Thursday, December 30, 2021
অচিনপাখি * অণুগল্প সংখ্যা
সম্পাদকীয়
সূচিপত্র
অণুগল্প- আবীর গুপ্ত
আত্মহত্যার নেপথ্যে
সমীরে মন ভয়ঙ্কর খারাপ কারণ ও যাকে গভীরভাবে ভালবাসে সেই রিমি আজ আত্মহত্যা করেছে। রিমি ওদের বাড়ির একতলায় ভাড়া থাকতো। ডেড বডি বাড়ি থেকে বার করে রাস্তায় রাখা হয়েছে। এবারে পুলিশ পোস্টমর্টেমের জন্য নিয়ে যাবে। রিমি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করলো কেন! প্রাথমিক ইনভেস্টিগেশনের পর পুলিশের ধারণা রিমি অন্তত চার মাসের প্রেগন্যান্ট ছিল। অবিবাহিতা মেয়ে হিসাবে লজ্জার হাত থেকে বাঁচতে আত্মহত্যা করেছে।
রিমির বাবা-মার হঠাৎ একটি দুর্ঘটনায় একসঙ্গে মৃত্যুর পর আর্থিক টানাটানির মধ্যে পড়ে সমীরের কাছে আসে। সমীর ওর বাবাকে বলে কর্পোরেশনে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেয় কারণ সমীরের বাবা কর্পোরেশনের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। রিমির আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটে। চাকরি পাওয়ার পর প্রথমদিকে যোগাযোগ রাখলেও পরের দিকে কেন জানিনা ওকে অ্যাভয়েড করতে শুরু করে দেয়! অথচ, রিমি ছাড়া সমীর তো কল্পনাই করতে পারে না।
সমীর একটা কাগজে লিখল – “আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়”। কাগজটা পকেটে পুরে তিনতলার ছাদ থেকে নিচে লাফ দিল। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু। আরেকটা আত্মহত্যা। সমীরের বন্ধুদের ধারণা রিমির জন্যই আত্মহত্যা সমীর আত্মহত্যা করেছে। আসল কারণ কিন্তু অন্য, সেটা ও ছাড়া আর কেউ জানে না। সমীর দিন কয়েক আগে নিজের বাবাকে রিমির সঙ্গে একতলায় রিমির শোবার ঘরে আপত্তিজনক অবস্থায় দেখেছিল। সমীরের বাবা রিমিকে চাকরি দিয়েছিলেন এই জন্যই। রিমি ওর রক্ষিত হয়ে ছিল। এটাই সমীরের আত্মহত্যার কারণ।
অণুগল্প- কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
বাপ
‘ডাগদরসাব ! এ
ডাগদরসাব !’
ডঃ চৌধুরী চমকে
উঠলেন । জবুথবু এক বৃদ্ধ, জরাজীর্ণ চেহারা, তাঁকে ডাকছে বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে । কে
ও ? আগে তো কোনদিন দেখেছেন বলে মনে হয় না । অথচ এই সন্ধেবেলা —
রীতিমতো বিরক্ত
হলেন ডঃ চৌধুরী । এক বছর হল তিনি এখানে বদলি হয়ে এসেছেন । মফঃস্বলের একদম প্রান্তে
একটেরে এই মর্গটা, আর তারই লাগোয়া তাঁর কোয়ার্টার । চারপাশে কোনও দোকানপাট নেই,
এমনকি কথা বলার কোন লোক । তাই সারাদিন নোংরা, পচা মৃতদেহ ঘাঁটাঘাঁটি করার পর
সন্ধেবেলা একা একা এই নির্জন বারান্দায় বসে মদ্যপান করাটাই তাঁর এন্টারটেইনমেন্ট ।
এই সময় অন্য কোন ঝামেলা তাঁর ভাল লাগে না । অথচ আজ এই উটকো লোকটা …
গজগজ করতে করতে সিঁড়ি
বেয়ে নেমে এলেন ডঃ চৌধুরী । জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই বুড়ো লোকটা হাঁউমাউ করে যা
বলল তার অর্থ, গত দুদিন ধরে ট্রেনে কাটা পড়া যে বেওয়ারিশ লাশটা এখানে রয়েছে, সে
একবার তাকে দেখতে চায় । একেবারে নাছোড়বান্দা । ডাক্তারবাবুর কোন কথাই সে শুনতে চায়
না ।
অগত্যা অনেক
দোনামনা করে শেষটায় রাজি হলেন ডঃ চৌধুরী । তাকে নিয়ে গিয়ে মর্গ থেকে টেনে বার
করলেন সেই বাক্সটা । তারপর মুখের ঢাকাটা এক টানে খুলে দিতেই চিৎকার করে কেঁদে
উঠলো লোকটা, ‘বাপজান রে —’
সকালবেলা ডাক্তার
কাগজপত্র রেডি করছিলেন । বাবা আসবে ছেলের লাশ নিয়ে যেতে । তার বদলে এল একদল লোক ।
দূরের বস্তি থেকে এসেছে তারা । আদিবাসীর দল । তারা শনাক্ত করল, লাশটা তাদের পাড়ার ভিখু
সোরেনের ।
আর তার বাপ ?
শুনে অবাক হয়ে মুখ
চাওয়াচাওয়ি করে ওরা । ডাগদরসাব কার কথা বলছে ? ভিখুর বাপ ? সে তো মারা গেছে আজ
থেকে চোদ্দ বছর আগে !
অণুগল্প- সুকুমার রুজ
লাইভ সার্টিফিকেট
ও বিপ্লবীদাদু! কী হয়েছে তোমার? এমন
ভেবলিয়ে দাওয়াই বসে আছো?
