Sunday, March 31, 2019

শহীদ স্মরণে 


গত ১৪ই ফেব্রুয়ারি কাশ্মীরের পুলয়ামায় বিধ্বংসী জঙ্গিহানায় ভারতের ৪০ জন সি আর পি এফ জওয়ান শহীদ হন । দেশের সেবায় নিবেদিত প্রাণ এই শহীদদের মৃত্যুতে ভারতের আপামর জনগণের হৃদয়ে গভীর শোকের ছায়া নামে । চোখের জলে দেশ মাতার বীর সন্তানদের শ্রদ্ধাঞ্জলি জানায় সারা দেশ । 'অচিনপাখি' পত্রিকার এবারের ই- সংস্করন সেই শহীদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত । চোখের জল, হৃদয়ের আবেগ কলমের অক্ষরে আমরা সাজিয়ে দিলাম বীর শহীদদের স্মরণ করে । 
এই সংখ্যায় প্রকাশিত প্রতিটি লেখা কবি/লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা এবং তা সম্পূর্ণ তাঁদের ব্যক্তিগত মতামত । লেখার বক্তব্য এবং দায় পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর নয় ।  


এবারের সংখ্যায় শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছেন -

তরুণ মুখোপাধ্যায়
বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ
সেখ রমজান 
অংশুমান চক্রবর্তী
মৃণালকান্তি দাশ
তনুশ্রী মল্লিক
শঙ্কর দেবনাথ 
সবিতা বিশ্বাস
অর্কজ্যোতি ভট্টাচার্য 
বাপ্পাদিত্য পাণ্ডে
তাপস বৈদ্য
জগদীশ মণ্ডল 
এস কবীর
রিয়া ভট্টাচার্য
সন্তু জানা
অমূল্য রতন মাল 
টুম্পা মিত্র সরকার 
মানসী মিশ্র হালদার
ছোটন গুপ্ত
জয়ন্ত হালদার
ইমন গাঙ্গুলী 
অশোক কুমার লাটুয়া 
সোমা ধর ঘোষ 
অভিজিৎ মুখার্জি 
শিবব্রত গুহ 
বিমল মণ্ডল 
আশুতোষ রায় 
শিবনাথ দত্ত
শরাফত হোসেন 
মিঠুন বিশ্বাস
পাপিয়া মণ্ডল 
অমলেন্দু বিশ্বাস
নির্ভেদ গঙ্গোপাধ্যায়
বিকাশ দাশ 

প্রচ্ছদ শিল্পী - জয়ন্ত বর্মণ 

সম্পাদনায় - ধর্মেন্দ্র বিশ্বাস 

সহ সম্পাদনা - সুমন্ত কুণ্ডু 

সহযোগিতায় - অচিনপাখি পত্রিকা পরিবার । 




কবিতা - তরুণ মুখোপাধ্যায়


শহীদ তর্পন

কফিন, কবর, আগুন
এবার সবাই জাগুন
ঘুমের আবেশ ভাঙ্গুন –

জানি নাকো কার কী ভুল,
ঝরল জীবন-মুকুল,
বরফে ফোটে লাল ফুল !

