কবিতার ঈশ্বর নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা দিয়েই । 
আচিনপাখি প্রকাশিত 'একশো কবিতায় প্রেম' নামক কাব্যসঙ্কলনের প্রথম কবিতাটি তাঁরই লেখা । 
কবি স্মরণে অচিনপাখির শ্রদ্ধাঞ্জলি তাঁর লেখা এই কবিতাটি ।। 


মানব-সংসারে
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

নিতান্ত বোতাম টিপে সহস্র যোজন দূরে কোনো
গৃহস্থের সচ্ছল সংসারধ্বংস করা যায় । যায় নাকি ?
যায় না নিরন্ন প্রতিবেশীর ক্ষুধায়অন্ন দেওয়া, পিপাসার্ত মাঠে
জল দেওয়া, অন্ধকার ভয়ের আকাশে আলো দেওয়া ।
যায় না, যায় না ।
কেননা, ক্ষুধার অন্ন, পিপাসার জল দিতে হলে,
অন্ধকারে আলো দিতে হলে
আরও কিছু দিতে হয় ।প্রেম দিতে হয় ।

বৃক্ষ দেয় ফল, মাঠ শস্য দেয়, নদী দেয় জল,
চন্দ্রসূর্যতারা দেয় আলো ।
যদিও বৃক্ষ ও মাঠ, চন্দ্রসূর্যতারার সংসারেপ্রেম নেই ।
মানুষ, তোমার প্রেম ছিল ।
তবুও, মানুষ, তুমি কিছুই দিলে না
নিখিল সংসারে । 

নীল নির্জন এক কবি 
তরুণ মুখোপাধ্যায় 

কবিতার ক্লাস থেকে কবি বেরোলেন,
যেতে হবে গদ্যের সভায় ।
সভা ডাকা হয়েছিল বটে, তবু এক অদ্ভুত
শূন্যতা ব্যাপ্ত চরাচরে -
ঋজু দেহে কবি তাকালেন দ্যুতিময় চোখে
কিছুটা ঔদাস্যে, কিছুটা বা মায়া ছিল;
 মন্দ্রস্বরে বললেন,
          'আমি শুধু কবি, দোষ নেই কিছু আর'
সবাই দেখল অপ্রত্যাশিত এই আগমন
যেন সম্রাট এসেছেন, যার ওষ্ঠে
      'রোদ্দুরের অমল ভাষা ...

লালবাতির নিষেধ ছিল না, তবু অকস্মাৎ
অন্য এক যীশু
পঁচিশে ডিসেম্বর কোলকাতা ছেড়ে একা
                                হেঁটে যান নীল নির্জনপুরে !

Wednesday, January 9, 2019

পায়ের নিচে কণা কণা নক্ষত্র
অজিত বাইরী

কবিসভা ভেঙে গেলে পর, একে একে
উঠে গেলেন অনেক কবি ।
তিনি এসে দাঁড়ালেন মস্ত আকাশের নিচে
অনেক তারায় ভরা আকাশ ;
তাঁর মুখের উপর বিন্দু বিন্দু আলো ।

তিনি অনুভব করলেন এক অনির্বচনীয় আনন্দ
শব্দ যেন পাপড়ি মেলছে বুকের ভেতর ;
নিঃশব্দে রচিত হচ্ছে একটি কবিতা ।

আমাদের এখন নীরবতার সময়;
তিনি সমাপ্ত করলেন তাঁর দীর্ঘ আয়ুর জীবন ।
সরিয়ে রাখলেন কলম ।
তবু তাঁর চলা থেমে থাকলো না ;
কবিতাংশগুলি বিঁধতে লাগল বুকে ।
দীর্ঘাকায় কবিকে দেখলাম আরও দীর্ঘ হয়ে
ছুঁয়ে ফেলছেন মাথার আকাশ ;

তাঁর পায়ের নিচে কণা কণা নক্ষত্র ।  

প্রণম্য সেই মানুষটিকে
অপূর্ব কুমার কুন্ডু

তাঁর কলমে ছড়া ফোটে সহজ কথার আলোয়,
তোমার আমার মুখের কথা ছন্দ দিয়ে সাজান।
মুগ্ধ হয়ে পড়তে থাকি, ভাবতে থাকি শুধু...
কেমন করে শিশুমনের ঝুমঝুমিটা বাজান !

