Thursday, December 30, 2021

অচিনপাখি * অণুগল্প সংখ্যা


অচিনপাখি ডিজিটাল (ব্লগ) * অষ্টম সংখ্যা * নবম বর্ষ, নভেম্বর- ২০২১ 


সম্পাদনা - ধর্মেন্দ্র বিশ্বাস ও মণিকা বিশ্বাস
অনলাইন সম্পাদনা - ধর্মেন্দ্র বিশ্বাস

প্রচ্ছদ - মণিকা বিশ্বাস


অচিনপাখির ঠিকানা -

 মেঘতরনঙ্গ ভবন
         পো:-কাঁদোয়া, নাকাশিপাড়া, কৃষ্ণনগর, নদিয়া, সূচক: ৭৪১১৩৮


*** 

WhatsApp No - + 91  9609513423 & 9734645123

Mail Id - achinpakhipotrika@gmail.com 

Facebook Page -: https://www.facebook.com/অচিনপাখি-পত্রিকা-ও-প্রকাশন-100351232295155/ 

*************

সম্পাদকীয়

এই সময়ে দাঁড়িয়ে অণুগল্প চর্চা একটু বেশি মাত্রায় চোখে পড়ছে । এটা সাহিত্যের পক্ষে শুভ । অচিনপাখি প্রকাশন প্রকাশিত ২০১৯-এ 'একশো অণুগল্প' গ্রন্থটি বেশ সমাদৃত হয়েছে । সেই আবেশ এখনও জড়িয়ে আছে । অচিনপাখি পত্রিকায় বরাবরই অণুগল্প ছাপা হয় । প্রিন্টেড এবং ডিজিটাল দুই মাধ্যমেই । এই সংখ্যাটিতে ৩০ জন লেখক লেখিকার অণুগল্প প্রকাশ হল । আগামীতে একটি অণুগল্প সংকলন গ্রন্থের কাজ চলছে । সকলেই লেখা পাঠাতে পারেন । 
                                  সকলে সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, অচিনপাখি পত্রিকা পড়তে থাকুন । সঙ্গে থাকুন ।
                                             নমস্কারান্তে-
                                   ধর্মেন্দ্র বিশ্বাস ও মণিকা বিশ্বাস
                                   সম্পাদক- অচিনপাখি পত্রিকা

সূচিপত্র

                                 অচিনপাখি
          সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা
          অণুগল্প সংখ্যা *  নবম বর্ষ * নভেম্বর-২০২১
             
                                
                                   অণুগল্প
আবীর গুপ্ত * কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় * সুকুমার রুজ * বিপ্লব মাজী * অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায় * মিলনকান্তি বিশ্বাস * সিদ্ধার্থ সিংহ * বিজয়া দেব * চৈতন্য দাশ * আশিস মিশ্র * অমর চক্রবর্তী * রবীন বসু * শিবশঙ্কর দাস * বীথি ব্রহ্ম * জগদীশ মণ্ডল * বিষ্ণুপদ বালা * এস কবীর * গোবিন্দ বিশ্বাস * সঞ্জয় গায়েন * বাপন হাজরা * শুভেন্দু ঘোড়াই * অর্কপ্রভ ভট্টাচার্য * শিবানী বাগচী *   অলোক পটুয়া * কৃষ্ণেন্দু দাস ঠাকুর * শুভ দত্ত * অন্তরা সরকার * সুমন্ত কুন্ডু *  মণিকা বিশ্বাস * ধর্মেন্দ্র বিশ্বাস

অণুগল্প- আবীর গুপ্ত

আত্মহত্যার নেপথ্যে


সমীরে মন ভয়ঙ্কর খারাপ কারণ ও যাকে গভীরভাবে ভালবাসে সেই রিমি আজ আত্মহত্যা করেছে। রিমি ওদের বাড়ির একতলায় ভাড়া থাকতো। ডেড বডি বাড়ি থেকে বার করে রাস্তায় রাখা হয়েছে। এবারে পুলিশ পোস্টমর্টেমের জন্য নিয়ে যাবে। রিমি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করলো কেন! প্রাথমিক ইনভেস্টিগেশনের পর পুলিশের ধারণা রিমি অন্তত চার মাসের প্রেগন্যান্ট ছিল। অবিবাহিতা মেয়ে হিসাবে লজ্জার হাত থেকে বাঁচতে আত্মহত্যা করেছে। 

রিমির বাবা-মার হঠাৎ একটি দুর্ঘটনায় একসঙ্গে মৃত্যুর পর আর্থিক টানাটানির মধ্যে পড়ে সমীরের কাছে আসে। সমীর ওর বাবাকে বলে কর্পোরেশনে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেয় কারণ সমীরের বাবা কর্পোরেশনের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। রিমির আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটে। চাকরি পাওয়ার পর প্রথমদিকে যোগাযোগ রাখলেও পরের দিকে কেন জানিনা ওকে অ্যাভয়েড করতে শুরু করে দেয়! অথচ, রিমি ছাড়া সমীর তো কল্পনাই করতে পারে না। 

সমীর একটা কাগজে লিখল – “আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়”। কাগজটা পকেটে পুরে তিনতলার ছাদ থেকে নিচে লাফ দিল। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু। আরেকটা আত্মহত্যা। সমীরের বন্ধুদের ধারণা রিমির জন্যই আত্মহত্যা সমীর আত্মহত্যা করেছে। আসল কারণ কিন্তু অন্য, সেটা ও ছাড়া আর কেউ জানে না। সমীর দিন কয়েক আগে নিজের বাবাকে রিমির সঙ্গে একতলায় রিমির শোবার ঘরে আপত্তিজনক অবস্থায় দেখেছিল। সমীরের বাবা রিমিকে চাকরি দিয়েছিলেন এই জন্যই। রিমি ওর রক্ষিত হয়ে ছিল। এটাই সমীরের আত্মহত্যার কারণ।

অণুগল্প- কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

বাপ

 

‘ডাগদরসাব ! এ ডাগদরসাব !’

ডঃ চৌধুরী চমকে উঠলেন । জবুথবু এক বৃদ্ধ, জরাজীর্ণ চেহারা, তাঁকে ডাকছে বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে । কে ও ? আগে তো কোনদিন দেখেছেন বলে মনে হয় না । অথচ এই সন্ধেবেলা

রীতিমতো বিরক্ত হলেন ডঃ চৌধুরী । এক বছর হল তিনি এখানে বদলি হয়ে এসেছেন । মফঃস্বলের একদম প্রান্তে একটেরে এই মর্গটা, আর তারই লাগোয়া তাঁর কোয়ার্টার । চারপাশে কোনও দোকানপাট নেই, এমনকি কথা বলার কোন লোক । তাই সারাদিন নোংরা, পচা মৃতদেহ ঘাঁটাঘাঁটি করার পর সন্ধেবেলা একা একা এই নির্জন বারান্দায় বসে মদ্যপান করাটাই তাঁর এন্টারটেইনমেন্ট । এই সময় অন্য কোন ঝামেলা তাঁর ভাল লাগে না । অথচ আজ এই উটকো লোকটা

গজগজ করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন ডঃ চৌধুরী । জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই বুড়ো লোকটা হাঁউমাউ করে যা বলল তার অর্থ, গত দুদিন ধরে ট্রেনে কাটা পড়া যে বেওয়ারিশ লাশটা এখানে রয়েছে, সে একবার তাকে দেখতে চায় । একেবারে নাছোড়বান্দা । ডাক্তারবাবুর কোন কথাই সে শুনতে চায় না ।

অগত্যা অনেক দোনামনা করে শেষটায় রাজি হলেন ডঃ চৌধুরী । তাকে নিয়ে গিয়ে মর্গ থেকে টেনে বার করলেন সেই বাক্সটাতারপর মুখের ঢাকাটা এক টানে খুলে দিতেই চিৎকার করে কেঁদে উঠলো লোকটা, ‘বাপজান রে

সকালবেলা ডাক্তার কাগজপত্র রেডি করছিলেন । বাবা আসবে ছেলের লাশ নিয়ে যেতে । তার বদলে এল একদল লোক । দূরের বস্তি থেকে এসেছে তারাআদিবাসীর দল । তারা শনাক্ত করল, লাশটা তাদের পাড়ার ভিখু সোরেনের ।

আর তার বাপ ?

শুনে অবাক হয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে ওরা । ডাগদরসাব কার কথা বলছে ? ভিখুর বাপ ? সে তো মারা গেছে আজ থেকে চোদ্দ বছর আগে !

অণুগল্প- সুকুমার রুজ

লাই সার্টিফিকেট


  ও বিপ্লবীদাদু! কী হয়েছে তোমার? এমন ভেবলিয়ে দাওয়াই বসে আছো?  

  নব্বই বছরের বুড়োটার ঘোলাটে চোখে জলের ধারা ড়ণ-চড়ণ নেই, বাক্যহারা  

  সন্তোষ এবার দাওয়াই উঠে বিপ্লবীদাদুর ঘরে উঁকি মারে দরজার সামনেই একটা মান্ধাতা আমলের তোরঙ্গ, ডালা খোলা ভেতরে কিছু পুরনো কাগজপত্র, একটা অনেক পুরনো জাতীয় পতাকা ভাঁজ করে রাখা তার উপরে কয়েকটা আরশোলা ঘুরে বেড়াচ্ছে  

  দাদু, বাক্সে কিছু খুঁজছিলে নাকি?  

  এবার মানুষটার ঠোঁটনড়া ভাষা হয়ে ফোটে — হ্যাঁ, চিঠি       

  চিঠি! সে তো আমার কাছে সকালে তো তুমি আমাকে পড়তে দিলে পড়ে বললাম, পেনশন বিভাগ তোমার  'লাই সার্টিফিকেট' জমা দিতে বলেছে তা না হলে এ মাস থেকে পেনশন পাবে না তুমি তো চিঠিটা আমাকে দিলে! ব্যাংকের ম্যানেজারের কাজ থেকে বলে-কয়ে লাইভ সার্টিফিকেটে সই করে আনার জন্য সব ভুলে গেলে?   

  না রে সন্তোষ, ওটা নয়, এটা খুঁজছিলাম এই দ্যা!     

  সন্তোষ হাত বাড়িয়ে নেয় একটা বাদামী হয়ে যাওয়া ভাঁজ করা কাগজ আলগোছে কাগজের ভাঁজ খোলে।   কাগজের মাথায় অশোক স্তম্ভ, নিচে মোটা অক্ষরে লেখা 'অনারেবল ফ্রিডম ফাইটার বিধুভূষণ ভট্টাচার্য'। তার নিচে ছোট অক্ষরে লেখাগুলো সন্তোষের পড়ার ধৈর্য থাকে না চিঠির নিচে স্বাক্ষর — ইন্দিরা গান্ধী, প্রাইম মিনিস্টার      

  বিপ্লবীদাদুর ক্ষীণ কণ্ঠস্বর এ চিঠিটাই আমার সত্যিকারের 'লাইভ সার্টিফিকেট' রে! স্বাধীনতা সংগ্রামের পেনশন স্যাংশন আর রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে তাম্রফলক নেওয়ার আমন্ত্রণপত্র এটা

  এখন এটার কী দরকার দাদু?   

  এটাই মহা মূল্যবান রে! তখন এটা না পেলে আমাদের লড়াইয়ে স্বাধীন হওয়া দেশে, পরাধীন এই সংসারে বেঁচে থাকার মতন খাবার জুটত না  

  দাদু, আবার কেন এসব কথা! অনেকবার শুনেছি। সব মনে আছে

  এই কথাটা মনে আছে তো?

  কী কথা?

  আমি মরলে বাক্সে রাখা ওই জাতীয় পতাকাটা দিয়ে আমার মরদেহ ঢাকা দিয়ে দিবি আর ওই তাম্রফলকটা আমার চিতার উপর চাপিয়ে দিবি

  সে তো এখনো দেরি আছে দাদু!  

  না রে! আর দেরি নেই তুই দেখিস, আর কয়েকদিন পর পনেরোই আগস্ট আমি স্বাধীন হয়ে যাব। আমার বেঁচে থাকার প্রমাণ দেওয়ার ইচ্ছেটা আর নেই রে! 