নব্বই বছরের বুড়োটার ঘোলাটে চোখে জলের ধারা। নড়ণ-চড়ণ নেই, বাক্যহারা।
সন্তোষ এবার দাওয়াই উঠে বিপ্লবীদাদুর ঘরে উঁকি মারে। দরজার
সামনেই একটা মান্ধাতা আমলের তোরঙ্গ, ডালা খোলা। ভেতরে কিছু পুরনো কাগজপত্র, একটা
অনেক পুরনো জাতীয় পতাকা ভাঁজ করে রাখা। তার উপরে কয়েকটা আরশোলা ঘুরে
বেড়াচ্ছে।
দাদু, বাক্সে কিছু খুঁজছিলে নাকি?
এবার মানুষটার ঠোঁটনড়া ভাষা হয়ে ফোটে — হ্যাঁ, চিঠি।
চিঠি! সে তো আমার কাছে। সকালে তো তুমি আমাকে পড়তে দিলে। পড়ে বললাম, পেনশন
বিভাগ তোমার 'লাইভ সার্টিফিকেট' জমা
দিতে বলেছে। তা না হলে এ মাস থেকে পেনশন পাবে না। তুমি
তো চিঠিটা আমাকে দিলে! ব্যাংকের ম্যানেজারের কাজ থেকে বলে-কয়ে লাইভ সার্টিফিকেটে
সই করে আনার জন্য। সব ভুলে গেলে?
না রে সন্তোষ, ওটা নয়, এটা খুঁজছিলাম। এই
দ্যাখ!
সন্তোষ হাত বাড়িয়ে নেয় একটা বাদামী হয়ে যাওয়া ভাঁজ করা কাগজ। আলগোছে
কাগজের ভাঁজ খোলে। কাগজের মাথায় অশোক স্তম্ভ,
নিচে মোটা অক্ষরে লেখা — 'অনারেবল
ফ্রিডম ফাইটার বিধুভূষণ ভট্টাচার্য'। তার নিচে ছোট অক্ষরে লেখাগুলো সন্তোষের পড়ার
ধৈর্য থাকে না। চিঠির নিচে স্বাক্ষর — ইন্দিরা
গান্ধী, প্রাইম মিনিস্টার।
বিপ্লবীদাদুর ক্ষীণ কণ্ঠস্বর
— এ চিঠিটাই আমার সত্যিকারের 'লাইভ সার্টিফিকেট' রে! স্বাধীনতা
সংগ্রামের পেনশন স্যাংশন আর রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে তাম্রফলক নেওয়ার আমন্ত্রণপত্র
এটা।
এখন এটার কী দরকার দাদু?
এটাই মহা মূল্যবান রে! তখন এটা না পেলে আমাদের লড়াইয়ে স্বাধীন হওয়া দেশে, পরাধীন
এই সংসারে বেঁচে থাকার মতন খাবারও জুটত না।
দাদু, আবার কেন এসব কথা! অনেকবার শুনেছি। সব মনে আছে।
এই কথাটা মনে আছে তো?
কী কথা?
আমি মরলে বাক্সে রাখা ওই জাতীয় পতাকাটা দিয়ে আমার মরদেহ ঢাকা দিয়ে দিবি। আর ওই তাম্রফলকটা আমার
চিতার উপর চাপিয়ে দিবি।
সে তো এখনো দেরি আছে দাদু!
না রে! আর
দেরি নেই। তুই দেখিস, আর
কয়েকদিন পর পনেরোই আগস্ট আমি স্বাধীন হয়ে যাব। আমার বেঁচে থাকার প্রমাণ দেওয়ার ইচ্ছেটা আর নেই রে!
অণুগল্প- বিপ্লব মাজী
অণুগল্প- অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়
বৃশ্চিক
শৌভনিকের
শরীরের ঢেউখেলানো পেশিতে, ফুলে-থাকা খাঁজে খাঁজে মানাতও খুব। সুঠাম ডান ও
বাঁ-বাহুর মাস্লে, এমনকী মসৃণ-করে-কামানো বুকেও খোদাই করা ছিল। টকটকে ফর্সা
ত্বকের ওপরে লতাপাতার জাল। নকশা-কাটা। চিত্রবিচিত্র।
বুকের বাঁ-দিকে
জ্বলজ্বল করছে কালো স্করপিয়ন। শার্ট খুলে ফেললেই চোখ টেনে নিত কাঁকড়াবিছেটা।
মোম-পালিশ পুরুষালি বুকে বিষাক্ত বৃশ্চিক। জীবন্ত।
রিমিতার খুব পছন্দের খেলা ছিল ঐ বিছের লেজে ঠোঁট ছোঁয়ানো। কেমন একটা আবেশে বুজে আসত
চোখ দুটো। মুখের রেখায়-ভাঁজে নেশা আর যন্ত্রণা। যেন বিষের মধুর জ্বালায় চিনচিন
করছে সারা ঠোঁট। যেন বা হর্সপাওয়ারের উদ্দাম প্রাণশক্তি শুষে নিচ্ছে সে’ উদোম
ট্যাটুগুলোয় ছোঁয়াচ রেখে।
আজকাল
সারাক্ষণ ট্যাটু নিয়েই পড়ে আছে শৌভনিক। বিছে। পাতা। হার্ট। লাভ। আরও অনেক, প্রচুর,
অজস্র...।
পার্লারে
‘ট্যাটু’ আঁকে শৌভনিক।
অণুগল্প- মিলনকান্তি বিশ্বাস
অশনি সংকেত
কিরণবাবু
ক্যানিং স্টেশন নেমে অটো ধরার জন্য জনস্রোতে পা মেলাতে মেলাতে ভাবছিলেন বাড়ির জন্য
একটু ফল নিতে হবে।
দুই পাশে
ফলের দোকান সার দিয়ে সাজানো। সবাই হাঁকছে ‘দাদা আসুন, স্যার আসুন।
আপেল নোব্বুই টাকা কিলো। কোমলা লেবু পাঁচটা পঞ্চাশ ইত্যাদি ...।’
কিরণবাবু
একটা দোকানের সামনে দাঁড়ালেন। দোকানদার একটি অল্পবয়সী ছেলে। গোলগাল চেহারা। গায়ের
রঙ একটু ময়লা। ছেলেটাকে দেখে তাঁর বেশ পাকাপোক্ত মনে হল ।
কিরণবাবু
–‘ভাই, আপেল কত করে?’