শহীদ, ওরাই শহীদ,
মরণপণ সব জিদ,
দেশ-পাহারায় বিনিদ ।

আগলে ওরাই রাখছে,
ঘাইন বারুদ মাখছে
মরণ ওদের চাখছে ।

তবুও অমর জোয়ান –
ওরাই তো বীর, মহান ।। 

মুক্তগদ্য - বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়


আমরা করব জয়

আজ গোলাপের গায়ে রক্ত এসে লেগেছে । আজ কান্নায় বদলে গেছে দেশের সবকটা নদী ।  মাইনাস ডিগ্রির অনেক নীচে নেমে যাওয়া তাপমাত্রার ভিতর যাঁরা অতন্দ্র দাঁড়িয়ে থাকেন, বাবা-মা-স্ত্রী-সন্তানকে ছেড়ে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত দাঁড়িয়ে থাকেন, আর থাকেন বলেই আমি-আপনি ঘুমোতে পারি নিশ্চিন্তে, আলোচনা করতে পারি, গান-কবিতা-সিনেমা নিয়ে, অটোগ্রাফ দিতে ও নিতে পারি, আজ তাঁদের প্রায় পঞ্চাশজন খুন হয়েছেন, (জানি না শেষ অবধি সংখ্যাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে) ।
এবার হোয়াটঅ্যাবাউটারির খেলা শুরু হবে । পুলওয়ামায়  পাকিস্তানের মদতপুষ্ট, চিনের আশীর্বাদধন্য জঙ্গীদের হাতে খুন হওয়া সৈন্যদের দুঃখে  দান্তেওয়াড়ায় ভারতীয় সৈন্যদের নির্বিচারে খুন করা জঙ্গীদের উকিলরা কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করবেন। আরও বড় মাথারা, আফজল গুরু আর আজমল কাসভের  বেদনায় কাতর হায়েনাধিকারওয়ালারা গর্তে ঘাপটি মেরে থাকবে কয়েকদিন, নয়তো এই নৃশংসতার জন্য ভারত সরকারকেই দায়ী করবে ঘুরিয়ে। করবে কারণ, চিন এবং পাকিস্তান নিয়ে ওদের কোনও অসুবিধে নেই। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে তিরিশ লাখের বেশি বাঙালিকে হত্যা করা পাক সেনাবাহিনীর কোনও অত্যাচারের কথা আপনি কোনওদিন শুনেছেন, অরুন্ধতী রায়'দের মুখে? কেন শোনেননি ?
 গত পঞ্চাশবছর ভারতের যে প্রধানমন্ত্রী যখন অরুণাচল প্রদেশে যান, (তাঁর নাম, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, অটলবিহারী বাজপেয়ী, মনমোহন সিংহ কিংবা নরেন্দ্র মোদী, যাই হোক না কেন), তারস্বরে চিৎকার শুরু করে চিন, অরুণাচলকে নিজেদের অংশ দাবি করে! কোনওদিন চিনের মানসপুত্রদের প্রতিবাদ করতে শুনেছেন তার ?
শুনবেন না। যে মৌলানা মাসুদ আজহারকে 'সন্ত্রাসবাদী' বলে ঘোষণা করতে দিচ্ছে না চিন, সেই আজহার যে আজকের ভারতীয় সেনার হত্যাকাণ্ডের পিছনে নেই, কে বলবে? চিনের কোনও সমালোচনা শুনেছেন, 'সহিষ্ণু' সাংস্কৃতিক জারদের মুখে ?
শুনবেন না। এদের সমস্যা বিরাট কোহলির ঔদ্ধত্য নিয়ে, কারণ বিরাট ভারতকে জেতায়। আন্তর্জাতিক বেটিং চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বহিষ্কৃত আজহারউদ্দিনকে নিয়ে কোনও সমস্যা থাকার কথা নয় তো। নেইও।
কাশ্মীরে থাকা বিলাল আমাদের তিরিশ বছর ধরে শাল-সোয়েটার দেয়। পাঁচদিন আগে যখন এই বছরের শেষ ইনস্টলমেন্টটা নিতে এসেছিল, সেই এক প্রশ্নটা করলাম, "কাশ্মীরীরা সবাই ভারত থেকে আলাদা হতে চায়?"
একই উত্তর দিল বিলাল, "একবার কয়েকজনের পাল্লায় পড়ে শাল-সোয়েটার বেচতে পাকিস্তান গিয়েছিলাম।কলকাতায় যা ব্যবসা হয়, তার পাঁচভাগের একভাগ ব্যবসা হয়নি। আবার মরতে যাব ওখানে?"
আপনার পাড়ায় যে শালওয়ালা ঘুরছে, তাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, এক উত্তর পাবেন। একই উত্তর পাবেন, জঙ্গীদের হাতে খুন হওয়া  ঔরংজেব, গওহর আহমেদ ভাট, আয়ুব ভাটের পরিবারের থেকেও। এবছর ভারতের 'আই লিগ' জিততেও পারে যারা, সেই রিয়াল কাশ্মীরের ফুটবলাররাও আলাদা কিছু বলবে না সম্ভবত ।
কিন্তু মাওতীর্থ এবং মরুতীর্থ স্পন্সর্ড নেটওয়ার্ক সেই কথা জানতেই দেবে না আপনাকে। কোনও জঙ্গী সিম্প্যাথাইজারের কোমরে দড়ি পড়লে রাতের ঘুম উড়ে যায় যাদের আজ তারা পঞ্চাশজন সৈনিকের মৃত্যুতে একটি কথাও বলবে না, যতক্ষণ না পাকিস্তানকে নির্দোষ প্রমাণ করার মতো কিছু পাচ্ছে ।
 আমার বেশ কিছু পাকিস্তানি বন্ধু আছে । তারা কেউ আমেরিকায় ট্যাক্সি চালায় কেউ বা হোটেল। লেখালিখিও করে কয়েকজন। প্রায় সবাই  ব্যক্তিগত আলোচনায় মেনে নেয় যে পাকিস্তান আসলে একটা দেশ নয়, একটা 'ভাবধারা'। 'ভারতকে ধ্বংস করতেই হবে', এই ভাবধারা ।
সেই ভাবধারার বিরুদ্ধে লড়াই মানে পাকিস্তানের সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে লড়াই নয়। একটা 'অভিশাপ'এর বিরুদ্ধে লড়াই।
এ দেশে সেই লড়াইটা যখন যে সরকার লড়তে যাক,  জেনারেল ইয়াহিয়া কিংবা জিয়ার মুখপাত্ররা চিৎকার করতে শুরু করবে, 'নজরদারি' হচ্ছে, 'প্রাইভেসি' নষ্ট হচ্ছে; আর তারপর 'উরি' কিংবা 'পুলওয়ামা' ঘটলেই 'ইন্টেলিজেন্স ব্যর্থতা' বলে হাত ধুয়ে ফেলতে চাইবে ।
কিন্তু রক্ত ধুয়ে ফেলা যায় না। বিশেষ করে তা যদি পরিবারের হয়। আজ যারা আপনি নিজের দেশের হয়ে কিছু বলতে উঠলে 'দাগিয়ে দিচ্ছে' , 'থামিয়ে দিচ্ছে', কাল তারা আপনাকে আপনার বাবা-মা, কিংবা সন্তানের মৃত্যুতে কাঁদতে পর্যন্ত দেবে না।
আজ রাতটা কাঁদুন। আর কাঁদতে কাঁদতেই লড়াইটা শুরু করুন। পাকিস্তান নামক একটা 'ভাবধারা'র সঙ্গে। একটা 'অভিশাপ'এর সঙ্গে ।
পুনশ্চঃ সেই অভিশাপের থাবা থেকে আপনাকে-আমাকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ বলিদান দেওয়া প্রত্যেকটি জওয়ানকে প্রণাম । যারা আমাদের খুন করে, তারাই আবার  আমাদের মৃত্যুভয়টাও কাটিয়ে দেয় ।
উই শ্যাল ওভারকাম। উই মাস্ট ।