অণুগল্প- বিপ্লব মাজী

ভোরের পার্ক 


ভোরবেলা অরিন্দম নদীর দিকে বেড়াতে আসে। শিল্পায়নের ঢেউ নদীর পাড়েও লেগেছে। প্রাকৃতিক দৃশ্যের মধ্যে কৃত্রিম প্রাকৃতিক দৃশ্য তৈরি করা হচ্ছে। পেলোডার লরি জিপ ক্রেন ঘোরাফেরা করছে। নতুন পার্ক হবে। ভোরবেলা যাঁরা নদীর ধারে বেড়াতে আসেন, এরপর তাঁদের টিকিট কেটে পার্কের ভেতরে বসতে হবে। টিকিটের টাকায় উন্নয়নের খরচ উঠবে। শিল্পায়ন ও উন্নয়ন নিয়ে ভোরের নদী তীরে তাই ভেসে বেড়াচ্ছে নানা আলোচনার টুকরোটাকরা। আর সেই টুকরোটাকরার ভেতর ভেসে বেড়াচ্ছে দুটো শব্দ : বিশ্বায়ন ও উন্নয়ন। পেলোডার লরি জিপ ক্রেন--
এই ভোরের নদীতীরে জীবন্ত প্রাণীদের মতো ঘুমিয়ে আছে। তারা জেগে উঠলেই ভোরের পার্কের  কাজ শুরু হয়ে যাবে। ভোরে যাঁরা নদীতীরে বেড়াতে আসেন তারা ঘরে ফিরে গেছেন। যখন যন্ত্রের শব্দ আর নদী থেকে লরি ভর্তি বালি তোলার আওয়াজ। বিদ্যুতের লাইন এসে গেছে। জলের ট্যাঙ্ক বসে গেছে। পার্কের ভেতরের রাস্তা তৈরি হচ্ছে। ফুলের বাগান বসছে। টয়ট্রেন আসবে মেরী-গো-রাউন্ড দোলনা রোপওয়ে, বোটিং...। নিসর্গের ভেতরে নতুন নিসর্গ --যেমন দেশের মধ্যে দেশ এস ই জেড। 

অরিন্দম শিউরে ওঠে, আকাশে মাথা তোলা সুন্দর যে গাছটা এখানে ছিল কেটে ফেলেছে! যে গাছটিকে নিয়ে মৃদুলার সঙ্গে তার দীর্ঘ স্মৃতি জড়িয়ে আছে। শীত বা গ্রীষ্মের ভোরে স্কুটারে তারা এসে গাছটার নিচে বসত আর স্বপ্ন দেখত ভবিষ্যতের। গাছটির সঙ্গে সঙ্গে সেই স্মৃতিতে ইলেকট্রিক করাতের চিহ্ন!  রক্তপাত! উন্নয়ন এভাবেই কত মানুষের স্মৃতিতে রক্তপাত ঘটাচ্ছে! শিল্পায়ন উন্নয়নের সময় এরকমই ঘটে। যেমন তাদের প্রাকবিবাহিত জীবনের অনেক স্মৃতি ভোরের নদীর নিসর্গে হারিয়ে যাবে। অবশ্য কিছু কিছু স্মৃতিচিহ্ন শপিংমল বিগবাজার বুটিকে কিনতে পাওয়া যাবে। শুধু হারিয়ে যাবে এই ভোরের নদীতীরে মৃদুলার সঙ্গে বেড়াতে আসার স্মৃতিচিহ্নগুলি-- যা আজো তার স্মৃতিতে আনমোল...। 

অণুগল্প- অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়

বৃশ্চিক

 

শৌভনিকের শরীরের ঢেউখেলানো পেশিতে, ফুলে-থাকা খাঁজে খাঁজে মানাতও খুব। সুঠাম ডান ও বাঁ-বাহুর মাস্‌লে, এমনকী মসৃণ-করে-কামানো বুকেও খোদাই করা ছিল। টকটকে ফর্সা ত্বকের ওপরে লতাপাতার জাল। নকশা-কাটা। চিত্রবিচিত্র।

বুকের বাঁ-দিকে জ্বলজ্বল করছে কালো স্করপিয়ন। শার্ট খুলে ফেললেই চোখ টেনে নিত কাঁকড়াবিছেটা। মোম-পালিশ পুরুষালি বুকে বিষাক্ত বৃশ্চিক। জীবন্ত।

রিমিতা খুব পছন্দের খেলা ছিল ঐ বিছের লেজে ঠোঁট ছোঁয়ানো। কেমন একটা আবেশে বুজে আসত চোখ দুটো। মুখের রেখায়-ভাঁজে নেশা আর যন্ত্রণা। যেন বিষের মধুর জ্বালায় চিনচিন করছে সারা ঠোঁট। যেন বা হর্সপাওয়ারের উদ্দাম প্রাণশক্তি শুষে নিচ্ছে সে’ উদোম ট্যাটুগুলোয় ছোঁয়াচ রেখে।

                         রিমিতা এখন মাঝরাতে ঘন রোমে ভর্তি হাড়উঁচু-বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে সেই কাঁকড়াবিছেটাকেই মনে করে। পেশীর সঞ্চালনের সঙ্গে ক্রমশ জ্যান্ত হয়ে-ওঠা দুরন্ত কৃষ্ণবৃশ্চিক।

    আজকাল সারাক্ষণ ট্যাটু নিয়েই পড়ে আছে শৌভনিক। বিছে। পাতা। হার্ট। লাভ। আরও অনেক, প্রচুর, অজস্র...।

    পার্লারে ‘ট্যাটু’ আঁকে শৌভনিক।

অণুগল্প- মিলনকান্তি বিশ্বাস

অশনি সংকেত


 

কিরণবাবু ক্যানিং স্টেশন নেমে অটো ধরার জন্য জনস্রোতে পা মেলাতে মেলাতে ভাবছিলেন বাড়ির জন্য একটু ফল নিতে হবে।

দুই পাশে ফলের দোকান সার দিয়ে সাজানো। সবাই হাঁকছে ‘দাদা আসুন, স্যার আসুন আপেল নোব্বুই টাকা কিলো কোমলা লেবু পাঁচটা পঞ্চাশ ইত্যাদি ...।’

কিরণবাবু একটা দোকানের সামনে দাঁড়ালেন। দোকানদার একটি অল্পবয়সী ছেলে। গোলগাল চেহারা। গায়ের রঙ একটু ময়লা। ছেলেটাকে দেখে তাঁর বেশ পাকাপোক্ত মনে হল ।

কিরণবাবু –‘ভাই, আপেল কত করে?’

দোকানদার – ‘অ্যাক কেজি নোব্বুই টাকা’

কিরণবাবু এক কেজি আপেল বেছে ছেলেটির হাতে দেওয়ার সময়েই ছেলেটি দুহাতে মুখ চাপা দিয়ে একটু কেশে নিল

কিরণবাবু আপেলগুলি ছেলেটির হাতে না দিয়ে একটু রাগত স্বরে বললেন – ‘মাস্ক পরনি কেন ভাই? আগে হাত স্যানিটাইজ করো, তারপর আপেল ওজন করো।’

ছেলেটি বললদুটো ভ্যাকচিন হয়ে গেচে। আর কিচ্চু হবে না।’

কিরণবাবু – ‘ঠিক আছে, তোমার কিছু হবে না বুঝলাম, কিন্তু অন্যের তো হতে পারে!’

ছেলেটি - ‘করোনাকে এখানে ঢুকতে দিইনি, এখান থেকে তাইড়ে দিচি।’

কিরণবাবু ছেলেটির হাত স্যানিটাইজ করে দিলেন এবং ওজন করার পরে আপেলের প্যাকেটটি নিতে নিতে মনে মনে বললেন ‘করোনা তোমার পোষা পাখি তো তাই তাড়িয়ে দিয়েছ।’ দুশো টাকার একটি নোট বের করে ছেলেটির হাতে দিলেন। ছেলেটি একশো দশ টাকা ফেরত দিল। টাকাগুলি ভিজে মতিহার তামাকের মতো হয়ে গেছে।

কিরণবাবু – ‘তোমার নোটগুলি এই অবস্থা কেন?

ছেলেটি – ‘আপনারা দিচ্ছেন তাই নিচ্চি। কি করবো স্যার আমরা তো আর চাকরি করি না যে বাড়ি বসে বসে মাইনে পাব। আর ব্যাংক থেকে কড়কড়ে নোট তুলে বাজারে যাব

কিরণবাবুর বুঝতে অসুবিধে হল না যে ছেলেটি তাকে উদ্দেশ্য করে এই বাক্যবাণ নিক্ষেপ করেছে। প্রথমে মাথাটা গরম হয়ে উঠলেও একটু শান্ত হয়ে বললেন ‘লকডাউনে অফিস বন্ধ থাকলেও সবাই তো ঘরে বসে কাজ করেছে।’

                                                                                          ২

ছেলেটি – ‘ও সব কাজ আমার জানা আছে

কিরণবাবু মনে মনে ভাবলেন ব্যাংক, পোস্ট অফিস, স্বাস্থ্য কর্মীদের মতো হয়তো তাঁদের অর্থাৎ শিক্ষকদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়নি ঠিকই কিন্তু সবাই তো বাড়িতে বসে যতটা সম্ভব ক্লাস করা, প্রশ্ন করা, খাতা দেখার কাজ করেছেন। তাই বলে ছেলেটি এভাবে বলবে! তখন তাঁর মনে হল একটু প্রতিবাদ করা দরকার।

কিরণবাবু – ‘ভাই তুমি এভাবে কথা বলছো কেন?

ছেলেটি – ‘তবে কীভাবে কথা বলবো? আপনি যেভাবে বলছেন আমিও সেভাবে বলছি।’

কিরণবাবুর একটু আত্মসম্মানে আঘাত লাগলো। দীর্ঘ কুড়ি বছরের অধ্যাপনা জীবনে কেউ তাঁকে এভাবে অসম্মান করেনি। একটু রাগত স্বরে বললেন – ‘তুমি যদি মানুষের সঙ্গে এভাবে ব্যবহার করো তবে তোমার দোকানে দ্বিতীয়বার কেউ আসবে না!’

ছেলেটি – ‘যান যান, আপনার মতো খদ্দেরের দরকার নেই। ওই রকম ভদ্রলোক সারা দিনে আমার দোকানে ঝুড়ি ঝুড়ি আসে।’

কিরণবাবু কথাগুলি শোনার পর লজ্জায় অপমানে ক্ষোভে সেখান থেকে দ্রুত চলে গেলেন। যেতে যেতে তাঁর মনে হল ‘একবার বাজার কমিটির কাছে যাই’, আবার মনে হল ‘থানায় গিয়ে বলি’। কিন্তু এই দুর্ভাগা দেশে অভিযোগ জানিয়ে কোথাও যে কিছু হওয়ার নয় তা তিনি ভালো করেই জানেন। তাই অযথা সময় ব্যয় না করে বাড়ির পথে পা বাড়ালেন। তাঁর মনে হল সরকারকে কোনো আয়কর বা ল্যান্ড ট্যাক্স দিতে হয় না এদের। ট্রেন থেকে হাজার হাজার প্যাসেঞ্জার নামে আর এরা সারাদিনে হাজার হাজার টাকা ইনকাম করে। তাই এভাবে খরিদ্দারের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে বাধে না। অর্থ প্রতিপত্তিবলে ভবিষ্যতে একদিন এই শ্রেণিই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করবে। সেদিন আর বেশি দেরি নাই। ফলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষে এটি একটি অশনি সংকেত।

 

অণুগল্প- সিদ্ধার্থ সিংহ


আছে


ছেলেটি ক'দিন ধরে আলাপ করার চেষ্টা করছে কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারছে না দেখে মেয়েটা নিজেই এগিয়ে এসে বলল, আই লাভ ইউ।
ছেলেটি বলল, তার আগে বলো তোমার কি কোনও বয়ফ্রেন্ড আছে?
মেয়েটি বলল, না।
--- তোমার কি কোনও বেস্ট ফ্রেন্ড আছে?
মেয়েটি বলল, না।
--- তোমার কি কোনও এক্স আছে?
মেয়েটি বলল, না।
সেটা শুনে ছেলেটি বলল, আই লাভ ইউ টু।
ঠিক তখনই, কী একটা মনে পড়ে যেতেই মেয়েটি বলল, ও হোঃ, বলতে ভুলে গেছি, আমার একটা স্বামী আছে।

অণুগল্প- বিজয়া দেব

পছন্দ অপছন্দ 

রসময়ের হবু মেয়ের জামাইকে একদম পছন্দ হয়নি। প্রভাবতীর পছন্দ। স্ত্রীকে খুব ভয় রসময়ের। প্রথম যৌবনে প্রভাবতীর রূপ তাকে ভাসিয়ে নিয়েছিল। প্রভাবতী যা বলত রসময়কে তাই শুনতে হত। সেই অভ্যেস এই প্রৌঢ়ত্বের শেষ পর্যায়ে এসে ভয়ে পরিণত হয়েছে। 
                    ছেলেটি এমনিতে দেখতে ভালো, কথাবার্তা আচার-ব্যবহার মন্দ নয়। কিন্তু কেন কে জানে, ভালো লাগে না। একটু যেন ঔদ্ধত্য আছে, যদিও সেটাকে সেভাবে জাহিরও করছে না। 
   মেয়ে শৈলীকে একদিন চুপি চুপি নিজের ঘরে ডেকে রসময় জিজ্ঞেস করে - তোর সূর্যকে পছন্দ? 
শৈলী উদাসীনভাবে বলে - কী জানি! 
-মানে? 
-মানে কিছু নেই। 
-বুঝলাম না। 
-তোমার কেন অপছন্দ বলতে পারো? 
-না। 
-তেমনি। পছন্দ অপছন্দ বুঝি না। - বলে একটা হাই তুলে শৈলী চলে গেল। 
বিকেলের অন্তিম রক্তরাগে তেমনি নেই - আঁকড়া ভাব। শৈলী কি সূর্যের প্রতি অনুরক্তি অনুভব করে না? তাহলে বিয়েতে সায় দিল কেন? 
ফেলে আসা নিজের জীবনে কত খুঁটিনাটি ঘটনা মনে পড়ে। একবার প্রভাকে নিয়ে সমুদ্রের ঢেউ গুনছিল রসময়। তখন নতুন বিয়ে হয়েছে। প্রায় একঘন্টা জুড়ে ঢেউ গোনার পর একটা তিমি ভেসে আবার ডুবে গিয়ে ঢেউ গোনার শৃঙ্খলা ভেঙে দিয়েছিল। ঠিক যেন তেমনি শৈলীর ঔদাসীন্য শৈলীর হবু বর সূর্যকে অপছন্দ করবার শৃঙ্খলাকে ভেঙে দিয়ে গেল। ধীরে সন্ধে নামার মধ্যে প্রকৃতির রূপান্তরের শৃঙ্খলা তাকে এবার কেমন যেন বিস্মিত করে তুলল। 