‘হাসলে, ভালবাসলে’ ছড়ার রাংতাকুচি ছড়ান,
তাঁর কলমের জাদুপরশ আমরা পেলাম যারা,
দুহাত দিয়ে লুটে নিলাম । মন বলে চাই আরও...
ছন্দ লুটে কেমন যেন হই যে আত্মহারা ।

তাঁর ছড়াতে ছন্দ জাগে ‘ভোরের পাখি’র গানে,
‘সাদা বাঘ’ সে খেলার সাথী শিশুর ছড়া ঘরে ।
‘বারোমাসের ছড়া’-য় বারোমাসের চিত্র এঁকে...
সাজিয়ে দিলেন, আমরা শুধু নিলাম দুহাত ভরে ।

‘নদীনালা গাছপালা’ আর ‘পাঁচবছরের আমি’
সবকিছু তাঁর ছড়ায় ছড়ায় ছন্দে জেগে ওঠে ।
প্রণম্য সেই মানুষটিকে ভুলবো কেমন করে ...
তাঁর আকাশে ছন্দ-ছড়ায় রামধনু রঙ ফোটে ! 

Tuesday, January 8, 2019


ভাষার ঈশ্বর  
রবীন বসু

তুমি কবি, সম্পাদক আবার ভাষার ঈশ্বর
তোমাকে ছুঁয়েছিল সকালের রোদ, অমলকান্তি ।


টালমাটাল পায়ে কলকাতার যীশুকে
তুমি হেঁটে যেতে দেখেছ…
শেষরাতের ট্রামগুমটি, সেই পাগল লোকটা
বাতাসি….বাতাসি….

সব উলঙ্গ হয়ে গেল, মেকি সভ্যতা, মেকি মানুষ
আর ওই ঝুলে থাকা ভন্ডামি…
অন্তঃসারশূন্য রাজনীতি, অমানবিক মুখ
তোমাকে ছুঁয়েছে বার বার…

শব্দকে ছন্দে গেঁথে আবার ছন্দহীন করেছ তাকে ।
এবার নিপাট গদ্য হয়ে শুয়ে আছো কবি,
অক্ষরের সাথে এত বন্ধুত্ব, এবার ফুলের সাথে
অহরহ তোমার সখ্যতা হবে, সখ্যতা হবে
বিমূর্ত শূন্যতার মাঝে অনন্ত যাত্রার !

ভাষার ঈশ্বর তুমি চিরশান্তি জেগে থাক অক্ষরের মাঝে
কবির স্মৃতি রেখে হেঁটে গেলে মরণের পারে ।

যার নামে বৃষ্টি নামে
অর্কজ্যোতি ভট্টাচার্য

প্রশ্নটা আর ছুঁড়বে না কেউ
বলবে না কেউ ঠিক দেখে
রাজার কাপড় কোথায় গেল
জানতে চেয়ে চোখ রেখে ।

অমলকান্তি একলা এখন
বইয়ের পাতায় মুখ ঢেকে
আকাশ হবার ইচ্ছাগুলো
নীলের রঙে আঁকবে কে ?

সহজ ভাষায় মনের কথা
ছোট্ট শিশু হচ্ছে পার
থমকে গেল বাসের চাকা
শক্তিশালী কলম যার ।

নীরেন্দ্রনাথ একটি নামে
নামতে পারে বৃষ্টি ঝড়
নির্জনতায় আজ সকালে

দুয়ার খোলা একলা ঘর ।  

থাকবে সুখে দুখে
রবীন্দ্রনাথ ভৌমিক

বলছে সবাই – চলে গেছো কোন সে অচিনপুর
আমি জানি তেমনি আছো, রাঙিয়ে হৃদয়পুর,
ঊষালোকে ছড়িয়ে আছো, পুবের আকাশ জুড়ে
ওই যেখানে সুর্য ওঠে ভোরের ভোরাই সুরে ।