কবিতা - শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ


ও পিয়ালের মা

ও পিয়ালের মা -  শোনো পিয়াল বেঁচে আছে,
বাপ হারানো কন্যেটিকে একটু টানো কাছে ।
বাবার সাথে ব্যাডমিন্টন খেলবে বলে ও যে,
কাটা কোর্টের দিকে চেয়ে  ওর বাবাকেই খোঁজে ।
সন্ধেবেলায় আসবে কফিন তার ভেতরে বাবা
থাকবে শুয়ে সঙ্গে নিয়ে বিস্ফোরণের থাবা ।
অবাক চোখে দেখবে শুধু,কাঁপবে বুকের ঘর
বুঝবে না ও মায়ের বুকে কোন সে কঠিন ঝড় ।
হয়ত তোমায় বলবে, মাগো ওই কি আমার বাবা ?
মিথ্যে বলছে সবাই,আমি অতটা নই হাবা !
কেউ হয়ত বলবে, মিতা, পিয়াল চেয়ে আছে,
বাপ হারানো কন্যেটিকে একটু টানো কাছে।

বলতে পারে, ওকে ঘিরেই স্বপ্ন বোনো মিতা,
ওর বুকেতে জ্বলতে থাকুক ওর পিতারই চিতা ।
পুলওয়ামার স্মৃতি যেন গড়তে থাকে ওকে,
বিগ্রেডিয়ার হওয়ার স্বপ্ন থাকুক না ওর চোখে ।
জঙ্গি দমন কোনো শাখার অধিনায়ক হয়ে,
জঙ্গি মুক্ত ভারত গড়ার শপথ বেড়াক বয়ে।
ঝাঁসির রানির মতোই পিয়াল হোক না বীরাঙ্গনা,
আমরা সবাই ওর জন্যে করব আরাধনা।
ও পিয়ালের মা - দেখো পিয়াল চেয়ে আছে,
বাপ হারানো কন্যেটিকে একটু টানো কাছে ।