অণুগল্প- চৈতন্য দাশ

       ভয় জামিনদার- এ
          
 ‌    
   "জানো তো, আমি পাঁচটা সেলাইমেশিনের জন্য পঁচাত্তর হাজার টাকা লোন নিচ্ছি। সেলাইয়ের কাজ ভালো চললে‌ চার পাঁচটা কারিগরের বেতন দিয়েও রোজগারপাতি ভালোই থাকবে। এখন শুধু তোমার একটা সিগনেচার লাগবে।" অমিতা বিশ্বস্ত বন্ধু মোহনকে একনিশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল।
    মোহন ভালো করেই জানে তার একটা সিগনেচার মানেই জামিন থাকা। অমিতা কোনো কারণে লোনের কিস্তি ফেল করলে লোনকর্তৃপক্ষ মোহনকে তলব করবে। তাই বিচক্ষণ মোহন কৌশলে জামিনদারি দায় এড়াতে বলল, "লোনফোনের ঝামেলায় কেন যাচ্ছ? তোমার নতুন বাড়ির সামনেটায় আপাতত তাঁবু টানিয়ে খাবারের দোকান দাও। তারপর ইস্কুল, হাসপাতাল, থানা এসব জায়গায় তোমার ফোননাম্বার দিয়ে আসবে। সকাল-সন্ধে-দুপুর তিন বেলাতেই খাবারের অর্ডার পাবে। অর্ডারমতো খাবার সাপ্লাই দিতে পারলে ভালো রোজগারপাতি হবে। ওসব লোনফোনের ঝামেলা মন থেকে ঝেড়ে ফেলো। আমার কথা যদি মানো তো খাবারের দোকান দিয়ে ঝাড়া হাত-পায়ে আমার পরামর্শ মতো‌ আদাজল খেয়ে কাজে লেগে পড়ো। মনে রাখবে, কোনো কাজই ছোট নয়। আজকালকার বাজারে পেটে খাবার না থাকলে কেউ ডেকেও খোঁজ নেয় না।" 
     এই মোহনই একদিন অমিতাকে বলেছিল,‌ "ছোটোখাটো অসন্মানজনক কোনোকাজ তোমাকে করতে দেব না। তুমি সসম্মানে সেলাইয়ের ইস্কুল চালাবে। আমি তোমাকে সেলাইমেসিনপত্তর দিয়ে সবরকম সহযোগিতা করবো..."
    অমিতার পায়ের তলাকার বিশ্বাসের টলোমলো মাটি অস্ফুটে বলে‌ উঠলো--কেউ কথা রাখে না।

অণুগল্প- আশিস মিশ্র

একসঙ্গে, অথচ 


"প্রায় সবাই আসছে। তুমি যাবে না?" 
তনুর কথায় কোনো কান দিলেন না সায়ন। অন্ধকার ছাদে বসে আকাশের দিকেই তিনি তাকিয়ে আছেন। ছোট থেকেই তাঁর আকাশ নিয়ে যত ভাবনা। অবশ্য সায়ন কোনো মহাকাশ গবেষক নন। না হলেও আকাশ নিয়ে অনেককিছু তিনি বলে দিতে পারেন।  সায়ন যখন এমন অবস্থায় থাকেন, তখন তনু আর তাঁকে বিরক্ত করেন না। এই এগারো মাসে সায়নকে তিনি আরও অনেকটা জেনেছেন। 

সাতচল্লিশের তনুর সঙ্গে সাতান্নর সায়নের পরিচয় ও বন্ধন বছর দুই।  সেই যে শান্তিনিকেতনে কলাভবনের সামনে শীতকাল। বিকেল। হাঁটতে থাকা দুই অচেনা নারী-পুরুষ। অবশ্য দু'জন বেড়াতেই গেছিলেন। কর্মসূত্রে দু'জনেই অভিনয় জগতের মানুষ। দু'জনেই অবিবাহিত। কিন্তু এখন একসঙ্গে যেভাবে থাকা যায়, সেভাবেই। বাঁশদ্রোনিতে সায়নের নতুন ফ্ল্যাটেই এখন ওঁরা থাকেন। তনুরও নিজের একটি ফ্ল্যাট আছে বেহালায়। কখনো কখনো সেখানেও কয়েকদিন থেকে আসেন। সন্তান নেননি কেউ।  

চায়ের কাপ হাতে দিয়ে তনু আবারও বললেন,
 "কণাদিকে ফোন করে জানলাম, বাদলদার বাড়ির ছাদের সাহিত্য আড্ডায় প্রায় সবাই এসেছেন। আমাদের ওরা খুব মিস করছেন। চলো না, একটু সময় থেকে চলে আসবো। ওঁদের ডিনারও আছে। না খাও খাবে। গতবারও ডেকেছিলেন উনি। যাওয়া হয়নি। এবারও না গেলে কী ভাববে।" 
"তুমি যাও। রিক্সো ডেকে দিচ্ছি।" সায়ন বললেন। 
"তোমায় ওরা খুব করে চাইছে।" তনু বললেন। 
"এখন আর ওসব ভালো লাগে না। কিছু পাই না। তাছাড়া আমি অভিনয়ের মানুষ। সাহিত্যের কী বা বুঝি বলো?" সায়ন বললেন।  

এবার নিজের চেয়ার ছেড়ে, চেয়ারে বসে থাকা   সায়নকে পেছন থেকে গলা জড়িয়ে কানে মুখ রেখে তনু বললেন, "তুমি সব বোঝো। বরং আমি কিছু বুঝি না।" 
সায়ন এবার তনুকে নিজের কোলে টেনে এনে বললেন, "বাদলবাবুর বাড়ির ছাদের সাহিত্য আড্ডার থেকে এখন সায়ন - তনু বোসের অন্ধকার নির্জন আড্ডা অনেক বেশি আনন্দের।" 
তনু বললেন, "নিজেকে ব্যতিক্রমী ভাবছো? তা থাকো। তবে তুমি সায় দিলে আমি একটু ঘুরে আসি।" সায়ন কিছু বললেন না। তনুও আর বেশি কথা না বাড়িয়ে রুমে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে ছাদে এসে বললেন, "যাচ্ছি।" 
"রিক্সো নীচে দাঁড়িয়ে আছে।" আমি ডেকে দিয়েছি। 

কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে তনু চলে গেলেন। 

সায়ন আবার আগের মতো আকাশের দিকে মন দিলেন। এতো নক্ষত্র। সব একসঙ্গে। অথচ আলাদা আলাদা কক্ষপথে। দূরত্ব ঠিক রেখেই চলমান...। 
"নিশ্চিত তনু এতোক্ষণে পৌঁছে গেছে। ফোন করে জানবো? না থাক।" 

Wednesday, December 29, 2021

অণুগল্প- অমর চক্রবর্তী

মাটি টাকা


প্রিয়তোষ বাবু দীক্ষা নিলেন, রামকৃষ্ণ আশ্রম থেকে।প্রায় ছয়মাস শুদ্ধ থেকে। দীক্ষা নিলেন জীবনের উপান্তে এসে। না নিয়ে উপায় ছিলো না। এতদিন সময় করতে পারেননি কারণ এত কাজ এত টাকা এত মেয়েছেলে! তিনি জমির প্রমোটর, বিল্ডার। জমি কেনেন যে দামে বিক্রি করেন তিন গুণে। আর এটা করতে গানবয়, গুন্ডা পুষতে হয়। তাতে কি। শ্বশুরের টাকায় ইনভেস্ট। শ্বশুরের মোটা মেয়েটাকে বিয়ে করে বালিশ বানিয়েছেন। বাইরে মেয়েছেলে আছে। বৌকে শাড়ি গয়নায় ভরিয়ে দিলেই খুশি, বিড়ালের মতো আদর নেয়। মানুষ কিছু ভাববে তাই ওকে একটা সন্তান দিতে হয়েছে। সেই রিয়া এমবিএ করে এব্রডে। অতএব বিশাল সম্পত্তি নিয়ে তিনি কি করবেন! তাছাড়া এখন মেয়েমানুষে সুখ পান না! শরীর বিগড়ে গেছে। অতিরিক্ত মদ্যপান, উশৃঙ্খলতার জন্য সুগার, কিডনি, লিভার দুই গেছে। এই সেদিনও তার কথায় পল্টু একটা লাশ ফেলে দিলো। পল্টু ভালো শুটার। কিন্তু কে জানত এই হত্যা তার ভারী পড়ে যাবে। যার জমি সে দখল নিতে চেয়েছিল সেই বিনয়বাবুকে পল্টু একবারে খতম করে দিয়েছে। ব্যাটা কি যে ভুল করেছে! লোকাল থানা পার্টি সবাইকে টাকা দিয়ে রাখলেও সে জানতো না বিনয় সমাদ্দারের এক ভাই আছে অভয়। থাকে মুম্বাই। সে আন্ডার ওয়ার্ল্ডের একজন ডন। বিনয় বিনয়বাবুর ছেলে অভীক তাকে খবর দিয়েছে। অভয়কে বাইরে থেকে সবাই জানে বিজনেস ম্যান।

সেই অভয় এখানে ডেরা বেঁধে আছে। দুদিন তাকে আক্রমন করে। একদিন কানের কাছ দিয়ে বুলেট চলে যায়। প্রিয়তোষের পল্টু আর মাসলেম্যানরা ওর কাছে নস্যি। অভয় হোটেলে বসে সবাইকে কিনে নিয়েছে। এমনকি পল্টুকেও। ব্যবসা গেছে এবার প্রাণে বাঁচা কঠিন। এই শহরে তার প্রতিদ্বন্দ্বী নেই কিন্তু অভয় তাকে গর্তে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এই জমির ব্যবসায় তার অনেক টাকা হয়েছে এবার তো সেই টাকা মাটি!

এদিন রাতে তিনি কিছুই খেলেন না। বৌকে জমিদারি খাটে ঘুমোতে বলে তিনি পাশের ঘরে, আগে যেখানে মেয়ে থাকত সেখানে শুয়ে পড়লেন। ঘুম আসে না কিছুতেই। প্রাণের ভয়। এ আমি কি করলাম! সব মাটি সব মাটি। একটা আচ্ছন্ন ভাব।
-প্রিয়তোষ
-কে ?
-আমি ,যার কথা তুই আওড়ে যাচ্ছিস!
প্রিয়তোষ চোখ খোলে। এক আটপৌড়ে ধুতিপড়া, সামনে কালো দাঁত, চুল নেই। -আমি আমি রে গদাই। বলেছিনা মাটি টাকা টাকা মাটি। মাটি বেচে অনেক টাকা করেছিস এবার দেখ ব্যাটা। বাঁচতে চাস মাকে ডাক। এই বলে সেই মূর্তি তীব্র আলো ফেলে চলে গেলো। প্রিয়তোষ ধুচমুচ করে উঠে চোখ মেলে দেখেন মেয়ের বইয়ের টেবিলের ওপরে ওই মানুষটি। নীচে লেখা শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেবায় নমহ। মেয়েটা তার ভালো ছিলো। অভিমানে দেশ ছেড়েছে। তিনিও সব ছাড়বেন। অভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন। আর এই ঠাকুরের পায়ে সমর্পণ।


পাঠক, এই গল্প লেখার আগে শুনলাম অভয় মুম্বাই পুলিশের জালে ধরা পড়েছে। আর প্রিয়তোষের আজ দীক্ষা নেওয়া হল ।

অণুগল্প- রবীন বসু

প্রত্যাবর্তন


আজ আবার। আবার তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে। মাঝরাতে  ওয়াশরুমে শাওয়ারের তলায় দাঁড়ায় মোহনা। অবিরল জলধারায় সে কিছু ধুয়ে ফেলতে চাইছে। জালি দিয়ে ঘসে ঘসে গা থেকে কী যেন তুলছে । বা তোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই সেই ঘৃণ্য অবলেপ মালিন্য সে তুলতে পারছে না। পরাজয়ের গ্লানি একরাশ লজ্জা নিয়ে তাকে কুঁকড়ে দিচ্ছে। শিরশির ঘৃণায় সারা শরীর বমি করতে চাইছে।

দু' বছরের বিয়ে। স্বামী সুপ্রতীম পেশায়  মনোরোগ চিকিৎসক। আন্তর্জাতিক জার্নালে গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেল লেখেন। সভা-সমিতি চ্যানেলে মতামত রাখেন। অথচ বাড়ি ফিরে মনের হদিস তো দূরের কথা, শারীরিক অসুস্থতাও গ্রাহ্য করেন না। প্রতিরাতে বন্য মহিষ বা বরাহের মত সুঁচলো শিং ও দাঁত দিয়ে শিকারকে যেন ছিন্নভিন্ন করে এক আদিম ভোগে তৃপ্ত হয়। 

য়্যুনিভারসিটির সহপাঠী অলোকেশের সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করেছে দু'বছর। ও পিএইচডি করতে চলে গেল জার্মানি। মোহনাও চাকরির পরীক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। শেষমেশ একটা বেসরকারি ব্যাঙ্কে ঢুকে অলোকেশকে মেল করেছিল। ও জানিয়েছিল তার এখন দেশে ফেরার কোন ইচ্ছেই নেই। আপাতত পোস্ট ডক্টরেট করছে। পরে এখানেই চাকরি। বাবার শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। মা চাইছিল মোহনার বিয়েটা হয়ে যাক। নেটে নানা ম্যাট্রিমনিয়াল সাইট সার্চ করে বাবা-মা তার জন্য পাত্র পছন্দ করেছিল। একমাত্র ছেলে, নিজেদের বনেদি বাড়ি। প্রফেসর-ডাক্তার। সুদর্শন। মায়ের পীড়াপীড়িতে বিয়েতে মত দিয়েছিল।

কিন্তু বিয়ের নামে প্রতিনিয়ত এই বলাৎকার, এই গার্হস্থ্য নরক তার আর সহ্য হচ্ছে না। লজ্জা আর অপমানে সে কাউকে বলতেও পারছে না। বাবা-মাকে তো নয়-ই। এখন দেয়ালে পিঠ ঢেকে গেছে। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে মোহনা ড্রয়িংয়ে বসে ছিল কতক্ষণ। শীতার্ত এক অনুভূতি তাকে অন্ধকার সুড়ঙ্গের উষ্ণতায় ডাকছে। সে প্রাগৈতিহাসিক জীব হয়ে হাঁটু ভেঙে হামাগুড়ি দেয়।

 একসময় ভোর হয়। পাখি ডাকে। মোহনা তার মনের মধ্যেকার শীতার্ত রক্তাক্ত পাখিটাকে মুক্তি দিতে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ল। বাইরে উজ্জ্বল আলো। ‌ আঁচলটা গায়ে জড়িয়ে নিল ভালো করে।


কলিংবেল বাজল। এত সকালে কে এল? সীমাদেবী দরজা খুলে দেখেন, মেয়ে মোহনা। 

"কীরে, তুই? এত সকালে !"