দোকানদার
– ‘অ্যাক কেজি নোব্বুই টাকা’।
কিরণবাবু
এক কেজি আপেল বেছে ছেলেটির হাতে দেওয়ার সময়েই ছেলেটি দুহাতে মুখ চাপা দিয়ে একটু
কেশে নিল।
কিরণবাবু
আপেলগুলি ছেলেটির হাতে না দিয়ে একটু রাগত স্বরে বললেন – ‘মাস্ক পরনি কেন ভাই? আগে
হাত স্যানিটাইজ করো, তারপর আপেল ওজন করো।’
ছেলেটি বলল ‘দুটো ভ্যাকচিন হয়ে গেচে। আর কিচ্চু হবে না।’
কিরণবাবু
– ‘ঠিক আছে, তোমার কিছু হবে না বুঝলাম, কিন্তু অন্যের তো হতে পারে!’
ছেলেটি -
‘করোনাকে এখানে ঢুকতে দিইনি, এখান থেকে তাইড়ে দিচি।’
কিরণবাবু
ছেলেটির হাত স্যানিটাইজ করে দিলেন এবং ওজন করার পরে আপেলের প্যাকেটটি নিতে নিতে মনে
মনে বললেন ‘করোনা তোমার পোষা পাখি তো তাই তাড়িয়ে দিয়েছ।’ দুশো টাকার একটি নোট বের
করে ছেলেটির হাতে দিলেন। ছেলেটি একশো দশ টাকা ফেরত দিল। টাকাগুলি ভিজে মতিহার
তামাকের মতো হয়ে গেছে।
কিরণবাবু
– ‘তোমার নোটগুলি এই অবস্থা কেন?
ছেলেটি –
‘আপনারা দিচ্ছেন তাই নিচ্চি। কি করবো স্যার আমরা তো আর চাকরি করি না যে বাড়ি বসে
বসে মাইনে পাব। আর ব্যাংক থেকে কড়কড়ে নোট তুলে বাজারে যাব।’
কিরণবাবুর
বুঝতে অসুবিধে হল না যে ছেলেটি তাকে উদ্দেশ্য করে এই বাক্যবাণ নিক্ষেপ করেছে।
প্রথমে মাথাটা গরম হয়ে উঠলেও একটু শান্ত হয়ে বললেন ‘লকডাউনে অফিস বন্ধ থাকলেও সবাই
তো ঘরে বসে কাজ করেছে।’
২
ছেলেটি –
‘ও সব কাজ আমার জানা আছে।’
কিরণবাবু
মনে মনে ভাবলেন ব্যাংক, পোস্ট অফিস, স্বাস্থ্য কর্মীদের মতো হয়তো তাঁদের অর্থাৎ
শিক্ষকদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়নি ঠিকই কিন্তু সবাই তো বাড়িতে বসে
যতটা সম্ভব ক্লাস করা, প্রশ্ন করা, খাতা দেখার কাজ করেছেন। তাই বলে ছেলেটি এভাবে
বলবে! তখন তাঁর মনে হল একটু প্রতিবাদ করা দরকার।
কিরণবাবু
– ‘ভাই তুমি এভাবে কথা বলছো কেন?
ছেলেটি –
‘তবে কীভাবে কথা বলবো? আপনি যেভাবে বলছেন আমিও সেভাবে বলছি।’
কিরণবাবুর
একটু আত্মসম্মানে আঘাত লাগলো। দীর্ঘ কুড়ি বছরের অধ্যাপনা জীবনে কেউ তাঁকে এভাবে
অসম্মান করেনি। একটু রাগত স্বরে বললেন – ‘তুমি যদি মানুষের সঙ্গে এভাবে ব্যবহার
করো তবে তোমার দোকানে দ্বিতীয়বার কেউ আসবে না!’
ছেলেটি –
‘যান যান, আপনার মতো খদ্দেরের দরকার নেই। ওই রকম ভদ্রলোক সারা দিনে আমার দোকানে
ঝুড়ি ঝুড়ি আসে।’
কিরণবাবু
কথাগুলি শোনার পর লজ্জায় অপমানে ক্ষোভে সেখান থেকে দ্রুত চলে গেলেন। যেতে যেতে
তাঁর মনে হল ‘একবার বাজার কমিটির কাছে যাই’, আবার মনে হল ‘থানায় গিয়ে বলি’। কিন্তু
এই দুর্ভাগা দেশে অভিযোগ জানিয়ে কোথাও যে কিছু হওয়ার নয় তা তিনি ভালো করেই জানেন।
তাই অযথা সময় ব্যয় না করে বাড়ির পথে পা বাড়ালেন। তাঁর মনে হল সরকারকে কোনো আয়কর বা
ল্যান্ড ট্যাক্স দিতে হয় না এদের। ট্রেন থেকে হাজার হাজার প্যাসেঞ্জার নামে আর এরা
সারাদিনে হাজার হাজার টাকা ইনকাম করে। তাই এভাবে খরিদ্দারের সঙ্গে দুর্ব্যবহার
করতে বাধে না। অর্থ প্রতিপত্তিবলে ভবিষ্যতে একদিন এই শ্রেণিই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ
করবে। সেদিন আর বেশি দেরি নাই। ফলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষে এটি একটি অশনি
সংকেত।
অণুগল্প- সিদ্ধার্থ সিংহ
অণুগল্প- বিজয়া দেব
অণুগল্প- চৈতন্য দাশ
অণুগল্প- আশিস মিশ্র
Wednesday, December 29, 2021
অণুগল্প- অমর চক্রবর্তী
অণুগল্প- রবীন বসু
প্রত্যাবর্তন
আজ আবার। আবার তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে। মাঝরাতে ওয়াশরুমে শাওয়ারের তলায় দাঁড়ায় মোহনা। অবিরল জলধারায় সে কিছু ধুয়ে ফেলতে চাইছে। জালি দিয়ে ঘসে ঘসে গা থেকে কী যেন তুলছে । বা তোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই সেই ঘৃণ্য অবলেপ মালিন্য সে তুলতে পারছে না। পরাজয়ের গ্লানি একরাশ লজ্জা নিয়ে তাকে কুঁকড়ে দিচ্ছে। শিরশির ঘৃণায় সারা শরীর বমি করতে চাইছে।