ও পিয়ালের মাগো,
তুমি শোক ভুলে আজ জাগো ।
তোমার চোখের জলেতে আজ যে মাটিটা ভিজে,
সেই মাটিতে অগ্নিগিরি আপনি জাগুক নিজে ।
যে ফাগুনের পথের আগুন কাড়ল সেনার দেহ
হাজার পিয়াল বলুক ওরা পার পাবে না কেহ ।
একটা পিয়াল, দুটো পিয়াল, তিনটে পিয়াল মিলে,
বুকের মধ্যে ক্রোধের শক্তি জমাক তিলে তিলে।
ও পিয়ালের মা - দেখো পিয়াল চেয়ে আছে,
বাপ হারানো কন্যেটিকে একটু টানো কাছে ।

কবিতা - সেখ রমজান


আমরা একক

দুই চোখে তীব্র দাহ, উষ্ণ লাভা
ধু ধু মরুমাঠ
ক্রোধের আগুন জ্বলে রাত্রিদিন
সূর্য পোড়াকাঠ ।

সন্ত্রাসীর কিবা দেশ কিবা জাত
অন্ধকার ওদের আবাস
ওরা কাপুরুষ, নরকের কীট
অন্ধকারে ওদের বিনাশ ।

প্রতিটা ইঞ্চি বুঝে নিতে যারা শহীদ
তারা সদা জাগরুক প্রাণে
মৃত নয় তারা জীবিত অধিক, শ্রদ্ধা
এবং ভালোবাসা সম্মানে ।

এ মাটি আমার, আত্মা আমার
এসো হাতে হাত রাখি
শত্রু বিনাশে আমরা একক
হৃদয়ে হৃদয় ডাকি ।

কবিতা - অংশুমান চক্রবর্তী


ক্ষত

মিছিলে হাঁটিনি, জ্বালাইনি মোমবাতি
প্রতিটি কফিনে আমার নিথর দেহ,
তবু যেন কার চওড়া হচ্ছে ছাতি
আচ্ছে দিনের নামতা পড়ছে, কে ও?

ধর্ম-কাহিনি আদৌ শোনে কি চোর?
হিংস্র শ্বাপদ মানুষ হয়েছে কবে?
মুখ লুকোচ্ছে সমস্ত উত্তর
লাশের পাহাড় রক্তের উৎসবে

ভেঙে চুরমার বন্ধুত্বের হাত
শান্তির বাণী? প্রহসন মনে হয়,
দিনের আলোয় হঠাৎ নেমেছে রাত
মার খেতে খেতে দূরে সরে গেছে ভয়।

আমরা জেনেছি চোখের উপর চোখ
আমরা শিখেছি শত্রুর মুখে ছাই,
কারা হেঁকে যায়, প্রতিশোধ নেওয়া হোক---
তাতে কি ফিরবে আমার জওয়ান ভাই?

মিছিলে হাঁটিনি, জ্বালাইনি মোমবাতি
বুকের গভীরে জন্ম নিয়েছে ক্ষত,
ভুলতে বসেছি আমরা কে কোন জাতি
জানি না কীভাবে থাকা যাবে সংযত ।

কবিতা - মৃণালকান্তি দাশ


এপিটাফ

তোমরা বইমেলায় যাও না-
সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকো ।
তোমরা রেস্তরাঁয় যাও না-
শুকনো রুটিতে কান্না মেখে খাও ।
তোমরা যেদিন পিকনিকে যাওয়ার কথা ভাবো,
ঠিক সেদিনই সীমান্তের ওপার থেকে
ছুটে আসে আগুনের গোলা ।

মাঝে মাঝে জাতীয় পতাকায় মোড়া
কালো কফিন আসে গ্রামে-গঞ্জে,
ভারী বুটের শব্দ, গান স্যালুট,
মেয়েবৌদের রুদ্ধশ্বাস নীরবতা, কথার ফুলঝুরি শেষে
কিছু ছাই উড়ে যায়
মুখ কালো করে ।

সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছে যারা,
তারা কোনদিন গান গাইতে পারে না,
লিখতে পারে না এক পঙক্তিও-
আমরা,  অবিশ্বাসীরা,
তাদের জন্য এপিটাফ লিখি ।