"আমি ফিরে এলাম, মা। একেবারে।"

অণুগল্প- শিবশঙ্কর দাস

বৌ

 

   - বুঝেছো, এতগুলো ভাত খেতে পারব না। আর একটু কমাও।

                 - আর কমাতে হবে না। ঠিক পারবে।

                 - না না, এতগুলো খেতে পারবো না।

   - কালকে তো বেশ খেয়ে নিয়েছিলে। আজকে পারবো না পারবো না করছো কেন?

   - কালকের চাইতেও তুমি বেশি দিয়েছো।

                - আরে না বেশি দিইনি। ছোটো থালা বলে ওরকম মনে হচ্ছে। খাওয়া শুরু করো দেখবে খাওয়া হয়ে গেছে।

                 - আরে পারব না বলছি তো। আর একটু কমাও।

                 - কমাতে হবে না। বলছি তো, তুমি পারবে। খাওয়া শুরু করো তো।

 

----

 

               - দেখো অনেক খেয়েছি আর পারছি না। পেট একদম ডাম্বুস হয়ে গেছে।

                   -আর তো ওটুকু আছে। ওটুকুও খেয়ে নাও।

                 -ওহ, আর পারছি না।

                 -ভাত ফেলবে না বলে দিচ্ছি! দাও, মুখে দাও!  এই তো পারছো। দেখলে দিব্যি কেমন খেয়ে নিলে আর পারবোনা পারবোনা করছিলে।

                -পেটের মধ্যে কেমন যেন করছে।

                  -কিচ্ছু করছে না ওটা তোমার মনের বাতিক। যাও একটু বিশ্রাম করো। দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে। আমি জানতাম তুমি পারবে।  শুধু শুধু তালবাহানা করছিলে। তোমাদের আমি চিনিনা না। তোমরা বাপ ব্যাটা সব এক।  না বললে কিছু করবে না। যেই বললাম আমি সুড়সুড় করে খেয়ে নিলে। ওকি কী হল তোমার? অমন করছো কেন?

                 -শরীরটা কেমন যেন করছে। গা গুলিয়ে উঠছে। ওয়াক... ।

                -ওকি বমি হবে নাকি।

                 -কী জানি? শরীরের মধ্যে কেমন যেন করছে।

                 -শরীরের মধ্যে কেমন করছে সেটাও বুঝতে পারছ না। তোমার যে কী দশা হয়েছে। অতগুলো যদি খেতেই না পারবে তাহলে খেলে কেন?

                 -তুমিই তো বললে।

                -আমি বললেই তোমাকে খেতে হবে? তুমি নিজে বোঝ না কতটুকু খেলে তোমার পেটে সইবে? সেটাও আমাকে বলে দিতে হবে? বোধটোধ কি একেবারে গেছে? তোমাদের জন্য যত করছি ততো তোমরা অকর্মণ্য হয়ে উঠছো।  নাও এই হজমিটা খেয়ে নাও। আর কথায় কথায় বৌকে দোষ দেওয়ার স্বভাবটা একটু কমাও। আমার মত বৌ পেয়েছো বলে বেঁচে গেলে নাহলে কী যে দশা হত তোমার আমি কল্পনাও করতে পারছি না। 

অণুগল্প- বীথি ব্রহ্ম

ঝালমুড়ির ঠোঙা

      

               এতক্ষন লাগলো? আমায় বসিয়ে রাখলে এখানে একা?

যা ভীড়! বিশাল লাইন! একা কোথায়? সাথে সমুদ্রের ঢেউ তো আছে! নে ধর! খেয়ে নে!

বিয়ের পরও তুই তুকারি ছাড়বে না?

তাতে অসুবিধা কোথায়? ভালোবাসার কি ঘাটতি পড়েছে! আর তুই তো আমার প্ৰিয় বান্ধবীর বন্ধু রে!

এখন থেকেই অভ্যাস করো।

আসবে না এতো তাড়াতাড়ি! সায়নীকে ই... আচ্ছা তোর সাথে সায়নীর আর যোগাযোগ নেই? ফেবুকেও পাস নি ওকে?

না! আগেও বলেছি। ভুলে গেলে চলবে? তিতলির গলায় উষ্মা।

এই, এই দ্যাখ, ঝালমুড়ির ঠোঙাটা আসলে একটা চিঠি! দীপন অবাক হয়ে বলে । তাও আবার প্রেমপত্র।

হ্যাঁ, তাই তো! আমারটাও তাই! তিতলিও অবাক!

দুজনেই জোরে হেসে ওঠে।

 এখনো লোকে ট্রু লাভ লেটার কাগজে কলমে লেখে ? তিতলি বলে।

" কেন আমরা লিখি নি! মেল বা মেসেজে লিখেছি তো!" দীপন আরেকবার ঝালমুড়ি মুখে দেয়!

একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল জানিস তিতলি!

মাসতুতো দাদা তখন দীপশিখাদিকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু কিছুতেই ওকে বলতে পারছে না! তখন ওর বেস্ট ফ্রেন্ড সুনয়নীকে পটিয়ে পাটিয়ে হাতে চিঠিটা দেয়। আর ওর হাতে হাতে রিপ্লাই আনতে বলে।

উফফ! কী সব ঝালমুড়ি আনো! এতো ঝাল!

ওমা! তুই ঝাল ঝাল ই তো পছন্দ করিস! আর ঝাল মুড়িতে তো.... তারপর শোন না , সুনয়নীদি দীপশিখাদির বেস্ট ফ্রেন্ড হলেও চিঠিটা চেপে দেয়! আর অমিতাভদাকে বানিয়ে বানিয়ে লিখেছিলো যে, দীপশিখাদি ওকে পছন্দ করে না। ওকে লোফার, রকবাজ ইত্যাদি বলেছে ।

               আর কোনোদিন এইসব ঝালমুড়ি টুরি আনবে না! উফফ! জিভ পুড়ে গেলো ঝালে! ভালো লাগে না এসব! ডিসগাস্টিং!

 বুঝলি, তারপরে কীভাবে ওই অখাদ্য, বাজে, লেখাপড়ায় কমা সুনয়নীদি দাদার ঘাড়ে চাপলো! আর সারাজীবন ঘাড়মুটকে রেখেছে।... হা হা হা হা করে হাসে দীপন!

তিতলি তড়াক করে লাফ মেরে উঠে দাঁড়ায়! ঝালমুড়ির ঠোঙাটাকে দুমড়ে মুচড়ে পিষে ছুঁড়ে মারে সামনে সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায়।

তিতলি! একী! এভাবে রিএক্ট করছিস কেন! কী হলো তোর?

অণুগল্প- জগদীশ মণ্ডল

আটটার ফোন


ঘড়িতে রাত আটটা বাজলেই একটি ফোন আসে ক্রিং ক্রিং। তখন রামবাবু সঙ্গী সাথীদের কোনও কথাই আর কানে তোলেন না। জায়গা থেকে উঠে সোজা বাড়ির পথে হাঁটতে থাকেন। জিজ্ঞেস করলে বলেন বাড়িতে কাজ আছে।

রোজদিন বারাসাত একনম্বর প্লাটফর্মে অবসরপ্রাপ্ত এবং বয়স্ক বৃদ্ধরা আড্ডা দেয় । রামবাবুও নিয়ম করে আসেন। সুখ,দুঃখের কথা, নাতি নাতনি, ছেলে বৌমা, কিছুই বাদ যায়না। মাঝে মাঝে সমাজ, রাজনীতি, বর্তমান প্রসঙ্গ নিয়েও আলোচনা চলে। হাসি ঠাট্টায় জমে ওঠে বেশ। তর্কাতর্কিও কম হয়না। কিন্তু ফোন এলে রামবাবুর কথা থেমে যায়। উঠে পড়েন ।

           রামবাবু কয়েক দিন আর আসছেন না। শোনা গেল ওনার গিন্নি খুব অসুস্থ,শয্যাশায়ী ।

          আজ এসেছেন। বিভিন্ন কথা, গল্প হচ্ছে। কিন্তু রামবাবু অংশগ্রহণ করছেন না। আটটা অনেক আগেই বেজে গেছে। অনেকে উঠে পড়েছেন। কিন্তু রামবাবু উঠছেন না। একজন বলেই ফেললেন - দাদা আপনার তো এখনো ফোন এলো না।

রামবাবু বললেন আটটায় আর ফোন আসবে না। রাত হলেও কেউ শাসন করবে না। এখন আমি মুক্ত বিহঙ্গ, স্বাধীন। বলতে বলতে চোখ দুটি সিক্ত হয়ে ওঠে।

অণুগল্প- বিষ্ণুপদ বালা

বিরিয়ানি



               ভগা চ্যাটার্জীকে এখন আর পূজাপার্বণে কেউ ডাকে না।  ভুলভাল মন্ত্র পড়ে। মাথার ঠিক নেই। থেকে থেকে অ্যাবনরম্যালিটি বেড়ে যায়। ক্ষণেক একটু কমে। আবার বাড়ে। বাড়বে না কেন? যে ঝাড় খেয়ে এলো টালিগঞ্জ থেকে। প্লট বেচা পাঁচ লাখ। হিরো হতে গেছিলো... পাঁচ লাখ জমা করে দেবশ্রীর হাতে এক চড় খেয়ে বাড়ি চলে আসে।  সেই শোকে মা ও বাবা পর পর চলে যায়। এক দাদা সুনীল চ্যাটার্জী ঘুরে ঘুরে লটারী বেচে সংসার চালায় ভিন্ন হাঁড়িতে...
            ভগা মানে ভগীরথ চট্টোপাধ্যায়- এর বউ রোগে ভোগে আক্রান্ত দুই দুই বার চার মাসের বাচ্চা ঝরে যায়। এখন স্বামী-স্ত্রী কেমন যেন অকালে একবোঝা কাশফুল মাথায় নিয়ে মরানদীর পাড় ধরে হেঁটে চলেছে...
  মাঝে মাঝে ভগার চেতনায় টন টনাটন শরতের ঢাক বাজে। বাজবে না কেন? পচাশিতে ইংলিশ অনার্স  বি.এ তে ব্যাক ছিল। নেতা- মন্ত্রীদের।গালি দিয়ে উদ্ধার করে দেয়। শালা-শালী সবাইকে ঘর দিলো আমার সেই একচালা ফুটো টিনের ঘর। জল পড়ে। চোখে দেখে না। ধৃতরাষ্ট্রের দল। বাস্টার্ডগুলো কতবার ঘরের ছবি তুলে নিয়ে গেল- দিল্লিকা লাড্ডু। আসুখ এবার ভোট চাইতে আছোলা বাঁশ ঢুকিয়ে দেবো পেছনে...
           ‌সবচেয়ে পুরনো বাসিন্দা এই চ্যাটার্জি পরিবার। কোথায় যে কার অভিশাপ লেগেছিল যে এক পাও এগোতে পারেনি বরং তিলে তিলে সংসারটা টিম্ টিম্  করে জ্বলছে  প্রদীপের শিখাটুকু...
চারিদিকে বড়ো বড়ো বিল্ডিং উঠেছে বাড়ির পাশ দিয়ে। পাকা সড়ক চলে গ্যাছে গাইঘাটা যশোর রোড। এর পাশে এখন ভগার এই একচালা যে কী বেমানান লাগে!
লকডাউন পিরিওডে পরিযায়ী মুম্বাই এর এক হোটেল শ্রমিক তার বাড়ি সংলগ্ন নিজস্ব রোড সাইডের পোড়ো জায়গায় একেবারে ভগার ঘরের লাগোয়া রাতারাতি ব্যাঙের  ছাতার মতো বানিয়ে তুললো এক ফার্স্ট ফুড রেস্টুরেন্ট নাম 'শ্রীকৃষ্ণ... ইন্ডিয়ার চাইনিজ এবং কন্টিনেন্টাল সবই রমরমিয়ে চলছে। সন্ধের পরে  চাইনিজ খাবারের সুগন্ধে সারাপাড়া মঁ মঁ করে। সারাদিন এখানে ওখানে টই টই ভ্রমণ করে বেলাডুবে গেলে পর একগাদা খিদে নিয়ে বাসায় ফেরে ভগীরথ। ছেঁড়া খেজুর পাতার মাদুরে কম্বল মুড়ি নিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। বউকে বলে এই-ই গন্ধ পাচ্ছিস? স্পেশাল মেনু। এক্ষুনি আজ বিরিয়ানি কাটছে। শিগগির আমার ভাত বাড়ে। লঙ্কা পিঁয়াজ যা আছে নিয়ে আয়-- গন্ধং অধং ডোজনং... এই তো আমি বিরিয়ানি খাচ্ছি...