নীল নীলিমায় ঝরিয়ে সুর, জাগবে তারার সাঁঝে
পশ্চিমে ওই গোধূলি বেলার সন্ধ্যাতারার মাঝে,
যুগে যুগে নবীন প্রাণে ঘুচিয়ে আঁধার নিশা-
ধ্রুবতারার মতোও তুমি, - দেখবে পথের দিশা ।

ছিলে আছো থাকবে কাছে পুবে ও পশ্চিমে
চোখের আলোয় জ্বলবে আবার অসীম সসীমে,
নীরেন্দ্রনাথ আজীবন তুমি থাকবে বাঙালি বুকে

হাজার বাঁচবে তুমি সবার সুখে দুখে ।   


নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী স্মরনে 
কান্ডারী সুদিন রহমান 

লালবাতির নিষেধ ছাড়াই 
আবার অতর্কিতে থেমে গেল 
কলকাতার ট্রাফিক ।

নিশ্চল নিস্তব্ধ জনজীবন ;
যাত্রীরাও গাড়ির কাঁচ নামিয়ে 
বিধস্ত বুকের যন্ত্রনা ও চোখের জলে 
চির বিদায় জানালো "কলকাতার যীশু"র স্রষ্টা কে।

হারিয়ে গেল কবিতার ঈশ্বর 
ঘুটঘুটে "অন্ধকার বারান্দা"য় । 
লাউ মাচার পাশে দাঁড়িয়ে আর দেখা যাবেনা কুঁন্দ ফুলের হাসি। 

"অমলকান্তি" আর রোদ্দুর হয়েও ছুঁতে পারবেনা 
তার শৈশবের বন্ধুকে। 
প্রতিবাদের ঝড় আর উঠবেনা
"উলঙ্গ রাজা"র যাত্রা পথে ।


আমার নীরেন
টুম্পা মিত্র সরকার

বাংলাদেশের গ্রামের বাড়িতে কাটিয়ে সে 'ছেলেবেলা'
অমলকান্তি রোদ্দুর ধরে মধুর খেলা 
'রাত্রি তখন তিনটে' বেজেছে 'কবিতার ক্লাস' গড়ে
'অন্ধকারের বারান্দাটা'য় দিয়েছো আলোক ভরে ৷

তুমিই প্রথম 'নীল নির্জনে' দেখেছো পথের যীশু
ছাপাখানার সে অন্ধকারে থাকতো যেসব শিশু...
এদের জন্য তোমার প্রাণেতে স্নেহের আদর ভরা
সদা হাসি মুখে আওড়াতে শুনি 'বারো পুতুলের ছড়া' ৷

আজও বসে আছি 'পিতৃ পুরুষ'এর 'ভিটে মাটি' বুকে ধরে 
শব্দেরা যেন তোমার কলমে অবিরাম খেলা করে 
'বারোটা মাসের ছড়া'টা শুনিয়ে এঁকেছো সমাজ ছবি
'চৌরঙ্গী মোড়ে' দাঁড়িয়ে আমার প্রিয় সে নীরেন কবি ৷

ছন্দ শেখার 'প্রথম নায়ক' তুমিই সবার মাঝে
উন্নত শিরে রাজায় প্রশ্ন সত্ত্বা বোধের ভাঁজে ৷
আজ বড়োদিনে বেছে নিলে তুমি অচিনপুরের পথ 
সার্থক হোক 'নীর বিন্দুর' উজ্জ্বল মনোরথ ৷


কোমল নিষাদ
সোমা ধর ঘোষ

উত্তরে বাতাস এলোমেলো 
হয়ে এলো
দিয়ে গেল বিষাদ
কবি রোদ্দুর হয়ে গেলেন
রোদ্দুর ছন্দে বইছে
তবুও ছায়ার প্রশ্বাস,
জামরুল পাতাগুলো
বিষাদে কাতর
বেহালার তন্ত্রীতে হাত-
কোমল নিষাদে বিষন্নতা
রোদ্দুর অপার্থিব দ্যোতনায় ।


