মুক্তি পথের যাত্রী
ঘুম ভাঙল একটা অদ্ভুতরকম শব্দে, সাধারণত এরকম শব্দ আগে কখনও শুনিনি । নাকে এল একটা মৃদু সুগন্ধ, বলা বাহুল্য এরকম গন্ধও আগে কখনও পাইনি । একটা অদ্ভুত রকমের আবেশে মনটা ভরে উঠল । সাধারণত ঘুম ভাঙার পর মনের মধ্যে একটা স্নিগ্ধতা লেগে থাকে, সেই অনুভূতি আমি জানি কিন্তু এটা সেরকম নয়, অন্যরকমের অজানা অনুভূতি । আমার মাথায় যেন কোন ভার নেই, শরীরটাও হাল্কা খুব । একটু মন দিয়ে ভাবার চেষ্টা করলাম । ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম । অস্বাভাবিক কিছুই ঠেকল না । আমার নিজের ঘরে, নিজের বিছানাতেই শুয়ে আছি ঠিক যেমন রোজ শুই । চারপাশে প্রাত্যহিক জীবনের মৃদু কোলাহলও শুনতে পাচ্ছি । তবু আজ কেমন যেন অন্যরকম লাগছে । মনের মধ্যে অদ্ভুত এক প্রশান্তি ।
আমার অফিসের যে কলিগটাকে আমি দু’চক্ষে দেখতে পারি না হটাৎ তার কথা মনে পড়ল । কালকেই তার প্রোমোশন আটকাবার জন্য বসের কাছে চুকলি করে এসেছি । এখন মনে হচ্ছে না করলেই হতো, সেও তো দুটো পয়সার জন্যই গায়ে গতরে খাটছে ।
বড়রাস্তার ধারে একটা জায়গা নিয়ে ছোটভাইয়ের সাথে চুলোচুলি চলছে অনেকদিন ধরেই । প্লটটা ভালো, বেচলে দাম পাওয়া যাবে অনেক । আমি জায়গাটা ছাড়তে রাজি নই অথচ জানি একটু কম্প্রমাইস করলে ভাইটার উপকারই হয় । চাকরি চলে যাওয়ার পর থেকে বেচারা বড় কষ্টে আছে । টানাটানি চলছে । ভাবলাম আর ঝামেলা করবো না ও যদি দু’ছটাক বেশি নিতে চায় তো নিক, আমি ছেড়ে দেবো ।
হাতখরচার জন্য ছেলেটা ক’দিন ধরেই বলছে, আমি দাবড়ি দিয়ে বলেছিলাম ‘আগে ইনকাম করো, বাপের হোটেলে খাচ্ছ দাচ্ছ ঘুরে বেড়াচ্ছ, লজ্জা করে না’ ছেলেটা মুখ কালো করে চলে গিয়েছিলো । এখন মনে হচ্ছে অমন করে না বললেই হত । চাকরীর চেষ্টা তো ও নিজেও করছে অনেক, না পেলে কি করবে । চারপাশে কত শিক্ষিত ছেলে বেকার ফ্যাফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।
সেদিন গিন্নিকেও ঝেড়ে দিয়েছিলাম বেশ কষিয়ে । ‘মাগনার পয়সা নয়’ এমন একটা কটু কথাও বলেছিলাম । আসলে মধ্যবিত্ত গৃহস্থ তো, পয়সার জন্য মেজাজ খিঁচরে থাকে সবসময় । কিন্তু এখন মনে হচ্ছে অতটা ঝাঁজ না দেখালেই হতো ।
কিন্তু কেন মনে হচ্ছে ? কই এতদিন তো মনে হয়নি ! আমি তো সেই মিডল ক্লাস বাঙালি যে রোজ ভিড় ঠেঙিয়ে অফিস করি, দরদাম করে বাজার-হাট করি, আঙুল টিপে টিপে খরচ বাঁচাই আর সারা পৃথিবীর সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করে ঘরে ফিরে বউ ছেলের চৌহত্তির মধ্যে রাজা-উজির হয়ে ওঠার চেষ্টা করি । এর অন্যথা হয়নি কোনদিন, আজ কি এমন হল ?
খানিকক্ষণ ভাবলাম । তারপর আশ্চর্য হয়ে দেখলাম ডাঃ ব্যনার্জি আমার ঘরে এলেন, বিছানায় শোয়া বডির ওপর টেথোস্কোপ লাগিয়ে খানিকক্ষণ দেখলেন । তারপর ডানহাতের নাড়ি টিপে ঘাড় নেড়ে উঠে পড়লেন । ছেলে পাশে দাঁড়িয়ে ছিল । ডাঃ ব্যানার্জি ফিসফিস করে বললেন ‘নেই ! তবু একবার হসপিটালে নিয়ে যাও’ । বউ হুড়মুড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল ।
আমি এই শান্ত সুন্দর সকালে গোটা পৃথিবীর সঙ্গে শান্তিচুক্তির মনোবাসনা নিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্ত মুক্তির দিকে ক্রমশ এগিয়ে যেতে থাকলাম ।
No comments:
Post a Comment