দু' বছরের বিয়ে। স্বামী সুপ্রতীম পেশায় মনোরোগ চিকিৎসক। আন্তর্জাতিক জার্নালে গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেল লেখেন। সভা-সমিতি চ্যানেলে মতামত রাখেন। অথচ বাড়ি ফিরে মনের হদিস তো দূরের কথা, শারীরিক অসুস্থতাও গ্রাহ্য করেন না। প্রতিরাতে বন্য মহিষ বা বরাহের মত সুঁচলো শিং ও দাঁত দিয়ে শিকারকে যেন ছিন্নভিন্ন করে এক আদিম ভোগে তৃপ্ত হয়।
য়্যুনিভারসিটির সহপাঠী অলোকেশের সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করেছে দু'বছর। ও পিএইচডি করতে চলে গেল জার্মানি। মোহনাও চাকরির পরীক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। শেষমেশ একটা বেসরকারি ব্যাঙ্কে ঢুকে অলোকেশকে মেল করেছিল। ও জানিয়েছিল তার এখন দেশে ফেরার কোন ইচ্ছেই নেই। আপাতত পোস্ট ডক্টরেট করছে। পরে এখানেই চাকরি। বাবার শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। মা চাইছিল মোহনার বিয়েটা হয়ে যাক। নেটে নানা ম্যাট্রিমনিয়াল সাইট সার্চ করে বাবা-মা তার জন্য পাত্র পছন্দ করেছিল। একমাত্র ছেলে, নিজেদের বনেদি বাড়ি। প্রফেসর-ডাক্তার। সুদর্শন। মায়ের পীড়াপীড়িতে বিয়েতে মত দিয়েছিল।
কিন্তু বিয়ের নামে প্রতিনিয়ত এই বলাৎকার, এই গার্হস্থ্য নরক তার আর সহ্য হচ্ছে না। লজ্জা আর অপমানে সে কাউকে বলতেও পারছে না। বাবা-মাকে তো নয়-ই। এখন দেয়ালে পিঠ ঢেকে গেছে। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে মোহনা ড্রয়িংয়ে বসে ছিল কতক্ষণ। শীতার্ত এক অনুভূতি তাকে অন্ধকার সুড়ঙ্গের উষ্ণতায় ডাকছে। সে প্রাগৈতিহাসিক জীব হয়ে হাঁটু ভেঙে হামাগুড়ি দেয়।
একসময় ভোর হয়। পাখি ডাকে। মোহনা তার মনের মধ্যেকার শীতার্ত রক্তাক্ত পাখিটাকে মুক্তি দিতে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ল। বাইরে উজ্জ্বল আলো। আঁচলটা গায়ে জড়িয়ে নিল ভালো করে।
কলিংবেল বাজল। এত সকালে কে এল? সীমাদেবী দরজা খুলে দেখেন, মেয়ে মোহনা।
"কীরে, তুই? এত সকালে !"
"আমি ফিরে এলাম, মা। একেবারে।"
অণুগল্প- শিবশঙ্কর দাস
বৌ
- বুঝেছো, এতগুলো ভাত খেতে পারব না। আর একটু কমাও।
- আর কমাতে হবে না। ঠিক পারবে।
- না না, এতগুলো খেতে পারবো না।
- কালকে তো বেশ খেয়ে নিয়েছিলে। আজকে পারবো না
পারবো না করছো কেন?
- কালকের চাইতেও তুমি বেশি দিয়েছো।
- আরে না বেশি দিইনি। ছোটো থালা বলে ওরকম মনে হচ্ছে।
খাওয়া শুরু করো দেখবে খাওয়া হয়ে গেছে।
- আরে পারব না বলছি তো। আর একটু কমাও।
- কমাতে হবে না। বলছি তো, তুমি পারবে। খাওয়া শুরু করো তো।
----
- দেখো অনেক খেয়েছি আর পারছি না। পেট একদম
ডাম্বুস হয়ে গেছে।
-আর তো ওটুকু আছে। ওটুকুও খেয়ে নাও।
-ওহ, আর পারছি না।
-ভাত ফেলবে না বলে দিচ্ছি! দাও, মুখে দাও! এই তো পারছো। দেখলে দিব্যি কেমন খেয়ে নিলে আর পারবোনা
পারবোনা করছিলে।
-পেটের মধ্যে কেমন যেন করছে।
-কিচ্ছু করছে না ওটা তোমার মনের বাতিক। যাও একটু বিশ্রাম করো। দেখবে সব ঠিক
হয়ে গেছে। আমি জানতাম তুমি পারবে। শুধু শুধু
তালবাহানা করছিলে। তোমাদের আমি চিনিনা না। তোমরা বাপ ব্যাটা সব এক। না বললে কিছু করবে না। যেই বললাম আমি সুড়সুড় করে
খেয়ে নিলে। ওকি কী হল তোমার? অমন করছো কেন?
-শরীরটা কেমন যেন করছে। গা গুলিয়ে উঠছে। ওয়াক... ।
-ওকি বমি হবে নাকি।
-কী জানি? শরীরের মধ্যে কেমন যেন করছে।
-শরীরের মধ্যে কেমন করছে সেটাও বুঝতে পারছ না। তোমার যে কী দশা হয়েছে। অতগুলো
যদি খেতেই না পারবে তাহলে খেলে কেন?