মহার্ঘ
সুদীপ ঘোষাল

ভাবনাগুলো এত অগোছালো সবুজ পাতারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে
হলুদের অস্তিত্ব কানায় কানায় বিন্যস্ত
শরবনে মর্মর বায়ু বাদকের ভূমিকা ছেড়ে বিলুপ্তির পথে 
বৃষ্টি নেই পৌষ ফাগুনে আগুনের অবহেলায়
কষ্টগুলো হাওয়ার ওড়া চুলের ছন্দ খোঁজে 
ভিতরে ভিতরে পাতা খসার খোঁজে বৃদ্ধ আড্ডা
আলোচনা আবেগে মিশে যায় মন খারাপের চাঁদ
হে আরম্ভ হে সমাপ্তি গীতিকার 
খুঁজে বেড়াই সময়ের সন্দেশ মিঠে কড়া মৃত্যুর ছায়া 
শুকনো মৌসুমে বিশাল পাহাড়ের খিদে অনিশ্চিত
সপ্তাহ যায়, আসে মাস মাইনের খেরো 
কখনও বাহান্ন বসন্ত জেতে লটারি জীবন 
হে অনন্ত বেহিসেবি জোয়ার 
নিয়ন্ত্রণ যানে ভাসে সমীরণ, অবুঝ ডানা গজানো কুমারী পরিচয়ে
কে কখন রাস্তা গড়ে, পথের ঘাসে আনমনা 


রাজা তোর কাপড় কোথায়
বিদ্যুৎ মিশ্র

তাঁর সুবাস ভরে দিয়েছিলো যে বাগান
আজ সেখানে বড়ই শূন্যতা, জানি
তুমি পাড়ি দিয়েছো না ফেরার দেশে ।
তবু বোঝানো কঠিন এই নিঠুর সত্য ।
তোমার কবিতা পড়ি

মনে হয় এই আছো তুমি আমার চারপাশে ।
তুমি রইবে হৃদয়ের আনাচে-কানাচে
ধমনী শিরায় ।

যতদিন আমরা মাথা নিচু করে মেনে নেবো
ভীড় ঠেলে সমস্ত হাত তালির উর্ধে 
তোমার কন্ঠস্বর আসবে, “ রাজা তোর কাপড় কোথায় ?”


কবিতার ক্লাস ফেলে
শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

ইন্দ্রপতনের ঘাত সুদূরপ্রসারী,
আমিও কেঁপেছি উঠে সেই অভিঘাতে --
যাদের প্রস্থান হয় নীরবে নিভৃতে,
আমি সেই উপেক্ষার একা অভিসারী ।

পথ শিশু হয়ে যায় নাগরিক যিশু
তোমার মনন তাকে করেছে অমর ।
রোদ মাখা বোবা চোখে চেয়ে থাকি আমি --
অমলকান্তির কাছে প্রশ্ন ছিল কিছু ।

'এনট্রপি' তো বিশৃঙ্খলার পরিমাপ --
পড়ে ভালো বলেছিলে, সেটুকুই স্মৃতি !
নিজস্বীতে ধরা নেই কোনও স্বীকৃতি,
নিজস্ব সংগ্রহে রাখা শুধু উত্তাপ ।

'ক্ষণিক আবর্তে' লিখে ফেলি কেউ গেলে,
মাত্রাবৃত্তে এখন আর মাত্রা ছাড়া নই ।
তবুও কবির কাছে যাওয়া হল কই ?

ক্ষণিক শূন্যতা ভরে চিতা নিভে এলে...

নীরেন্দ্র স্মরণ 
শঙ্কর দেবনাথ 

বড়দিন হল বড় দীন, তাই
জড়োসড়ো মন দুঃখে-
কবিতার চোখ নীরে নীরে ভাসে
নীড়হারা মরুরুক্ষে ।

কবিতার ক্লাসে ছাত্রেরা আসে
ছলছল দুটি চক্ষে -
মন্দ কপাল- ছন্দগুরুকে
হারানো ব্যাথার বক্ষে

কোলকাতা - যিশু হারাল এবং
নিভে গেল শিশুপ্রাণটি-
রোদ্দুর হয়ে নীল নির্জনে
গেল কী অমলকান্তি ?