অণুগল্প- এস কবীর

বিচারের দাবি


দর্জি পাড়ার ছেলেগুলো কখন যে লেখাপড়া করে বোঝা দায়! পাড়ার ভিতরে ছোট্ট মাঠটিতে সারাক্ষণ কিচির- মিচির করতেই থাকে। কখনও কখনও অনেক রাত পর্যন্ত চলে এই পর্ব। বাড়ির গার্জেনরা কি কিছুই বলে না? ছোট্ট মুনুয়াও খেলে বন্ধুদের সঙ্গে কিন্তু ভীষণ ঝগরুটি! কেউ কিছু বললেই বাবাকে ডেকে আনে। হোমরা-চোমরা বাবা এসে দোষ-গুণ বিচার না করেই ওই ছোট ছোট বাচ্চাদের সাতগুষ্টি উদ্ধার করে দেয়। অন্যান্য বাবা-মায়েরা ভয়ে কিছু বলতে পারে না। এভাবেই চলতে থাকে দিনের পর দিন।

                     স্কুলে পড়ার সুবাদে পাশের পাড়া থেকেও অনেকই এ-পাড়ায় খেলতে আসে। সেবারও এসেছিল মাহিরা। কিছু একটা নিয়ে মুনুয়া ও মাহিরার গোল বাঁধে। দু'জনেই দু'জনের বাবা-মাকে ডাকতে ছুটে। মুনুয়ার বাবা হম্বিতম্বি করে তেড়ে আসে-'কোন্ রে মেরে বেটি কো সাতা-রে?- উস্-কি মা কি..."। গিয়েই দেখে মাহিরা'র বাবা মুস্তাফ ভাই মেয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ছ'ফুট দু-ইঞ্চি লম্বা, সুঠাম দেহের অধিকারী মুস্তাফ ভাই-কে দেখেই মুনুয়ার বাবা কাচুমাচু করতে লাগে। এই দেখে মুস্তাফ ভাই তাকে মারতে উদ্দত হয়ে বলে-'কা-রে তু আপনা বাচ্চি কি বাত্ শুনকার সবকা মা কা ইজ্জাত লেগা?' মুনুয়ার বাবা দেখে পরিস্থিতি খারাপ, কিছুতেই পেরে উঠবে না মাহিয়ার বাবাকে, ওদের বংশ তালিকাও বিশাল, তাই মানে মানে কেটে পড়ায় ভালো। সে মুনুয়ার হাত ধরে টানতে টানতে বলে-' চল্ বেটি ইঁহাসে, আল্লা ইস্-কা বিচার করে গা!'

অণুগল্প- গোবিন্দ বিশ্বাস

মানুষই দেবতা গড়ে


নাট্যদলের সম্পাদকের ফোন - "দাদা একটু সমস্যায় পড়ে গেছি, একটা জিনিস আমাদের ম্যানেজ করে দিতে হবে! " 
নাট্য উৎসবের উদ্যোক্তাদের কাছে এই ফোনগুলো খুব আতঙ্কের! তবুও স্বাভাবিক ভাবেই জিগ্যেস করতে হয় -- "হ্যাঁ বলুন না কি করতে হবে? 
 সব ব্যবস্থা করে দেবো, আপনারা ঠিক সময় আসছেন তো? কোনো অসুবিধা ? আমরা কিন্তু আপনাদের নাটকটা নিয়ে দারুণ প্রচার করেছি--- এক নিঃশ্বাসে এতগুলো কথা উগরে দেয় অতঙ্কিত উদ্যোক্তা। ওপারের মানুষটি এই আশ্বাসবাণীতে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বলেন- " না না তেমন কিছু না। আমাদের একটা কার্ত্তিক জোগাড় করে দিতে হবে। ন্যাংটো কার্ত্তিক।"
মানে ---
--" আরে জ্যান্ত না দাদা, মাটির। আসলে এবারের কার্ত্তিক পুজোয় আমাদের দিকে কার্ত্তিকের ডিমান্ড এতোটাই বেশি ছিল যে একপিসও কুমোরটুলিতে মেলাতে পারলাম না। নাটকের একটা দৃশ্যে ওই কার্ত্তিকের মূর্তিটি লাগবে। ব্যবস্তা করা যাবে?"
যাবে মানে, না পেরে আর উপায় কি!  নাটক বলে কথা। ওই একটির কারণে তো শিল্পকে ক্লিশে হতে দেওয়া যায় না।
 উদ্যোক্তা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়ে দিল--
"ব্যবস্থা হয়ে যাবে, আপনারা চলে আসুন।"
এই আশ্বাসবাণী শুনে নাট্যদলের সম্পাদক তরঙ্গমাধ্যমে ধন্যবাদ - কৃতজ্ঞতার ইকেবানা পাঠিয়ে দিলেন। বিলম্ব না করে - চল লাল্টু কুমোরটুলি - বলে বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেল উদ্যোক্তারা। 
একটা- দুটো- তিনটি- কুমোরবাড়ি ঘুরে চিত্র সেই একই। এখানেও কার্ত্তিকের স্টক শেষ। হেব্বি ডিমান্ড ছিল এবার! 
কিন্ত কথা দেওয়া হয়ে গ্যাছে নাট্যদলকে! - -- বিশাল প্রেস্টিজের ব্যপার!  কি করা যায় -- কি করা যায়..!!  ভাবতে ভাবতেই লাল্টুর নজরে পড়লো একটা মূর্তি --- সরস্বতী পুজোর সিজেন, সার সার সরস্বতী মূর্তি রাখা। তারই মাঝে কয়েকটা মূর্তির বসার ভঙ্গি একেবারে ন্যাংটো কার্ত্তিকের মতো। লাল্টু সেইদিকে তাকিয়ে বললো -- দাদা এই সরস্বতীগুলো এমন কার্ত্তিক মার্কা পোজ দিয়ে আছে কেন? 
পাল মহাশায় মুখে  একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল- না- মানে- আসলে পুরোনো স্টকের কয়েকটি কার্ত্তিক ছিল। ওটাকেই একটু বদলে নিয়ে সরস্বতী বানিয়ে দিয়েছি। লাল্টু এবার পেয়ে গ্যাছে পন্থা - " তো বেশ কাকা - এবার তুমি ওটাকে একটু বদলে কার্ত্তিক বানিয়ে দাও....  দলকে কথা দিয়েছি। প্রেস্টিজ বলেও তো একটা জিনিস আছে। "
পাল মহাশয় এবার একটু আহ্লাদিত হয়ে বললেন -" আপনারা বললে তা আমি করে দিতে পারি। "

ভেঙে- গড়ে একটু বদলে নিয়ে সরস্বতী কার্ত্তিক হয়ে উঠতে শুরু করলো।

অণুগল্প- সঞ্জয় গায়েন

তৃতীয় নয়ন


কদিন ধরে সিঁদুর সিঁদুর করে জ্বালিয়ে মারছিল অভি।

সুলেখা তো ভয়ে একেবারে কেন্নোর মতো গুটিয়ে গিয়েছিল। এ আবার হয় নাকি! হলেও সিনেমায়-গল্পে-টিভি সিরিয়ালে হতে পারে। সেসব দেখতে দেখতে একটু আধটু পরকীয়ার স্বাদ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ঘরে ফিরে নিজস্ব পুরুষের বুকেই মুখ গোঁজা। অভ্যাসের আদর। অবশেষে বাথরুমে শাড়ি-ব্লাউজ ভিজিয়ে তৃপ্তির ঘুমে ঢলে পড়া। সুলেখা তার ভরা সংসারের এই নিশিলিপি কোনভাবেই পাল্টাতে পারবে না!

যদিও অভি কিছুতেই কিছু শুনতে চাইছিল না! হ্যাঁ, অভিকে ভালো লেগেছে। ভালওবেসেছে। তাই ব’লে সিঁদুর! নাঃ! নাঃ! এক সিঁথিতে দু’জনার সিঁদুর? ও পরতে পারবে না।

সুলেখা মনে মনে বরফ হয়ে ওঠে। কিছুতেই আর গলবে না! সেকথা বলতেই শেষবারের মতো অভির কাছে গিয়েছিল সুলেখা।

কিন্তু ও ভুলে গিয়েছিল আগুনের কাছে গেলে বরফ গলেই যায়। হলও তাই। অভির চোখভরা জল দেখে সুলেখা দুচোখ বুজিয়ে নিজেকে সঁপে দিল।

ঠিক তখনই অভি ঝুপ করে বসে পড়ে সুলেখার পায়ের কাছে। জয়ো  জয়ো  দেবী মন্ত্রোচ্চারণে সুলেখার দুপায়ে নেপে দেয় সিঁদুর। অভির এ হেন আচরণে, সুলেখা ডুকরে কেঁদে ওঠে, এ কি করলে তুমি!

অভি নিরুত্তর। শুধু বিভোর চোখে দেখতে থাকে সুলেখার দু-ই ভ্রুর মাঝে ফুটে ওঠা তৃতীয় নয়ন।   

Tuesday, December 28, 2021

অণুগল্প- বাপন হাজরা

শুভ্র জ্যোৎস্না 

                         

ছয় নাম্বার ওয়ার্ডে শববাহী গাড়িটা আসতেই একটা শোকের ছায়া পড়ে যায় । দেশজুড়ে লকডাউন জারি হয়েছে । সমগ্ৰ ওয়ার্ড নিঃস্তব্ধ । রাস্তায় দু'একটা নেড়িকুকুর শুয়ে । আর দু'একজন সিভিক পুলিশ পাহারা দিচ্ছে । 

বীরেন  এম.এস.সি পাশ । নেট কোয়ালিফাই করেছে ।বাবা নেই । আছে মা । 

বীরেন প্রতিবাদী ছেলে । গল্প লেখে বেশ চমৎকার । বীরেনের দোষ, ও কারো বশ্যতা স্বীকার করে না । তোষামদ করে না মেকি সমাজের ক্ষমতাবান, সুবিধাবাদীদের ।  চ্যালেঞ্জের সঙ্গে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে ফেলে, ওদের মুখে চুনকালি দেয় । এটাই না কি মুদ্রা দোষ ।‌ স্রোতে গা ভাসাতে বিবেকে বাঁধে । 

লকডাউনে মানুষ সব কর্মহীন । গরীবের সংসার সবার  । বীরেনদের মতো ঘরে অভাব নিত্যসঙ্গী । 

সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে উপার্জনের পথে পা বাড়ায় বীরেন । একটা মুদির দোকানে কাজ করতে শুরু করে । মাসিক বেতন সাড়ে তিন হাজার টাকা । এই টাকায় সারা মাস চালাতে হয় । 

বীরেনের তিনটি গল্প এক নামী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে । খ্যাতিও ক্রমশ  ছড়িয়ে পড়েছে । কিন্তু আমাদের সমাজের অল্প বিদ্যা ভয়ংকরের দল, স্বার্থান্বেষী, সুবিধাবাদীরা মানতে চায় না । সহ্য করতে পারে না । বীরেনের বিরুদ্ধে চক্রান্ত শুরু করে ।‌ টেনে নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে । কিন্তু কিছুই না পেরে  অবশেষে মুদির দোকানে কাজটা ছাড়িয়ে দেওয়া হয় । 

রেশন থেকে চাল, ময়দা নিয়ে বীরেনের মা বাড়ি ফিরেই দেখে বীরেন বারান্দায় মুখ নামিয়ে বসে । ঘরে অভাব ।
রেশনের চালে চার দিন চলবে । আর ময়দা বিক্রি করে দোকানের পয়সাটা হবে । কিন্তু মাসের বাকি দিনগুলো কিভাবে কাটবে । 
বীরেনের মা বলে- খোকা তুই মুখ ভার করে বসে ?
-এমনি মা । 
কিছু তো  হয়েছে বাবা, বল না আমায় বাবা । 
বীরেন মুখ নামিয়ে বলে- মুদির দোকানে কাজটা ছাড়িয়ে দিয়েছে মা ।
-ধীরেন ঘোষালের কাজ হবে নিশ্চয় ।
হ্যাঁ মা । ওদের বশে চলতে হবে । কাঠের পুতুলের মতো থাকতে হবে । নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলবে । গরীব হতে পারি মা । কিন্তু ব্যক্তিত্ব, আত্মসম্মানে তো গরীব নয় । 
-হ্যাঁ রে বাবা এই সমাজের নিয়ম এটা । আর  আমরা যে গরীব ।

কিন্তু রাখে হরি মারে কে । বীরেন জে.আর.এফ পেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচ.ডি তে ভর্তি হয় । খুব দ্রুত লেখক হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে । খ্যাতিও  ছড়িয়ে পড়ে । ধীরেন ঘোষালের মতো সুবিধাবাদী, পুঁজির দালাল, রাজনীতির চোষকদের যোগ্য জবাব দিতে পেরে খুবই আপ্লুত ।  

আজ হঠাৎ বীরেনের জ্বর । একদিন পর থেকে  শ্বাসকষ্ট শুরু হয় । শেষে বেলেঘাটা আই ডি তে ভর্তি করা হয় । বীরেনের কোভিড পজেটিভ । এ দিকে দেশজুড়ে অক্সিজেনের বড় অভাব । শ্বাসকষ্ট ! শ্বাসকষ্ট ! 