-তুমিই তো বললে।
-আমি বললেই তোমাকে খেতে হবে? তুমি নিজে বোঝ না কতটুকু
খেলে তোমার পেটে সইবে? সেটাও আমাকে বলে দিতে হবে? বোধটোধ কি একেবারে গেছে? তোমাদের
জন্য যত করছি ততো তোমরা অকর্মণ্য হয়ে উঠছো।
নাও এই হজমিটা খেয়ে নাও। আর কথায় কথায় বৌকে দোষ দেওয়ার স্বভাবটা একটু কমাও।
আমার মত বৌ পেয়েছো বলে বেঁচে গেলে নাহলে কী যে দশা হত তোমার আমি কল্পনাও করতে পারছি
না।
অণুগল্প- বীথি ব্রহ্ম
ঝালমুড়ির ঠোঙা
এতক্ষন লাগলো? আমায় বসিয়ে রাখলে এখানে
একা?
যা ভীড়! বিশাল লাইন! একা
কোথায়? সাথে সমুদ্রের ঢেউ তো আছে! নে ধর! খেয়ে নে!
বিয়ের পরও তুই তুকারি
ছাড়বে না?
তাতে অসুবিধা কোথায়? ভালোবাসার
কি ঘাটতি পড়েছে! আর তুই তো আমার প্ৰিয় বান্ধবীর বন্ধু রে!
এখন থেকেই অভ্যাস করো।
আসবে না এতো তাড়াতাড়ি!
সায়নীকে ই... আচ্ছা তোর সাথে সায়নীর আর যোগাযোগ নেই? ফেবুকেও পাস নি ওকে?
না! আগেও বলেছি। ভুলে
গেলে চলবে? তিতলির গলায় উষ্মা।
এই, এই দ্যাখ, ঝালমুড়ির
ঠোঙাটা আসলে একটা চিঠি! দীপন অবাক হয়ে বলে । তাও আবার প্রেমপত্র।
হ্যাঁ, তাই তো! আমারটাও
তাই! তিতলিও অবাক!
দুজনেই জোরে হেসে ওঠে।
এখনো লোকে ট্রু লাভ লেটার কাগজে কলমে লেখে ? তিতলি
বলে।
" কেন আমরা লিখি
নি! মেল বা মেসেজে লিখেছি তো!" দীপন আরেকবার ঝালমুড়ি মুখে দেয়!
একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল
জানিস তিতলি!
মাসতুতো দাদা তখন দীপশিখাদিকে
খুব ভালোবাসে। কিন্তু কিছুতেই ওকে বলতে পারছে না! তখন ওর বেস্ট ফ্রেন্ড সুনয়নীকে পটিয়ে
পাটিয়ে হাতে চিঠিটা দেয়। আর ওর হাতে হাতে রিপ্লাই আনতে বলে।
উফফ! কী সব ঝালমুড়ি আনো!
এতো ঝাল!
ওমা! তুই ঝাল ঝাল ই তো
পছন্দ করিস! আর ঝাল মুড়িতে তো.... তারপর শোন না , সুনয়নীদি দীপশিখাদির বেস্ট ফ্রেন্ড
হলেও চিঠিটা চেপে দেয়! আর অমিতাভদাকে বানিয়ে বানিয়ে লিখেছিলো যে, দীপশিখাদি ওকে পছন্দ
করে না। ওকে লোফার, রকবাজ ইত্যাদি বলেছে ।
আর কোনোদিন এইসব ঝালমুড়ি টুরি আনবে না!
উফফ! জিভ পুড়ে গেলো ঝালে! ভালো লাগে না এসব! ডিসগাস্টিং!
বুঝলি,
তারপরে কীভাবে ওই অখাদ্য, বাজে, লেখাপড়ায় কমা সুনয়নীদি দাদার ঘাড়ে চাপলো! আর সারাজীবন
ঘাড়মুটকে রেখেছে।... হা হা হা হা করে হাসে দীপন!
তিতলি তড়াক করে লাফ মেরে
উঠে দাঁড়ায়! ঝালমুড়ির ঠোঙাটাকে দুমড়ে মুচড়ে পিষে ছুঁড়ে মারে সামনে সমুদ্রের ঢেউয়ের
মাথায়।
তিতলি! একী! এভাবে রিএক্ট
করছিস কেন! কী হলো তোর?
অণুগল্প- জগদীশ মণ্ডল
আটটার ফোন
ঘড়িতে রাত আটটা বাজলেই একটি ফোন আসে ক্রিং ক্রিং। তখন রামবাবু
সঙ্গী সাথীদের কোনও কথাই আর কানে তোলেন না। জায়গা থেকে উঠে সোজা বাড়ির পথে হাঁটতে থাকেন। জিজ্ঞেস
করলে বলেন বাড়িতে কাজ আছে।
রোজদিন বারাসাত একনম্বর প্লাটফর্মে অবসরপ্রাপ্ত এবং বয়স্ক
বৃদ্ধরা আড্ডা দেয় । রামবাবুও নিয়ম করে আসেন। সুখ,দুঃখের কথা, নাতি নাতনি, ছেলে বৌমা,
কিছুই বাদ যায়না। মাঝে মাঝে সমাজ, রাজনীতি, বর্তমান প্রসঙ্গ নিয়েও আলোচনা চলে। হাসি
ঠাট্টায় জমে ওঠে বেশ। তর্কাতর্কিও কম হয়না। কিন্তু ফোন এলে রামবাবুর কথা থেমে যায়।
উঠে পড়েন ।
রামবাবু কয়েক দিন আর আসছেন
না। শোনা গেল ওনার গিন্নি খুব অসুস্থ,শয্যাশায়ী ।
আজ এসেছেন। বিভিন্ন কথা, গল্প
হচ্ছে। কিন্তু রামবাবু অংশগ্রহণ করছেন না। আটটা অনেক আগেই বেজে গেছে। অনেকে উঠে পড়েছেন।
কিন্তু রামবাবু উঠছেন না। একজন বলেই ফেললেন - দাদা আপনার তো এখনো ফোন এলো না।
রামবাবু বললেন আটটায় আর ফোন আসবে না। রাত হলেও কেউ শাসন করবে
