লাইভ সার্টিফিকেট
ও বিপ্লবীদাদু! কী হয়েছে তোমার? এমন
ভেবলিয়ে দাওয়াই বসে আছো?
নব্বই বছরের বুড়োটার ঘোলাটে চোখে জলের ধারা। নড়ণ-চড়ণ নেই, বাক্যহারা।
সন্তোষ এবার দাওয়াই উঠে বিপ্লবীদাদুর ঘরে উঁকি মারে। দরজার
সামনেই একটা মান্ধাতা আমলের তোরঙ্গ, ডালা খোলা। ভেতরে কিছু পুরনো কাগজপত্র, একটা
অনেক পুরনো জাতীয় পতাকা ভাঁজ করে রাখা। তার উপরে কয়েকটা আরশোলা ঘুরে
বেড়াচ্ছে।
দাদু, বাক্সে কিছু খুঁজছিলে নাকি?
এবার মানুষটার ঠোঁটনড়া ভাষা হয়ে ফোটে — হ্যাঁ, চিঠি।
চিঠি! সে তো আমার কাছে। সকালে তো তুমি আমাকে পড়তে দিলে। পড়ে বললাম, পেনশন
বিভাগ তোমার 'লাইভ সার্টিফিকেট' জমা
দিতে বলেছে। তা না হলে এ মাস থেকে পেনশন পাবে না। তুমি
তো চিঠিটা আমাকে দিলে! ব্যাংকের ম্যানেজারের কাজ থেকে বলে-কয়ে লাইভ সার্টিফিকেটে
সই করে আনার জন্য। সব ভুলে গেলে?
না রে সন্তোষ, ওটা নয়, এটা খুঁজছিলাম। এই
দ্যাখ!
সন্তোষ হাত বাড়িয়ে নেয় একটা বাদামী হয়ে যাওয়া ভাঁজ করা কাগজ। আলগোছে
কাগজের ভাঁজ খোলে। কাগজের মাথায় অশোক স্তম্ভ,
নিচে মোটা অক্ষরে লেখা — 'অনারেবল
ফ্রিডম ফাইটার বিধুভূষণ ভট্টাচার্য'। তার নিচে ছোট অক্ষরে লেখাগুলো সন্তোষের পড়ার
ধৈর্য থাকে না। চিঠির নিচে স্বাক্ষর — ইন্দিরা
গান্ধী, প্রাইম মিনিস্টার।
বিপ্লবীদাদুর ক্ষীণ কণ্ঠস্বর
— এ চিঠিটাই আমার সত্যিকারের 'লাইভ সার্টিফিকেট' রে! স্বাধীনতা
সংগ্রামের পেনশন স্যাংশন আর রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে তাম্রফলক নেওয়ার আমন্ত্রণপত্র
এটা।
এখন এটার কী দরকার দাদু?
এটাই মহা মূল্যবান রে! তখন এটা না পেলে আমাদের লড়াইয়ে স্বাধীন হওয়া দেশে, পরাধীন
এই সংসারে বেঁচে থাকার মতন খাবারও জুটত না।
দাদু, আবার কেন এসব কথা! অনেকবার শুনেছি। সব মনে আছে।
এই কথাটা মনে আছে তো?
কী কথা?
আমি মরলে বাক্সে রাখা ওই জাতীয় পতাকাটা দিয়ে আমার মরদেহ ঢাকা দিয়ে দিবি। আর ওই তাম্রফলকটা আমার
চিতার উপর চাপিয়ে দিবি।
সে তো এখনো দেরি আছে দাদু!
না রে! আর
দেরি নেই। তুই দেখিস, আর
কয়েকদিন পর পনেরোই আগস্ট আমি স্বাধীন হয়ে যাব। আমার বেঁচে থাকার প্রমাণ দেওয়ার ইচ্ছেটা আর নেই রে!
No comments:
Post a Comment