অশনি সংকেত
কিরণবাবু
ক্যানিং স্টেশন নেমে অটো ধরার জন্য জনস্রোতে পা মেলাতে মেলাতে ভাবছিলেন বাড়ির জন্য
একটু ফল নিতে হবে।
দুই পাশে
ফলের দোকান সার দিয়ে সাজানো। সবাই হাঁকছে ‘দাদা আসুন, স্যার আসুন।
আপেল নোব্বুই টাকা কিলো। কোমলা লেবু পাঁচটা পঞ্চাশ ইত্যাদি ...।’
কিরণবাবু
একটা দোকানের সামনে দাঁড়ালেন। দোকানদার একটি অল্পবয়সী ছেলে। গোলগাল চেহারা। গায়ের
রঙ একটু ময়লা। ছেলেটাকে দেখে তাঁর বেশ পাকাপোক্ত মনে হল ।
কিরণবাবু
–‘ভাই, আপেল কত করে?’
দোকানদার
– ‘অ্যাক কেজি নোব্বুই টাকা’।
কিরণবাবু
এক কেজি আপেল বেছে ছেলেটির হাতে দেওয়ার সময়েই ছেলেটি দুহাতে মুখ চাপা দিয়ে একটু
কেশে নিল।
কিরণবাবু
আপেলগুলি ছেলেটির হাতে না দিয়ে একটু রাগত স্বরে বললেন – ‘মাস্ক পরনি কেন ভাই? আগে
হাত স্যানিটাইজ করো, তারপর আপেল ওজন করো।’
ছেলেটি বলল ‘দুটো ভ্যাকচিন হয়ে গেচে। আর কিচ্চু হবে না।’
কিরণবাবু
– ‘ঠিক আছে, তোমার কিছু হবে না বুঝলাম, কিন্তু অন্যের তো হতে পারে!’
ছেলেটি -
‘করোনাকে এখানে ঢুকতে দিইনি, এখান থেকে তাইড়ে দিচি।’
কিরণবাবু
ছেলেটির হাত স্যানিটাইজ করে দিলেন এবং ওজন করার পরে আপেলের প্যাকেটটি নিতে নিতে মনে
মনে বললেন ‘করোনা তোমার পোষা পাখি তো তাই তাড়িয়ে দিয়েছ।’ দুশো টাকার একটি নোট বের
করে ছেলেটির হাতে দিলেন। ছেলেটি একশো দশ টাকা ফেরত দিল। টাকাগুলি ভিজে মতিহার
তামাকের মতো হয়ে গেছে।
কিরণবাবু
– ‘তোমার নোটগুলি এই অবস্থা কেন?
ছেলেটি –
‘আপনারা দিচ্ছেন তাই নিচ্চি। কি করবো স্যার আমরা তো আর চাকরি করি না যে বাড়ি বসে
বসে মাইনে পাব। আর ব্যাংক থেকে কড়কড়ে নোট তুলে বাজারে যাব।’
কিরণবাবুর
বুঝতে অসুবিধে হল না যে ছেলেটি তাকে উদ্দেশ্য করে এই বাক্যবাণ নিক্ষেপ করেছে।
প্রথমে মাথাটা গরম হয়ে উঠলেও একটু শান্ত হয়ে বললেন ‘লকডাউনে অফিস বন্ধ থাকলেও সবাই
তো ঘরে বসে কাজ করেছে।’
২
ছেলেটি –
‘ও সব কাজ আমার জানা আছে।’
কিরণবাবু
মনে মনে ভাবলেন ব্যাংক, পোস্ট অফিস, স্বাস্থ্য কর্মীদের মতো হয়তো তাঁদের অর্থাৎ
শিক্ষকদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়নি ঠিকই কিন্তু সবাই তো বাড়িতে বসে
যতটা সম্ভব ক্লাস করা, প্রশ্ন করা, খাতা দেখার কাজ করেছেন। তাই বলে ছেলেটি এভাবে
বলবে! তখন তাঁর মনে হল একটু প্রতিবাদ করা দরকার।
কিরণবাবু
– ‘ভাই তুমি এভাবে কথা বলছো কেন?
ছেলেটি –
‘তবে কীভাবে কথা বলবো? আপনি যেভাবে বলছেন আমিও সেভাবে বলছি।’
কিরণবাবুর
একটু আত্মসম্মানে আঘাত লাগলো। দীর্ঘ কুড়ি বছরের অধ্যাপনা জীবনে কেউ তাঁকে এভাবে
অসম্মান করেনি। একটু রাগত স্বরে বললেন – ‘তুমি যদি মানুষের সঙ্গে এভাবে ব্যবহার
করো তবে তোমার দোকানে দ্বিতীয়বার কেউ আসবে না!’
ছেলেটি –
‘যান যান, আপনার মতো খদ্দেরের দরকার নেই। ওই রকম ভদ্রলোক সারা দিনে আমার দোকানে
ঝুড়ি ঝুড়ি আসে।’
কিরণবাবু
কথাগুলি শোনার পর লজ্জায় অপমানে ক্ষোভে সেখান থেকে দ্রুত চলে গেলেন। যেতে যেতে
তাঁর মনে হল ‘একবার বাজার কমিটির কাছে যাই’, আবার মনে হল ‘থানায় গিয়ে বলি’। কিন্তু
এই দুর্ভাগা দেশে অভিযোগ জানিয়ে কোথাও যে কিছু হওয়ার নয় তা তিনি ভালো করেই জানেন।
তাই অযথা সময় ব্যয় না করে বাড়ির পথে পা বাড়ালেন। তাঁর মনে হল সরকারকে কোনো আয়কর বা
ল্যান্ড ট্যাক্স দিতে হয় না এদের। ট্রেন থেকে হাজার হাজার প্যাসেঞ্জার নামে আর এরা
সারাদিনে হাজার হাজার টাকা ইনকাম করে। তাই এভাবে খরিদ্দারের সঙ্গে দুর্ব্যবহার
করতে বাধে না। অর্থ প্রতিপত্তিবলে ভবিষ্যতে একদিন এই শ্রেণিই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ
করবে। সেদিন আর বেশি দেরি নাই। ফলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষে এটি একটি অশনি
সংকেত।
খুব প্রাসঙ্গিক একটি গল্প
ReplyDelete