না। এখন আমি মুক্ত বিহঙ্গ, স্বাধীন। বলতে বলতে চোখ দুটি সিক্ত হয়ে ওঠে।
অণুগল্প- বিষ্ণুপদ বালা
অণুগল্প- এস কবীর
বিচারের দাবি
দর্জি পাড়ার ছেলেগুলো কখন যে লেখাপড়া করে বোঝা দায়! পাড়ার ভিতরে ছোট্ট মাঠটিতে সারাক্ষণ কিচির- মিচির করতেই থাকে। কখনও কখনও অনেক রাত পর্যন্ত চলে এই পর্ব। বাড়ির গার্জেনরা কি কিছুই বলে না? ছোট্ট মুনুয়াও খেলে বন্ধুদের সঙ্গে কিন্তু ভীষণ ঝগরুটি! কেউ কিছু বললেই বাবাকে ডেকে আনে। হোমরা-চোমরা বাবা এসে দোষ-গুণ বিচার না করেই ওই ছোট ছোট বাচ্চাদের সাতগুষ্টি উদ্ধার করে দেয়। অন্যান্য বাবা-মায়েরা ভয়ে কিছু বলতে পারে না। এভাবেই চলতে থাকে দিনের পর দিন।
স্কুলে পড়ার সুবাদে পাশের পাড়া থেকেও অনেকই এ-পাড়ায় খেলতে আসে। সেবারও এসেছিল মাহিরা। কিছু একটা নিয়ে মুনুয়া ও মাহিরার গোল বাঁধে। দু'জনেই দু'জনের বাবা-মাকে ডাকতে ছুটে। মুনুয়ার বাবা হম্বিতম্বি করে তেড়ে আসে-'কোন্ রে মেরে বেটি কো সাতা-রে?- উস্-কি মা কি..."। গিয়েই দেখে মাহিরা'র বাবা মুস্তাফ ভাই মেয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ছ'ফুট দু-ইঞ্চি লম্বা, সুঠাম দেহের অধিকারী মুস্তাফ ভাই-কে দেখেই মুনুয়ার বাবা কাচুমাচু করতে লাগে। এই দেখে মুস্তাফ ভাই তাকে মারতে উদ্দত হয়ে বলে-'কা-রে তু আপনা বাচ্চি কি বাত্ শুনকার সবকা মা কা ইজ্জাত লেগা?' মুনুয়ার বাবা দেখে পরিস্থিতি খারাপ, কিছুতেই পেরে উঠবে না মাহিয়ার বাবাকে, ওদের বংশ তালিকাও বিশাল, তাই মানে মানে কেটে পড়ায় ভালো। সে মুনুয়ার হাত ধরে টানতে টানতে বলে-' চল্ বেটি ইঁহাসে, আল্লা ইস্-কা বিচার করে গা!'
অণুগল্প- গোবিন্দ বিশ্বাস
অণুগল্প- সঞ্জয় গায়েন
তৃতীয় নয়ন
কদিন ধরে সিঁদুর সিঁদুর করে জ্বালিয়ে মারছিল অভি।
সুলেখা তো ভয়ে একেবারে কেন্নোর মতো গুটিয়ে গিয়েছিল। এ আবার হয় নাকি! হলেও সিনেমায়-গল্পে-টিভি সিরিয়ালে হতে পারে। সেসব দেখতে দেখতে একটু আধটু পরকীয়ার স্বাদ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ঘরে ফিরে নিজস্ব পুরুষের বুকেই মুখ গোঁজা। অভ্যাসের আদর। অবশেষে বাথরুমে শাড়ি-ব্লাউজ ভিজিয়ে তৃপ্তির ঘুমে ঢলে পড়া। সুলেখা তার ভরা সংসারের এই নিশিলিপি কোনভাবেই পাল্টাতে পারবে না!
যদিও অভি কিছুতেই কিছু শুনতে চাইছিল না! হ্যাঁ, অভিকে ভালো লেগেছে। ভালওবেসেছে। তাই ব’লে সিঁদুর! নাঃ! নাঃ! এক সিঁথিতে দু’জনার সিঁদুর? ও পরতে পারবে না।
সুলেখা মনে মনে বরফ হয়ে ওঠে। কিছুতেই আর গলবে না! সেকথা বলতেই শেষবারের মতো অভির কাছে গিয়েছিল সুলেখা।
কিন্তু ও ভুলে গিয়েছিল আগুনের কাছে গেলে বরফ গলেই যায়। হলও তাই। অভির চোখভরা জল দেখে সুলেখা দুচোখ বুজিয়ে নিজেকে সঁপে দিল।
ঠিক তখনই অভি ঝুপ করে বসে পড়ে সুলেখার পায়ের কাছে। জয়ো জয়ো দেবী মন্ত্রোচ্চারণে সুলেখার দুপায়ে নেপে দেয় সিঁদুর। অভির এ হেন আচরণে, সুলেখা ডুকরে কেঁদে ওঠে, এ কি করলে তুমি!
অভি নিরুত্তর। শুধু বিভোর চোখে দেখতে থাকে সুলেখার দু-ই ভ্রুর মাঝে ফুটে ওঠা তৃতীয় নয়ন।
Tuesday, December 28, 2021
অণুগল্প- বাপন হাজরা
অণুগল্প- শুভেন্দু ঘোড়াই
ক্লাসঘর
দুটো বোর্ড ঝুলছিল পাশাপাশি।একটি ব্ল্যাক ও একটি হোয়াইট।
ব্ল্যাকবোর্ডের উপর সাদা চকে লেখা একটি শব্দ-'ইতিহাস'
অপু বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল-হোয়াইট বোর্ডের উপর কালো অক্ষরে লেখাকে কি বলে স্যার?
অপুর প্রশ্নে একমুহূর্ত থম খেলেন শিক্ষক। তারপর নিজের অবচেতন কাটিয়ে একটি ব্ল্যাক মার্কার পেন দিয়ে হোয়াইট বোর্ডটিতে লিখলেন-'মাৎস্য ন্যায়'!