নেই কবি সেই ঋজু দেহ
মননে- বুকের মধ্যে-
ছন্দে-গন্ধে আনন্দে তিনি
রবেন গদ্যে-পদ্যে । 







নীরেন্দ্রনাথ স্মরণে
স্বপনকুমার বিজলী 

বড়দিনে সুয্যি যখন দিচ্ছে খুশির আলো 
একটা খবর মনের আকাশ করে দিল কালো, 
ল্যাংটা রাজার গল্প এলো যার কলমে ঘুরে 
নীরেন্দ্রনাথ ধরাতে নেই, এখন অনেক দূরে ।

ছন্দে লেখা জ্ঞানের ছড়া সেই যে " মায়ের কাঁথা "
চিরটা কাল সব শিশুদের থাকবে মনে গাঁথা, 
কাঁথা ছিঁড়ে ভাগ করা নয়,  সুকৌশলে বলে –
শিশু শ্রেণির শিক্ষা দিয়ে তুমি গেলে চলে ।

অমলকান্তি হাঁটছে আজও আঁধার পথের বাঁকে 
ঝলমলে রোদ মনের মাঝে আশায় তবু আঁকে, 
তোমার লেখা " কবিতার ক্লাস " আমি পড়ে - শিখে 
আজকে তোমায় স্মরণ করি এই ছড়াটা লিখে ।

হৃদয়ের গভীরে আছো তুমি 
রমেশ পালিত 

না তোমার মৃত্যু নেই,
তুমি ছিলে, আছো, থাকবে হৃদয় জুড়ে
তুমি কিংবদন্তি কবি নীরেন্দ্রনাথ, তুমি কালজয়ী ।
১৯শে অক্টোবর ১৯২৪
ধন্য হল বাংলাদেশ
ফরিদপুর জেলার চান্দা গ্রাম
জন্ম নিলে তুমি হে মহান ।
সাংবাদিকতা থেকে সম্পাদনা
পদ্য থেকে গদ্য সবেতেই তুমি সাবলীল
অজস্র অমুল্য সৃষ্টির মধ্যে তুমি চিরভাস্বর
'উলঙ্গ রাজা', 'কোলকাতার যিশু' র- অমর স্রষ্টা
আশ্চর্য ! ২৫শে ডিসেম্বর স্বয়ং যীশুর জন্মদিনেই
তুমি আমাদের কাঁদিয়ে চলে গেলে !
তুমি আছো, থাকবে হৃদয়ের গভীরে ... 





নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী: টিনটিনের বাঙালি পরিচয়
অনন্যা দাশ 

“ছোটদের জন্যে না লিখলে হাত শুদ্ধ হয় না” বলতেন শ্রী নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। ভালোবাসতেন ছোটদের জন্যে লিখতে। দীর্ঘকাল আনন্দমেলা পত্রিকাটির সম্পাদনা করেছিলেন, সেই থেকেই হয়তো এই উপলব্ধি। লেখকদের মর্যাদা দিতেন তিনি। ভালো লেখার জন্যে লেখকের বাড়ি পর্যন্ত গিয়েও লেখা নিয়ে এসেছেন ।