কিন্তু হায় ! চারদিন ভর্তি থাকার পর বীরেনের সব লড়াই, প্রতিবাদ থেমে যায় । সমাজের সাদা রঙ চাঁদের শুভ্র জ্যোৎস্নায় কালো হয়ে যায় ।

অণুগল্প- শুভেন্দু ঘোড়াই

ক্লাসঘর


দুটো বোর্ড ঝুলছিল পাশাপাশিএকটি ব্ল্যাক  একটি হোয়াইট

ব্ল্যাকবোর্ডের উপর সাদা চকে লেখা একটি শব্দ-'ইতিহাস'

অপু বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল-হোয়াইট বোর্ডের উপর কালো অক্ষরে লেখাকে কি বলে স্যার?
অপুর প্রশ্নে একমুহূর্ত থম খেলেন শিক্ষক তারপর নিজের অবচেতন কাটিয়ে একটি ব্ল্যাক মার্কার পেন দিয়ে হোয়াইট বোর্ডটিতে লিখলেন-'মাৎস্য ন্যায়'!

অণুগল্প- অর্কপ্রভ ভট্টাচার্য

ছাতা

আচমকা কালো মেঘ শহরের উপর আছড়ে পড়েছে। এই শহরে বৃষ্টি যে কতটা ভয়াবহ রূপ নেয় , সে কথা শহরবাসীদের কাছে অবগত। নগরবাসীরা চিন্তিত হয়ে ধড়ফরিযে বেরিয়ে পড়ছে আগেভাগে। যারা বেরোতে পারবে না, তারা বাড়িতে ফোন করে জানাচ্ছে। এই সময়েও যে বৃষ্টি হতে পারে সকলের ধারণার বাইরে । কোনো পূর্বাভাসেও তেমন জড়ালো কিছু উল্লেখ ছিল না। ফলত এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বৃষ্টিতে ভেসে গেলে শহরটার ধীরে ধীরে সমস্ত কাজে বিঘ্ন ঘটবে। বৃষ্টি যখন সত্যিই নেমে এল, সবাই আশ্রয় নিল ফুটপাত কিংবা আশেপাশে কোনো শেডের তলায়।

এইসব বৃষ্টিকে অগ্রাহ্য করে একটা ছাতা ভেসে আসছে। কালো রং। সবাইকে পাশ কাটিয়ে চোখের সামনে রাস্তায় ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলেছে। কারো কারো নাগালে এলে লাফিয়ে ঝাপিয়ে চেষ্টা করছে ধরার। কিন্তু নাগালের মধ্যে নেই। ছাতাটি এবার একটি বন্ধ হওয়া দোকান খুলে ফেলল কোনো এক জাদুশক্তিতে। খোলা মাত্রই অসংখ্য ছাতা বেরিয়ে আসল একে একে। লাল, নীল, কালো,বেগুনী ছাতা। একে একে এগিয়ে গেল সমস্ত মানুষদের মাথায়...

অণুগল্প- শিবানী বাগচী



গল্প হলেও সত্যি

রাত বারোটা হবে; ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠলো। রিসিভার তুলতেই ভবেনের ভাঙা ভাঙা গলার আওয়াজ, ফোন করে জানালো যে একটু আগেই মারা গেছেন অরুনিমাদি। তুমি তাড়াতাড়ি এসো দাদাবাবু বলেই ফোনটা কেটে দিলো। যথারীতি আমি গাড়ীটা বার করে রওনা দিলাম, এক যুগ প‍র আলিপুর দুয়ারের উদ্দেশ‍্যে। ওখানে পৌঁছাতেই দেখলাম আত্মিয় স্বজন সকলেই প্রায় এসে উপস্থিত। তড়িঘরি করে সকলেই শ্মশান অভিমুখে রওনা দিলাম। মুশলধারে বৃষ্টি শুরু হল, শব ভিজে গেছে, দাহ করতে বেশ অসুবিধে হবে ভেবে আরো কিছু কাঠ জোগাড় করতে অগত‍্যা ভবেনকেই পাঠালাম। কাঁধ থেকে শব নামিয়ে আমরা সামনের চায়ের দোকানে আশ্রয় নিলাম। বেশ শীত শীত করতে লাগলো। মিনিট পনের পর বৃষ্টি থামলো, হঠাৎ দেখি টাল-মাটাল অবস্থায় শ্মশানের ওপাড় থেকেই কে যেন এগিয়ে আসছে এদিকে । চা হাতে সবাই একসঙ্গে প্রায় চিৎকার করে উঠলাম, একি অরুণিমা না? আমরা হতবাক চোখে চেয়ে রইলাম, যে পথ দিয়ে অরুনিমা আমাদের দিকেই হেঁটে আসছিলো...

      শ্মশান থেকেই সোজা ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। দেখতে গিয়ে দেখি, হাসপাতালে নয় নম্বর বেডে শুয়ে অরুনিমা মিট মিট করে আমায় দেখে হাসছে। ডাক্তার কাকার মুখে শুনলাম, বৃষ্টির জল ও কাঁধের ঝাঁকুনিতেই নাকি অরুনিমার হার্টটা আবার চলতে শুরু করেছিল। 

অণুগল্প- অলোক পটুয়া

নাগফণীর উলকি

 

‘শোনো বাবলু ডিসেকশন রুমে তালাটা মেরে দিও। রিপোর্ট তৈরি আছে লকারে রেখে গেলাম। কাল চেম্বার করে ওই এগারোটার দিকে আসব।”– এই বলে ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে ডাঃ শ্যামল হসপিটাল থেকে বেরিয়ে গেল।

 

পরেরদিন সকাল সাত’টার সময় চেম্বারে প্রবেশ করার মুহূর্তে রিসেপশনের নীলুকে বলে দিল– “পাঁচ মিনিট পর পেসেণ্ট ছেড়ো ।”

নীলু বলল– “ ঠিক আছে।”

ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় পেসেন্ট এল; পরিচিত অর্ধবয়স্কা দি’ভাই । শ্যামল ব্লাড রিপোর্ট হাতে নিয়ে বলল – “দি’ভাই বসুন। এখন সুগারের সমস্যাটা কমেছে দেখছি। একটু হাঁটাচলা আর খাওয়া–দাওয়া নিয়ম করে করলেই ব্যাস।” 

সামনের টেবিলে রাখা একটা ছবি দেখিয়ে দি’ভাই সাহস জুগিয়ে আজ জিজ্ঞাসা করে— “তোমার পিতা ?”

“ না না , আমার পিসেমশায়। বড়ো আর্টিস্ট,  খুব নামযশ দেশে–বিদেশে । আমি ছোটো থেকেই তার কাছে মানুষ কিন্তু একটিবারো তিনি আমায় তাঁর স্টুডিওতে প্রবেশ করতে দেননি।  এমনকি তাঁর  ছেলেকেও না।  কেন কি জানি !”

আর একটা অর্ধোনগ্ন ছবির দিকে আঙুল দেখিয়ে দি’ভাই বললেন – “ওটা কী ওনারই আঁকা ছবি ?”

“ হ্যাঁ। আসল কপিটা লণ্ডনের মিউজিয়ামে আছে। আসলে ছবিটা তাঁর এক মডেলের প্রতিকৃতি।”

“আসল মডেলকে দেখেছ ?”

“ সে সুযোগ আমাদের কারো ছিল না। ইচ্ছে ছিল পূরণ হয়নি। তবে বাম হাতে আঁকা ঐ যে ‘নাগফণীর উলকি’– ওটা নাকি সত্যিই তার বাম হাতে আছে ।”

“ দেখা হ’লে চিনতে পারবেন ? ”

“দেখা হলে তবেই তো। যাই হোক, নিয়ম করে চলুন আর ওধুধগুলো কিনে নেবেন।… আসুন দি’ভাই।”

 

চেম্বার থেকে বেরিয়ে সোজা হসপিটাল পৌঁছায় শ্যামল।  ডিসেকশন  রুমে আসতেই বাবলু বলল – “ডাক্তারবাবু সব রেডি করে রেখেছি।”

স্টারনাল স হাতে নিয়ে ডিসেকশন টেবিলের উপর রাখা রূপবতী এক নগ্ন লাশের উপর থেকে কাপড় সরালে  শ্যামলের চোখ যায় বাম হাতের  উপরের দিকে –  সেখানে রয়েছে ‘ নাগফণীর উলকি ’।

স্তম্ভিত শ্যামলের হাত থেকে স্টারনাল স পড়ে গিয়ে ঝনঝন শব্দ করে ওঠে।

অণুগল্প- কৃষ্ণেন্দু দাসঠাকুর

দেশ

 --শুনছিস তোকে কয়েকদিন ধরেই বলছি না ঘরের ভেতর থেকে একটা দুর্গন্ধ আসছে...

--আজ আমাকে সক্কাল সক্কাল বেরোতেই হবে করোনা পরিস্থিতি, লকডাউনের মধ্যে সেলিব্রিটিদের কি করে সময় কাটছে এনিয়ে একজন নামি সেলিব্রেটির  সাক্ষাৎকার নিতে হবে।

-- আরে গন্ধটা ক্রমশ বাড়ছে... আর ও আজ কোন এম.এল.এ চাল,আলু বিলি করবে... কাল কতজন করোনা আক্রান্ত হলো... এ-নিয়েই ব্যাস্ত...

-- গন্ধ যখন ক্রমশ বাড়ছে, তখন কিছুদিন পর কমবে; আর কমতে কমতে একদিন ভ্যানিশ হয়ে যাবে। ততদিন তুমি না হয় রুম স্প্রে ইউজ করো...

--বাঃ। গন্ধের উৎস না খুঁজে...ক্যামেরা, বুম হাতে আমায় গন্ধ চাপা দেওয়ার পন্থা দিচ্ছিস...   

অণুগল্প- শুভ দত্ত

সাঁকো

 কনুয়ের আলতো ঠেলা দিয়ে পল্লবী জিজ্ঞেস করল- বলো না গো! এই সাঁকোটা নাতো! ঠিক জানো?

শাশ্বত একরাশ বিরক্তি নিয়ে হনহন করে এগিয়ে গেল কিছুটা। দাঁতে দাঁত চিপে বিড়বিড়  করে বলল - কেন যে মরতে বলতে গিয়েছিলাম, নেকু একটা।

পল্লবী দৌড়ে গিয়ে জাপটে ধরল ওকে।

আহ! কি হচ্ছে টা কি?

গল্পটা আর একবার বলো। বলো না গো। নাহলে কিন্তু....

ছাড়তো। বলছি। শাশ্বত একটা সিগারেট ধরাল। ক্রমে অধৈর্য হয়ে উঠছিল সে। কাটা কাটা ভাবে বলল " একটা সাঁকো ছিল। সাঁকোটার মালিক ছিল একটা দৈত্য। সে কাউকে ওর সাঁকো পার হতে দিত না। কেউ পার হওয়ার চেষ্টা করলেই ছুঁড়ে ফেলে দিত যেদিক থেকে সে এসেছিল।" একনিশ্বাসে গল্প বলে শাশ্বত থামল। বলল - শান্তি!

পল্লবী তখনো ওর হাতটা ধরেছিল। আরো জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রাখতে রাখতে বলল,- ইস! কি ভালোই না হতো যদি এই সাঁকোটার মালিক একটা দৈত্য হতো।

সিগারেট ফেলে দিয়ে শাশ্বত হাসতে লাগল। বলল - হ্যাঁ। সে আর বলতে, শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার ঝক্কি থেকে অন্তত রেহাই পাওয়া যেত।

ধুস! তুমি খুব আনরোমান্টিক। এই সাঁকোটা যদি দৈত্যটার হতো, আমরা সারারাত ধরে সাঁকো পেরোতাম। কি মজাই না হতো বলো?

 

পল্লবী এখন রোজ আসে সাঁকোটাতে। অনেকক্ষণ ধরে চেয়ে চেয়ে দেখে, সাঁকোটাকে। সাদা-কালো অথবা খয়েরি রঙের খড়ি দিয়ে সাঁকোটার উপর ঘর বানায়। তারপর পার হয় সাবধানে। বারবার। প্রতিনিয়ত। নিজেকে সাহস জোগায়। আর মনে করায় নিজেকে - যদি দৈত্য বেড়িয়ে আসে ঘরটা থেকে ঘুরে যেতে হবে ওকে। যেদিকে শাশ্বত থাকে তার উল্টো দিকে। তাহলেই দৈত্য তাকে ছুঁড়ে দেবে শাশ্বতর দিকে।

দিন যায়...