অণুগল্প- অর্কপ্রভ ভট্টাচার্য
অণুগল্প- শিবানী বাগচী
অণুগল্প- অলোক পটুয়া
নাগফণীর উলকি
‘শোনো বাবলু ডিসেকশন রুমে তালাটা মেরে দিও। রিপোর্ট তৈরি আছে লকারে রেখে গেলাম। কাল চেম্বার
করে ওই এগারোটার দিকে আসব।”– এই বলে ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে ডাঃ শ্যামল হসপিটাল থেকে বেরিয়ে
গেল।
পরেরদিন সকাল সাত’টার সময় চেম্বারে প্রবেশ করার
মুহূর্তে রিসেপশনের নীলুকে বলে দিল– “পাঁচ মিনিট পর পেসেণ্ট ছেড়ো ।”
নীলু বলল– “ ঠিক আছে।”
ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় পেসেন্ট এল; পরিচিত অর্ধবয়স্কা দি’ভাই । শ্যামল ব্লাড রিপোর্ট
হাতে নিয়ে বলল – “দি’ভাই বসুন। এখন সুগারের সমস্যাটা কমেছে দেখছি। একটু হাঁটাচলা আর
খাওয়া–দাওয়া নিয়ম করে করলেই ব্যাস।”
সামনের টেবিলে রাখা একটা ছবি দেখিয়ে দি’ভাই সাহস
জুগিয়ে আজ জিজ্ঞাসা করে— “তোমার পিতা ?”
“ না না , আমার পিসেমশায়। বড়ো আর্টিস্ট, খুব নামযশ
দেশে–বিদেশে । আমি ছোটো থেকেই তার কাছে মানুষ কিন্তু একটিবারো তিনি আমায় তাঁর স্টুডিওতে
প্রবেশ করতে দেননি। এমনকি তাঁর ছেলেকেও না।
কেন কি জানি !”
আর একটা অর্ধোনগ্ন ছবির দিকে আঙুল দেখিয়ে দি’ভাই
বললেন – “ওটা কী ওনারই আঁকা ছবি ?”
“ হ্যাঁ।
আসল কপিটা লণ্ডনের মিউজিয়ামে আছে। আসলে ছবিটা তাঁর এক মডেলের প্রতিকৃতি।”
“আসল মডেলকে দেখেছ ?”
“ সে সুযোগ
আমাদের কারো ছিল না। ইচ্ছে ছিল পূরণ হয়নি। তবে বাম হাতে আঁকা ঐ যে ‘নাগফণীর উলকি’– ওটা নাকি সত্যিই তার বাম হাতে আছে ।”
“ দেখা হ’লে চিনতে পারবেন ? ”
“দেখা হলে তবেই তো। যাই হোক, নিয়ম করে চলুন আর
ওধুধগুলো কিনে নেবেন।… আসুন দি’ভাই।”
চেম্বার থেকে বেরিয়ে সোজা হসপিটাল পৌঁছায় শ্যামল। ডিসেকশন
রুমে আসতেই বাবলু বলল – “ডাক্তারবাবু সব রেডি করে রেখেছি।”
স্টারনাল স হাতে নিয়ে ডিসেকশন টেবিলের উপর রাখা
রূপবতী এক নগ্ন লাশের উপর থেকে কাপড় সরালে
শ্যামলের চোখ যায় বাম হাতের উপরের দিকে
– সেখানে রয়েছে ‘ নাগফণীর উলকি ’।
স্তম্ভিত শ্যামলের হাত থেকে স্টারনাল স পড়ে গিয়ে
ঝনঝন শব্দ করে ওঠে।
অণুগল্প- কৃষ্ণেন্দু দাসঠাকুর
দেশ
--আজ আমাকে সক্কাল সক্কাল বেরোতেই হবে করোনা পরিস্থিতি,
লকডাউনের মধ্যে সেলিব্রিটিদের কি করে সময় কাটছে এনিয়ে একজন নামি সেলিব্রেটির সাক্ষাৎকার নিতে হবে।
-- আরে গন্ধটা ক্রমশ বাড়ছে... আর ও আজ কোন এম.এল.এ
চাল,আলু বিলি করবে... কাল কতজন করোনা আক্রান্ত হলো... এ-নিয়েই ব্যাস্ত...
-- গন্ধ যখন ক্রমশ বাড়ছে, তখন কিছুদিন পর কমবে;
আর কমতে কমতে একদিন ভ্যানিশ হয়ে যাবে। ততদিন তুমি না হয় রুম স্প্রে ইউজ করো...
--বাঃ। গন্ধের উৎস না খুঁজে...ক্যামেরা, বুম হাতে
আমায় গন্ধ চাপা দেওয়ার পন্থা দিচ্ছিস...
অণুগল্প- শুভ দত্ত
সাঁকো
শাশ্বত একরাশ বিরক্তি নিয়ে হনহন করে এগিয়ে গেল
কিছুটা। দাঁতে দাঁত চিপে বিড়বিড় করে বলল -
কেন যে মরতে বলতে গিয়েছিলাম, নেকু একটা।
পল্লবী দৌড়ে গিয়ে জাপটে ধরল ওকে।
আহ! কি হচ্ছে টা কি?
গল্পটা আর একবার বলো। বলো না গো। নাহলে কিন্তু....
ছাড়তো। বলছি। শাশ্বত একটা সিগারেট ধরাল। ক্রমে
অধৈর্য হয়ে উঠছিল সে। কাটা কাটা ভাবে বলল " একটা সাঁকো ছিল। সাঁকোটার মালিক ছিল
একটা দৈত্য। সে কাউকে ওর সাঁকো পার হতে দিত না। কেউ পার হওয়ার চেষ্টা করলেই ছুঁড়ে ফেলে
দিত যেদিক থেকে সে এসেছিল।" একনিশ্বাসে গল্প বলে শাশ্বত থামল। বলল - শান্তি!