বাঙ্গুরে নীরেনবাবুর বাড়ির পাশেই থাকতেন আমার পরিচিত একজন। নীরেনবাবুর মৃত্যুর খবরটা শুনে তিনি আক্ষেপ করে বললেন, “আহা খুব ভাল মানুষ ছিলেন, উনি আর ওঁর স্ত্রী দুজনেই! জানি অনেকেই ওই ওই কথা বলবে হয়তো কিন্তু আমি বলছি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ভীষণ সাদাসিধে ছিলেন দুজনেই। বোঝাই যেত না এত বড়ো নাম করা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আমার বাবার মৃত্যুর পর প্রচুর সাহায্য করেছিলেন আমাদের। সে কথা কোনদিনও ভুলব না। তখন ঘন ঘনই চলে যেটাম ওঁদের বাড়ি। আমি তখন শিশু, কমই বুঝি কিন্তু আমার ওই ভয়ঙ্কর ক্ষতির সময় নীরেনজেঠু আর ওঁর স্ত্রী ছিলেন আমার কাছে দুটো খুঁটির মতন। ওনাদের আঁকড়ে ধরে আমি মনে শান্তি পেইয়েছিলাম। স্বজনহারা এক শিশুকে যে ভাবে আপন করে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন ওঁরা দুজন তাই থেকেই বোঝা যায় যে ওঁদের মন কত নির্মল ছিল! তখন আমি কিছুই বুঝি না তেমন। জানতাম ওঁদের বাড়িটা আমার আবদারের জায়গা,। কিছু খেতে ইচ্ছে করলে ওঁদের ওখানে গিয়ে হাজিত হতাম। জেঠিমার কাছে আবদার করতাম এবং প্রম স্নেহে সেই সব রেঁধে খাওয়াতেন জেঠিমা। তখন অঁদের সাধারণ ভাল মানুষ বলেই মনে হয়েছিল আমার। সেই বয়সে বুঝতামও না কিছু! পরে জেনেছিলাম জেঠু তো সেলিব্রিটি! এখন মনে করি আর ভাবি কত স্নেহময় মানুষ ছিলেন দুজনেই। জেঠিমা তো আগেই চলে গেছেন আর এখন জেঠুও জেঠিমার কাছে চলে গেলেন!”

এবার আসি আমার কথায়। আনন্দমেলায় টিনটিনের কমিক্স থেকেই নীরেনবাবুর কাজের সঙ্গে আমার পরিচয়। দি অ্যাডোভেঞ্চার্স অফ টিনটিন ২৪টা কমিক বইয়ের একটা সিরিজ। বেলজিয়ামের এক কার্টুনিস্ট জর্জ রেই (যিনি হার্জে ছদ্মনামে লিখতেন) টিনটিনের চরিত্রটি গড়ে তোলেন। প্রথম প্রথম কমিকটি বের হত বেলজিয়ামের এক বিখ্যাত দৈনিক খবরের কাগজে এবং পরে বিশাল সফলতা পাওয়ার পর টিনটিন ম্যাগাজিন হিসেবে বেরতে থাকে। টিনটিন একজন খুব সাহসী সাংবাদিক এবং যাকে বলা হয় অ্যাডভেনচারার। নিজের কুকুর স্নোইকে (বেলজিয়ান নাম মাইলো) সঙ্গে করে নিয়ে সে সারা বিশ্বে (এবং মহাকাশে) নানা রকমের কীর্তি কলাপ করে বেড়ায়! সঙ্গে থাকে বদমেজাজিই ক্যাপটেন হ্যাডক, প্রচন্ড বুদ্ধিমান কিন্তু কানে কালা প্রোফেসার ক্যালকুলাস, দুই ভয়ঙ্কর অপটু গোয়েন্দা থমসন ও থম্পসন এবং (সু)গায়িকা বিয়াঙ্কা ক্যাস্টাফিয়োর! টিনিটিনের এই কমিক বিশ্বের সত্তরটির বেশি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। এবং বাংলায় টিনিটিনকে আমাদের খুব কাছের মানুষ করে তোলেন শ্রী নীরেন্দ্রনাথ।    

টিনটিনের বাংলা অনুবাদ ১৯৭০ সাল থেকে শুরু হয়। সেকালে আনন্দমেলায় টিনটিনের কমিক্স ধারাবাহিক ভাবে বের হত। হা পিত্যেস করে বসে থাকতাম আমরা সেই কমিক্সের পরবর্তি কিস্তির জন্যে। তখন আমরা অনেক ছট টিনটিন যে বেলজিয়ান সেই সব কিছুই জানি না। নীরেনবাবুর অনুবাদ এতটাই ঝরঝরে যে টিনটিন যে আদৌ বাঙালি নয় সেটা কোনদিন বুঝতেই পারিনি! এমনিতেও যার কুকুরের নাম কুট্টুস সে বাঙালি না হয়ে যায় নাকি! ক্যাপটেন হ্যাডক রেগে গেলে বা একটু বেশি মদ্যপান করে ফেললে ‘বেবুন, বেজি, বেল্লিক’ ইত্যাদি বলে চিৎকার করেন সেটাও খুব বিশ্বাসযোগ্য ছিল! নীরেনবাবুর অনুবাদ এতটাই সহজ সরল ছিল যে ছোটদের মনে গেঁথে যেত। আজো আমার বইয়ের তাকে টিনটিন সমগ্র শোভা পায় এবং মন খারাপ হলে আমি সেগুলোকে পড়তেই পছন্দ করি!