মাস যায়...

বছর যায়...

দৈত্য আসে না। দৈত্য একবারই এসেছিল। বন্ধ্যাত্ব নিয়ে। বাঁজা অপবাদ দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গেছে বাপের বাড়িতে।

অণুগল্প- অন্তরা সরকার


সিঁড়ি

মলয় স্যারের নম্বরটা ব্লক করে দিয়ে অদ্ভুত তৃপ্তি পেল পর্ণা । হোয়াটসাপের মেসেজগুলো মুছে দিয়ে সেখানেও ব্লক করলো । উফ্ কত্ত মেসেজ ! তিন বছরের সম্পর্ক । পর্ণা মনে মনে হাসল ।

স্কুলে থাকতে তাকে কেউ ভালো ছাত্রীর দলেই ফেলত না, আর আজ ? একাশি পার্সেন্ট নম্বর পেয়ে সে এখন ইতিহাসে অনার্স । এতদিন কলেজে ছোট একটা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠত । এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বড়ো সিঁড়ি পেরোতে হবে ওকে । তবে পর্ণা যে পারবে, সে বিশ্বাস ওর আছে ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ’র ক্লাস শুরু হয়েছে মাস দুয়েক হলো । এই কদিন সে খুঁজেছে, কোন সিঁড়িটা ব্যবহার করলে তাড়াতাড়ি উপরে ওঠা যায় । তাকে তো অনেক উপরে উঠতে হবে !

ইতিহাস বিভাগের মানস স্যার একজন উঁচুদরের মানুষ । অবিবাহিত, সুদর্শন । উপর মহলে প্রচুর হাত ।

এই দু’মাসেই পর্ণা ছাত্র ও শিক্ষকমহলে যথেষ্ঠ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে, সৌজন্য ওর রূপের বিদ্যুতছটা । মানস স্যার ছাত্রছাত্রী মহলে খুবই জনপ্রিয়। উনি যখন যেখানে যান, এক ঝাঁক ছেলেমেয়ে তাঁর সাথে দেখা যায় ।  ট্রেনে স্যারের সাথে ফেরে পর্ণার দল । কিন্তু স্যারের পাশের সিটটা যে পর্ণার, সেটা এই ক’দিনেই সবাই বুঝে গেছে ।

কিছুদিন হলো পর্ণা মনমরা । সাজগোজ নেই, হাসি নেই । রাতে শুয়ে সে ভাবে - মাছরাঙার কাছে তো অনেক মাছই প্রিয় । অলোকানন্দার কথা মনে পড়ে । লম্বা চুল, কাঁচা হলুদের মতো গায়ের রং । আর ওই মেয়েটা ? শ্বেতাঙ্গিনীদের মতো সাদা, হিলহিলে ফিগার । এরা সব মানস স্যারের রিসার্চ স্কলার । এই দুজন নাকি স্যারের খুব প্রিয় ।

                আর ভাবতে পারছেনা পর্ণা । কিছু একটা করতেই হবে ওকে । এত সহজে হেরে যাবে না । ফোন করে বন্ধু চন্দ্রিমাকে ।  দুজনে মিলে অনেকক্ষণ পরামর্শ করে।


পরপর কয়েকদিন পর্নাকে ক্লাসে না পেয়ে মানস স্যার ডেকে পাঠান চন্দ্রিমাকে। ওর কথাগুলো মন দিয়ে শুনে খানিকক্ষণ কি যেন ভাবলেন । মনে হয় কিছু একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি ।

অনেকদিন পর পর্ণা আজ ট্রেনে । সে আর চন্দ্রিমা আজ স্যার-এর কামরায় ওঠেনি । ট্রেন থেকে নেমে  পর্ণা আড়চোখে দেখে নেয়, স্যার নেমেছেন, সাথে ছেলেমেয়েরা ।

আচমকাই "উফ্" বলে  মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে পর্ণা ।  চন্দ্রিমা ব্যস্ত হয়ে পর্ণার মাথায়, ঘাড়ে জল দিতে থাকে । পর্ণার চোখ আধখোলা । দেখতে পাচ্ছে স্যার এগিয়ে আসছেন ওর দিকে, সঙ্গের ছেলেমেয়েরা ওভারব্রিজে উঠে চলে যাচ্ছে । যাকে অনেকের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চাওয়ার নিদারুণ লড়াইয়ে নেমেছে পর্ণা সেই মানুষটা এগিয়ে আসছে ওর দিকে, নিশ্চিত ওরই দিকে ।

             নিশ্চিন্তমনে চন্দ্রিমার ঘাড়ে এলিয়ে পড়ে পর্ণা ।

অণুগল্প- সুমন্ত কুন্ডু

 মুক্তি পথের যাত্রী

 
ঘুম ভাঙল একটা অদ্ভুতরকম শব্দে, সাধারণত এরকম শব্দ আগে কখনও শুনিনি । নাকে এল একটা মৃদু সুগন্ধ, বলা বাহুল্য এরকম গন্ধও আগে কখনও পাইনি । একটা অদ্ভুত রকমের আবেশে মনটা ভরে উঠল । সাধারণত ঘুম ভাঙার পর মনের মধ্যে একটা স্নিগ্ধতা লেগে থাকে, সেই অনুভূতি আমি জানি কিন্তু এটা সেরকম নয়,  অন্যরকমের  অজানা অনুভূতি । আমার মাথায় যেন কোন ভার নেই, শরীরটাও হাল্কা খুব । একটু মন দিয়ে ভাবার চেষ্টা করলাম । ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম । অস্বাভাবিক কিছুই ঠেকল না । আমার নিজের ঘরে, নিজের বিছানাতেই শুয়ে আছি ঠিক যেমন রোজ শুই । চারপাশে প্রাত্যহিক জীবনের মৃদু কোলাহলও শুনতে পাচ্ছি । তবু আজ কেমন যেন অন্যরকম লাগছে । মনের মধ্যে অদ্ভুত এক প্রশান্তি ।
আমার অফিসের যে কলিগটাকে আমি দু’চক্ষে দেখতে পারি না হটাৎ তার কথা মনে পড়ল । কালকেই তার প্রোমোশন আটকাবার জন্য বসের কাছে চুকলি করে এসেছি । এখন মনে হচ্ছে না করলেই হতো, সেও তো দুটো পয়সার জন্যই গায়ে গতরে খাটছে ।
বড়রাস্তার ধারে একটা জায়গা নিয়ে ছোটভাইয়ের সাথে চুলোচুলি চলছে অনেকদিন ধরেই । প্লটটা ভালো, বেচলে দাম পাওয়া যাবে অনেক । আমি জায়গাটা ছাড়তে রাজি নই অথচ জানি একটু কম্প্রমাইস করলে ভাইটার উপকারই হয় । চাকরি চলে যাওয়ার পর থেকে বেচারা বড় কষ্টে আছে । টানাটানি চলছে । ভাবলাম আর ঝামেলা করবো না ও যদি দু’ছটাক বেশি নিতে চায় তো নিক, আমি ছেড়ে দেবো ।
হাতখরচার জন্য ছেলেটা ক’দিন ধরেই বলছে, আমি দাবড়ি দিয়ে বলেছিলাম ‘আগে ইনকাম করো, বাপের হোটেলে খাচ্ছ দাচ্ছ ঘুরে বেড়াচ্ছ, লজ্জা করে না’ ছেলেটা মুখ কালো করে চলে গিয়েছিলো । এখন মনে হচ্ছে অমন করে না বললেই হত । চাকরীর চেষ্টা তো ও নিজেও করছে অনেক, না পেলে কি করবে । চারপাশে কত শিক্ষিত ছেলে বেকার ফ্যাফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।
 সেদিন গিন্নিকেও ঝেড়ে দিয়েছিলাম বেশ কষিয়ে । ‘মাগনার পয়সা নয়’ এমন একটা কটু কথাও বলেছিলাম । আসলে মধ্যবিত্ত গৃহস্থ তো, পয়সার জন্য মেজাজ খিঁচরে থাকে সবসময় । কিন্তু এখন মনে হচ্ছে অতটা ঝাঁজ না দেখালেই হতো ।
কিন্তু কেন মনে হচ্ছে ? কই এতদিন তো মনে হয়নি ! আমি তো সেই মিডল ক্লাস বাঙালি যে রোজ ভিড় ঠেঙিয়ে অফিস করি, দরদাম করে বাজার-হাট করি, আঙুল টিপে টিপে খরচ বাঁচাই আর সারা পৃথিবীর সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করে ঘরে ফিরে বউ ছেলের চৌহত্তির মধ্যে রাজা-উজির হয়ে ওঠার চেষ্টা করি । এর অন্যথা হয়নি কোনদিন, আজ কি এমন হল ?

খানিকক্ষণ ভাবলাম । তারপর আশ্চর্য হয়ে দেখলাম ডাঃ ব্যনার্জি আমার ঘরে এলেন, বিছানায় শোয়া বডির ওপর টেথোস্কোপ লাগিয়ে খানিকক্ষণ দেখলেন । তারপর ডানহাতের নাড়ি টিপে ঘাড় নেড়ে উঠে পড়লেন । ছেলে পাশে দাঁড়িয়ে ছিল । ডাঃ ব্যানার্জি ফিসফিস করে বললেন ‘নেই ! তবু একবার হসপিটালে নিয়ে যাও’ । বউ হুড়মুড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল ।
 আমি এই শান্ত সুন্দর সকালে গোটা পৃথিবীর সঙ্গে শান্তিচুক্তির মনোবাসনা নিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্ত মুক্তির দিকে ক্রমশ এগিয়ে যেতে থাকলাম ।

অণুগল্প- মণিকা বিশ্বাস

নিরুদ্দেশ


কলকাতায় সেলুনের দোকানে রোজগারপাতি বেশ ভালোই সন্দীপের । বাইরে হোটেল থেকেই খাবারের ব্যবস্থা, রাতে ওই দোকানের মধ্যেই থাকে সে । এই একবছরে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়েছে । গ্রামের বাড়িতে বৃদ্ধা মা আর মেয়েকে নিয়ে পরমার ভালোভাবেই সংসার চলে যায় । কলকাতা বাজারে সন্দীপের একটু বেশি খরচা হলেও পনেরো দিন অন্তর অন্তর বাড়িতে টাকা পাঠায় । বেশ কিছুদিন থেকে সন্দীপ মনে মনে ভাবছিল পরমাকে যদি তার কাছে নিয়ে আসা যায়, তবে দুজনে সুখেই থাকতে পারবে । পরিকল্পনা করার মাসখানেকের মধ্যেই  সন্দীপ গ্রামের বাড়ি যায় । 

ওদিকে সন্দীপের ক্লোজ বন্ধু বিল্টু লকডাউনের কারণে কোম্পানির কাজ হারিয়েছে । সে এখন মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে । বিল্টুর সঙ্গে সন্দীপের সুখ-দুঃখের অনেক কথা হয় । সন্দীপ বলে- বিল্টু চল না কলকাতায় । কলকাতা গেলে একটা কাজ ঠিকই পেয়ে যাবি । এই আশায় বিল্টু সন্দীপের সঙ্গে কলকাতায় আসে, সঙ্গে পরমা, তার মেয়েও । ছোট্ট একটা ঘরে সন্দীপ, পরমা তার মেয়ে সুখেই দিন কাটাতে লাগল । বিল্টু সন্দীপের দোকানেই থাকে । সন্দীপের কাজে যতটুকু পারে সাহায্য করে । সন্দীপের ঘর থেকে খাবার এনে দেয় বিল্টু । বেশ কিছুদিন এভাবে চলতে চলতে বিল্টুর যেন সম্মানে লাগতে শুরু  করল । তবু বাধ্য হয়েই তা করতে হয় । খাবার আনার সময় একদিন পরমাকে বলে- জান পরমা, আমি না ভীষণ একা । খাবার নিতে এসে তোমার সাথে দুচার কথা বললে বেশ ভালো লাগে । 

সন্দীপ পরমার ভেতর একটা পরিবর্তন লক্ষ করে । তাই সন্দীপ বলে ওঠে- তুমি প্রায়ই বাড়ির বাইরে যাও, কোথায় যাও ? এই শহরের তো তুমি কিছুই চেনো না । পরমা বলে- খুকুর দিদিমণির সঙ্গে এই শহরটা মাঝে মাঝে দেখতে বেরোই । তোমার তো আর দোকান দোকান করে সময় হয় না । একদিন হঠাৎ পরমা নিরুদ্দেশ হয় । একটা চিরকুট পায় সন্দীপ, তাতে লেখা ছিল- তোমার সঙ্গে সংসার করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছি, তাই নিজেকে মুক্তি দিলাম । পরমা কোথায় গেল অনেক খুঁজেও সন্দীপ তাকে পায়নি । বিল্টুকে জিজ্ঞাসা করলে জানায়- আমি কী করে বলব ! তারপর বিল্টু একদিন সন্দীপকে বলে- সে একটা ভালো কাজ পেয়েছে । বিল্টু নতুন কাজে চলে যায় । সন্দীপ এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে পরমাকে খুঁজে বেড়ায় ।