পল্লবী তখনো ওর হাতটা ধরেছিল। আরো জড়িয়ে ধরে কাঁধে
মাথা রাখতে রাখতে বলল,- ইস! কি ভালোই না হতো যদি এই সাঁকোটার মালিক একটা দৈত্য হতো।
সিগারেট ফেলে দিয়ে শাশ্বত হাসতে লাগল। বলল - হ্যাঁ।
সে আর বলতে, শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার ঝক্কি থেকে অন্তত রেহাই পাওয়া যেত।
ধুস! তুমি খুব আনরোমান্টিক। এই সাঁকোটা যদি দৈত্যটার
হতো, আমরা সারারাত ধরে সাঁকো পেরোতাম। কি মজাই না হতো বলো?
২
পল্লবী এখন রোজ আসে সাঁকোটাতে। অনেকক্ষণ ধরে চেয়ে
চেয়ে দেখে, সাঁকোটাকে। সাদা-কালো অথবা খয়েরি রঙের খড়ি দিয়ে সাঁকোটার উপর ঘর বানায়।
তারপর পার হয় সাবধানে। বারবার। প্রতিনিয়ত। নিজেকে সাহস জোগায়। আর মনে করায় নিজেকে
- যদি দৈত্য বেড়িয়ে আসে ঘরটা থেকে ঘুরে যেতে হবে ওকে। যেদিকে শাশ্বত থাকে তার উল্টো
দিকে। তাহলেই দৈত্য তাকে ছুঁড়ে দেবে শাশ্বতর দিকে।
দিন যায়...
মাস যায়...
বছর যায়...
দৈত্য আসে না। দৈত্য একবারই এসেছিল। বন্ধ্যাত্ব
নিয়ে। বাঁজা অপবাদ দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গেছে বাপের বাড়িতে।
অণুগল্প- অন্তরা সরকার
সিঁড়ি
মলয় স্যারের নম্বরটা ব্লক
করে দিয়ে অদ্ভুত তৃপ্তি পেল পর্ণা । হোয়াটসাপের মেসেজগুলো মুছে দিয়ে সেখানেও ব্লক করলো
। উফ্ কত্ত মেসেজ ! তিন বছরের সম্পর্ক । পর্ণা মনে মনে হাসল ।
স্কুলে থাকতে তাকে কেউ
ভালো ছাত্রীর দলেই ফেলত না, আর আজ ? একাশি পার্সেন্ট নম্বর পেয়ে সে এখন ইতিহাসে অনার্স
। এতদিন কলেজে ছোট একটা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠত । এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বড়ো সিঁড়ি পেরোতে
হবে ওকে । তবে পর্ণা যে পারবে, সে বিশ্বাস ওর আছে ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ’র
ক্লাস শুরু হয়েছে মাস দুয়েক হলো । এই কদিন সে খুঁজেছে, কোন সিঁড়িটা ব্যবহার করলে তাড়াতাড়ি
উপরে ওঠা যায় । তাকে তো অনেক উপরে উঠতে হবে !
ইতিহাস বিভাগের মানস স্যার
একজন উঁচুদরের মানুষ । অবিবাহিত, সুদর্শন । উপর মহলে প্রচুর হাত ।
এই দু’মাসেই পর্ণা ছাত্র
ও শিক্ষকমহলে যথেষ্ঠ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে, সৌজন্য ওর রূপের বিদ্যুতছটা । মানস স্যার
ছাত্রছাত্রী মহলে খুবই জনপ্রিয়। উনি যখন যেখানে যান, এক ঝাঁক ছেলেমেয়ে তাঁর সাথে দেখা
যায় । ট্রেনে স্যারের সাথে ফেরে পর্ণার দল
। কিন্তু স্যারের পাশের সিটটা যে পর্ণার, সেটা এই ক’দিনেই সবাই বুঝে গেছে ।
কিছুদিন হলো পর্ণা মনমরা
। সাজগোজ নেই, হাসি নেই । রাতে শুয়ে সে ভাবে - মাছরাঙার কাছে তো অনেক মাছই প্রিয় ।
অলোকানন্দার কথা মনে পড়ে । লম্বা চুল, কাঁচা হলুদের মতো গায়ের রং । আর ওই মেয়েটা ?
শ্বেতাঙ্গিনীদের মতো সাদা, হিলহিলে ফিগার । এরা সব মানস স্যারের রিসার্চ স্কলার । এই
দুজন নাকি স্যারের খুব প্রিয় ।
আর ভাবতে পারছেনা পর্ণা । কিছু একটা করতেই হবে ওকে
। এত সহজে হেরে যাবে না । ফোন করে বন্ধু চন্দ্রিমাকে । দুজনে মিলে অনেকক্ষণ পরামর্শ করে।
পরপর কয়েকদিন পর্নাকে
ক্লাসে না পেয়ে মানস স্যার ডেকে পাঠান চন্দ্রিমাকে। ওর কথাগুলো মন দিয়ে শুনে খানিকক্ষণ
কি যেন ভাবলেন । মনে হয় কিছু একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি ।
অনেকদিন পর পর্ণা আজ ট্রেনে
। সে আর চন্দ্রিমা আজ স্যার-এর কামরায় ওঠেনি । ট্রেন থেকে নেমে পর্ণা আড়চোখে দেখে নেয়, স্যার নেমেছেন, সাথে ছেলেমেয়েরা
।
আচমকাই "উফ্"
বলে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে পর্ণা । চন্দ্রিমা ব্যস্ত হয়ে পর্ণার মাথায়, ঘাড়ে জল দিতে
থাকে । পর্ণার চোখ আধখোলা । দেখতে পাচ্ছে স্যার এগিয়ে আসছেন ওর দিকে, সঙ্গের ছেলেমেয়েরা
ওভারব্রিজে উঠে চলে যাচ্ছে । যাকে অনেকের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চাওয়ার নিদারুণ লড়াইয়ে
নেমেছে পর্ণা সেই মানুষটা এগিয়ে আসছে ওর দিকে, নিশ্চিত ওরই দিকে ।
নিশ্চিন্তমনে চন্দ্রিমার ঘাড়ে এলিয়ে
পড়ে পর্ণা ।