প্রোফেসার ক্যালকুলাস কানে কম শোনেন তাই তাঁর কথাগুলোকে অনুবাদ করা বেশ কঠিন কারণ হাসির উপকরণ অক্ষত রেখে অনুবাদ করতে হবে। যেমন ক্যালকুলাসের কান্ডে ক্যাপটেন হ্যাডক প্রোফেসারকে জিজ্ঞ্যেস করলেন, “দূরে কোথাও যাচ্ছ নাকি প্রোফেসার?” প্রোফেসার ক্যালকুলাস শুনে অম্লান বদনে উত্তর দিলেন, “না, না, দূরে যাচ্ছি”। তারপর স্লাই ফক্সকে চিকেন পক্স শোনাটা, বা স্টিকিং প্লাস্টারের হাতে হাতে ঘোরার মজা সব কিছুই আসলের মতন রয়ে গেছে। ঠিক একই রকম শক্ত ক্যাপটেন হ্যাডকের কথাগুলোকে অনুবাদ করা কারণ হাসির উপাদান বাদ পড়লে চলবে না মোটেই তাই বিস্তর মাথা খাটানোর প্রয়োজন ছিল ওগুলোর জন্যে।   

হার্জে বলেছিলেন যে দা ব্লু লোটাস থেকে তিনি অন্য দেশের লোকজন এবং তাদের হাব্বহাব পোশাকআশাকের প্রতি নজর দিতে শুরু করেন যাতে পাঠকরা সেই দেখগুলো সম্পর্কে কিছু জানতে পারে। আমরাও তাই নীলকমল থেকে চিনদেশের লোকজন এবং তাদের সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছিলাম নীরেনবাবুর অনুবাদের সুবাদে! লক্ষ লক্ষ বাঙালি ছেলেমেয়ে যে আজ টিনটিন ভক্ত তার জন্যে নীরনবাবুর অবদান অশেষ। একে একে আমেরিকায় টিনটিন, আশ্চর্য উল্কা, বিপ্লবীদের দঙ্গলে, বোম্বেটে জাহাজ, পান্না কোথায়, চাঁদে টিনটিন, চন্দ্রলোকে অভিযান ইত্যাদি টিনটিনের সব কটি বই অনুবাদ করে ফেলেন আমাদের মতন পাঠকদের জন্যে।  

অসম্ভব শুদ্ধ হাতে ছোটদের জন্যে যে সব অসংখ্য গল্প, ছড়া ইত্যাদি লিখেছেন নীরনবাবু সেগুলো চিরকাল বাঙালির সম্পদ হয়ে থাকবে। আর যতদিন বাঙালি টিনটিন পড়বে নীরেনবাবু বেঁচে থাকবেন ওই সাহসী রিপোর্টারের মধ্যে।  
টিনিটিন ছাড়াও নীরেনবাবুর ‘বাংলা কি লিখবেন কেন লিখবেন’ ও ‘কবিতার ক্লাস’ অসামান্য দুটি বই। লেখক ও ছড়াকারদের জন্যে অবশ্য পাঠ্য! 

১৯৭৪ সালে উলঙ্গ রাজা কবিতার বইটির জন্যে সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরষ্কার পেয়েছিলেন শ্রী নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।
তবে আমার পছন্দ ‘কিছু ধুলোবালি, কিছু ছাই’ কবিতার এই অংশটি
“চারিদিকে যত দেখি, তত এই চেনা
পৃথিবী অচেনা হতে থাকে।” 
না, লেখকের মৃত্যু হয় না।