অণুগল্প- ধর্মেন্দ্র বিশ্বাস

বৃদ্ধাশ্রম


সায়ন সদ্য প্রাইমারি স্কুল থেকে হাইস্কুলে উঠেছে। এখন ক্লাস সিক্স। স্কুল থেকে ফিরে খেলার সঙ্গী বলতে ঠাম্মি। বাবা বি.ডি.ও অফিসের ডি গ্রুপের কর্মী। মা একটা বেসরকারী কোম্পানিতে চাকরি করে। কাজের মাসি ও ঠাম্মিই বেশিরভাগ সময় দেখাশুনা করে সায়নকে। ছেলের দিকে ফিরে তাকাবার সময় হয় না মিনার । পার্টি, অফিসের বন্ধু-বান্ধব, মিটিং এসব নিয়েই তার সময় কেটে যায়। অনিন্দ্য,  মিনা একদিন ঠিক করল ছেলেকে কোনো মিশনে ভর্তি করে দেবে। মিনা একটা কথা বলবে বলবে করে অনেকদিন ধরেই মনের মধ্যে পুষে রেখেছিল। আজ সু্যোগ বুঝে বলতে না পারলে হয়তো আর বলা হবে না। তাই এই সুযোগে অনিন্দ্যকে মিনা বলে - তার মাকেও তো কোনো বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসলে নিজেরা স্বাধীনভাবে চলতে পারবে, নইলে সায়নকে মিশনে পাঠালে তার মা একা একা বোরিং ফিল করবে। 

মাসখানিক পর এক রোববারের সকালে একটা গাড়ি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। ছেলেকে নিয়ে অনিন্দ্য ও মিনা গাড়ির কাছে এল। একটা ব্যাগ হাতে ঠাম্মিও নেমে এল ওপর থেকে। সায়নের দু'গালে চুমু খেয়ে ছলছল চোখে গাড়িতে উঠতে যাবে এমন সময় সায়ন তার বাবাকে জিজ্ঞেস করলো : 'ঠাম্মি কোথায় যাবে বাপি?' অনিন্দ্য নীরব। মিনা বলে উঠল বুড়ো হলে সবাইকে ওখানে যেতে হয়। হঠাৎই সায়ন বলে উঠল মা, তুমি আর বাপি বুড়ো হয়ে গেলে ওখানে চলে যাবে ? অনিন্দ্য ও মিনার দিকে একপলক তাকিয়ে ভারতী দেবী গাড়িতে উঠে পড়লেন!

Tuesday, June 29, 2021

অচিনপাখি । জুন সংখ্যা

 




অচিনপাখি ডিজিটাল (ব্লগ) । সপ্তম সংখ্যা, নবম বর্ষ, জুন- ২০২১ 



সম্পাদনা - ধর্মেন্দ্র বিশ্বাস ও মণিকা চক্রবর্তী 
অনলাইন সম্পাদনা - সুমন্ত কুন্ডু 

প্রচ্ছদ - এম আই মিঠু  


অচিনপাখির ঠিকানা -

মেঘতরনঙ্গ ভবন
কাঁদোয়া, কৃষ্ণনগর, নদিয়া 


*** 

WhatsApp No - + 91  9609513423 & 9734645123

Mail Id - achinpakhipotrika@gmail.com 

Facebook Page -: https://www.facebook.com/অচিনপাখি-পত্রিকা-ও-প্রকাশন-100351232295155/ 

*************

Monday, June 28, 2021

সম্পাদকীয়

     বঙ্গে এসেছে বর্ষা । আষাঢ়ের প্রথম দিবসেই কালো মেঘের ঘনঘটা । বর্ষা সাথে করে যে ভরসার কথা নিয়ে এসেছে তা হল মহামারীর প্রভাব ক্রমশ নিম্নমুখী হওয়া । করোনার সংক্রমণ বা মৃত্যুর হার বিগত কয়েকদিনে হ্রাস পেতে শুরু করেছে । দুঃসময় কাটিয়ে আমাদের পৃথিবী সুস্থ হয়ে উঠবে- যে বিশ্বাস আমাদের প্রতিনিয়ত ভরসা জুগিয়েছে সেই বিশ্বাসেরই প্রতিষ্ঠা দৃঢ় হচ্ছে । নতুন আশা নিয়ে, নতুন অঙ্গীকার নিয়ে স্বাভাবিক জীবনের পথে ফিরে আসছে সভ্যতা । 

    অচিনপাখি ডিজিটালের পক্ষ থেকে ব্লগ সংখ্যা জুন, ২০২১, নবম বর্ষ প্রকাশ করা হল । প্রতিবারের মতই এবারেও একাধিক বিশিষ্ট কবির লেখা এবং পাশাপাশি নতুন প্রতিভার খোঁজে আনকোরা কবির কলমকেও পাঠকের সামনে নিয়ে আসার উদ্যোগ আমরা বজায় রাখার চেষ্টা করেছি । 

    এবারের ব্লগ সংখ্যাটি শুধুমাত্র কবিতা, ছড়া দিয়েই সাজানো হয়েছে । অণুগল্পকে আমরা ব্লগের মনোনয়নে রাখিনি  কারণ অচিনপাখি ‘অণুগল্প অন্বেষণ’ উদ্যোগের মাধ্যমে অণুগল্প প্রকাশের বাস্তবায়ণ শুরু হবে শীঘ্রই । অচিনপাখির নির্বাচিত অণুগল্প পড়ার জন্য এবং পরবর্তী পর্বে লেখা পাঠানোর বিজ্ঞাপনের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন । 

    ব্লগের ক্ষেত্রে আগামী সংখ্যায় অর্থাৎ জুলাই, ২১ সংখ্যা আমরা বিশেষ ‘কবিতায় বর্ষাবরণ’ সংখ্যা করবার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে । বর্ষাভিত্তিক কবিতা ও ছড়া জুলাই এর ২০ তারিখের মধ্যে পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের মেল আইডিতে । 

    করোনা অতিমারির ক্রান্তিকাল কেটে গেলে আমাদের জনজীবন আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে । ডিজিটাল সংখ্যার পাশাপাশি অচিনপাখির প্রিন্টেড সংখ্যা ও প্রিন্টেড গ্রন্থ সংকলনের কাজও দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ । 

    সাহিত্যচর্চায় থাকুন । অচিনপাখির ব্লগ পড়ুন, মতামত জানান, লেখা পাঠান আবেদন রাখি । সকলের শুভ প্রচেষ্টার ফলেই পৃথিবী যেমন নির্মল হবে একদিন, তেমনই একদিন হবে সৃষ্টির আহ্বানে উদ্বেলিত, মহানন্দের জয়গানে মুখরিত । 

    সকলে সুস্থ থাকুন, সাহিত্যে থাকুন, সৃজনশীলতায় থাকুন ।  অচিনপাখি পরিবারের পক্ষ থেকে সকলকে শুভেচ্ছা জানাই । 


সুমন্ত কুন্ডু 

অনলাইন সম্পাদক 


**********


Friday, June 25, 2021

সূচিপত্র


 অচিনপাখি 

সপ্তম সংখ্যা, নবম বর্ষ, জুন-২১ 


কবিতা - 

পবিত্র সরকার  *  তপন বন্দ্যোপাধ্যায়  *  নির্মলেন্দু গুণ  *  কৃষ্ণা বসু  *  অসীম সাহা  *  রহিম শাহ্  * মিলনকান্তি বিশ্বাস  *  আনসার উল হক  *  অচিন্ত্য সুরাল  *  তাপস রায়  *  বিজয়া দেব  *  মেঘ বসু  *  চৈতন্য দাশ  *  বিষ্ণুপদ বালা  *  শিবানী বাগচী  *  শুভদীপ দে * এস কবীর  *  প্রদীপ মণ্ডল  *  সবিতা বিশ্বাস  *  সবুজ জানা 


ইন্দ্রনীল দাস  *  পারমিতা ভট্টাচার্য  *  বাপ্পাদিত্য পাণ্ডে  *  শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস  *  অভিজিৎ দাশগুপ্ত  *  সৌরভ ঘরামী  *  শম্ভুনাথ কর্মকার  *  সত্যজিৎ রজক  *  তনিমা সাহা  *  হামিদুল ইসলাম  *  অর্পিতা ঘোষ * সুবীর মণ্ডল  *  তিতাস সরকার  *  সুমন ঘোষ  *  সজল বন্দ্যোপাধ্যায়  *  অনিরুদ্ধ সুব্রত  *  সুতপা ব্যনার্জি (রায়)  *  অমিতাভ সরকার  *  অমল কুমার বর্মন  *  বাপন হাজরা  *  খগেশ্বর দাস 


সম্পাদকত্রয়ীর কবিতা 

সুমন্ত কুন্ডু  *  মণিকা চক্রবর্তী  *  ধর্মেন্দ্র বিশ্বাস 








Thursday, June 24, 2021

লিমেরিক - পবিত্র সরকার


 লিমেরিক


ঠিকই আছে, তবে


নিয়ম মেনেই কয়েকটি পিস অগ্রিম কালবৈশাখী ছিল ;

আকাশে তাকিয়ে দেখা গেছে কিছু বিধিসংগত মেঘের মিছিলও ।

বর্ষা আসছে ঠিকঠাকই, তবে,

এ প্রশ্নটাও করতেই হবে--

এত বাজ ফেলে মানুষ মারার দরকারটা কি খুব বেশি ছিল  ?




আমরা কু-লোক  


গরমে ও ঘামে অতিষ্ঠ দেহ, মেঘগর্জনে চিত্তে পুলক ;

ভালো লাগে দেখে দাপুটে বৃষ্টি ছেয়ে ফেলে সব দ্যুলোক, ভূলোক ।

যতই ভালো সে হোক না বর্ষা,

থেকে যায় তবু কিছু সমস্যা--

বন্যায় ভাসে বাঁধ, জমি, বাড়ি--বললেই হব আমরা কু-লোক ।




Tuesday, June 22, 2021

কবিতা - তপন বন্দ্যোপাধ্যায়


 করোনা কবিতাগুচ্ছ 


সারা বিশ্ব জুড়ে আজ উঠে গেছে কী নাভিশ্বাস 

প্রতিপক্ষ কেউ নয়, ক্ষুদ্রস্য ক্ষুদ্র ভাইরাস

কী করে রুখবে তাকে— ধর্মস্থানে খুঁজছে আশ্বাস

গিয়ে দেখে তালাবন্ধ, ঈশ্বর গেছেন বনবাস

ত্রস্ত মানুষ খোঁজে কোথায় রক্ষক আজ তার

দেখছে ঈশ্বর হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে ডাক্তার। 



মানুষ তো ভেবেছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী সে, সর্বশক্তিমান

যে যার চূড়ায় বসে কত না আস্ফালন গর্জিয়েছে রোজ

বাঁকানো টুপিটি নেড়ে অপাঙ্গে তাকিয়ে হেসে শুনিয়েছে গান

কোনওদিন ভেবেছিল অহংকার হবে তার চরম আফশোশ। 



বহু লক্ষ বছরের 'গেরামবারী' জ্ঞান, তার পরাজয়ে

কতটা ক্ষমতা তার মানবসভ্যতা আজ বুঝেছে নিশ্চয়

অজানা ধমক খেয়ে পলকা পাতার মতো ধরাশায়ী হয়ে

জেনেছে মানুষ এক কুটোস্যকুটোমাত্র তার বেশি নয়।




Monday, June 21, 2021

কবিতা - নির্মলেন্দু গুণ

 

ঘড়ি ও সময়ের গল্প


ঘড়িকে দেখে সময় হাসে।

সে ঘড়িকে ডেকে বলে-

তুমি এখানে কী করছো?

তুমি কে হে? —তুমি কে?


ঘড়ি প্রশ্ন শুনে ইতি-উতি চায়।

কিন্তু কাউকে দেখতে না পায়।

ঘড়ি প্রশ্ন করে, —আপনি কে?

আপনি কে?  আপনি কোথায়? 


সময় ঘড়ির কাঁটা ছুঁয়ে বলে,

এই যে আমি। আমি সময়।

দ্যাখো তো, চিনতে পারো কি না?

আমি ঈশ্বরের হাতের বীণা।


ঘড়ি দ্যাখে, কে যেন চকিতহাস্যে

মহাকাশে মুহূর্তে মিলায়।

তার অযুত আঁখি অন্ধ হয়ে যায়।

ঘড়ির সকল কাঁটা বন্ধ হয়ে যায়।




Sunday, June 20, 2021

কবিতা - কৃষ্ণা বসু


 মনের নির্জনে


সম্পর্ক ভেঙেছে কবে,

ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে বহুদিন আগে,

তবু সেই বাড়িটির পাশ দিয়ে যেতে যেতে

পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে !

ঢেউ তোলে ঢেউ তোলে মনের নির্জনে !

ঢেউগুলি কেঁপে কেঁপে ওঠে বারে বারে ।

আর সুগভীরে ছুঁয়ে যায় কেউ ! 

ভাঙা সম্পর্কের জন্য এখনও বুকের মধ্যে

নষ্ট নীড় জেগে আছে, ভাঙা গৃহকথা !

কেন বেঁধেছিলে তাকে নিভৃতে নিবিড়ে ?

বেঁধে তারপর ছেড়ে দিয়েছিলে !

ভাঙা সম্পর্কের গান, টুকরো ছবিগুলি

পুরনো বাড়ির কথা খুব মনে পড়ে,

খুবই মনে পড়ে-

শুধু মনে পড়ে !