কবিতা - তনুশ্রী মল্লিক


বরফ ঢাকা রক্ত নদী

চারিদিকে এমন ভয়ংকর সুন্দর ও শীতল মৃত্যুর সহাবস্থান মনে হয় এই ভূস্বর্গেই হয় , ঝকঝকে বরফের বুকে রোদ পিছলে উঠলে মনে হয় চকচকে ছুড়ির উদ্ধত ফলা আমূল বিঁধে দেবে , এমন সুন্দর রুপের অন্তরালে কেমন মৃত্যু বসেছিল নিরবে নিভৃতে, কতগুলো যৌবন চিনার পাতার মতো ঝরে গেলো এই বসন্ত আগমনে, সমস্ত পাহাড় আজ রক্তাক্ত, সিন্ধুর বুক জুড়ে লাল স্রোত, লিডারের জলে বয়ে যাচ্ছে অকালমৃত্যুর নিরন্ন হাতছানি, কি করে পারো তুমি এতো পৈশাচিক হতে , এমন সৌন্দর্যের কাছে নিজেকে নত রাখতে অভ্যাস করো ,
কতগুলো হৃদস্পন্দন এমন করে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেলো
তোমার হিংস্র মননের কাছে ,
কি করে পারলে এতো বারুদ জমায়েতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিতে ,
এই ওক পাইন রডোড্রেন আর চিনারের স্খলনে এক মনখারাপ খসে যাওয়া মুহূর্তে
নতুন করে বেঁচে ওঠার আগেই এমন ধ্বংসের হাতছানিকে বরফগলা জলের সঙ্গে লিডার নদীতে ভাসিয়ে দিতে পারতেতো ,
কিছু তাজা প্রাণ হয়তো এখনও শ্বাস নিতো এই সুন্দর পৃথিবীতে

কবিতা - শঙ্কর দেবনাথ


হাহাকার

ফোন করে বোন বলেছিল - দাদা,
আসবি রে তুই কবে?
সত্যি বলছি এবার এসেই
বৌদি আনতে হবে ।
দেশরক্ষার দায়িত্ব নিয়ে
গাঁয়ের চাষার ছেলে-
বোনটির বড় প্রিয়তম দাদা
চলে গেছে তাকে ফেলে ।
দাদা বলেছিল আসবে সে ঠিকই
আসছে হোলির ক্ষণে-
মনে করেছিল বোনকে এবার
সাজাবে মিষ্টি কনে।
হোলির আগেই বলি দিল দাদা
দেশের জন্য প্রাণ-
বোনের হৃদয়- মা'র সংসার
ভেঙে হলো খান খান।
নিঃস্ব বোনের দু'চোখে গ্রীষ্ম-
বিধবা জননী তার-
চুপ হয়ে গেছে বুক ভরে নিয়ে
সাহারার হাহাকার ।

কবিতা - সবিতা বিশ্বাস


বলি

কি করে লিখব বলো গল্প কবিতা ছড়া
খাতা জুড়ে ঝরে পড়ে তাজা রক্তের ফোঁটা
ঝাপসা অক্ষরগুলো যায় না কিছুতে পড়া

বারুদের গন্ধ হানা দেয় কনভয়ে ঢুকে
রক্ত গায়ে মেখে পড়ে থাকে জয় জওয়ান
স্হির চোখে চেয়ে রয় বুলেটবিদ্ধ বুকে

পুলওয়ামা থেকে ভেসে আসে আর্তস্বর
স্তুপীকৃত পড়ে আছে ছিন্নভিন্ন দেহ
কে বাঁচাবে হায়? আল্লা, যীশু না ঈশ্বর?

সব দেখেশুনে চুপ করে থাকা অপরাধ
নিজের কাছেই নিজে হেরে যাই প্রতিদিন
মনের খাতায় তাই লিখে রাখি প্রতিবাদ

শহীদের রক্তে যারা খেলছে আজকে হোলি
চিনে রাখো বন্ধু, সাজো সাজো রণসাজে
রক্তঋণ শুধতে আমরা দেবই ওদের "বলি"।

কবিতা - বাপ্পাদিত্য পাণ্ডে


ভারত সেনা

পাকিস্তানী জঙ্গি তোরা                করেই গোপন ছল
ভারত সেনা মেরে ভাবিস            ভাঙবি মনোবল !
ভীতুর মতো কাজটা তোদের       পাকিস্তানের লাজ
সেনা মেরে ভেবে নিলি জিতে       গেছিস আজ ! 


মনে রাখিস ভারত সেনা            জানে না তো ভয়
দেশের জন্য সদাই তারা           বুকটি পেতে রয় ।
ইচ্ছে হলেই এক নিমেষে          করবে তোদের শেষ 
বিশ্বব্যাপি রইবে শুধু               তোদের মারার রেশ ।


যে সব সেনা মারলি তোরা          হিসেব করে রাখ
ভারত সেনার হাতেই তোদের      মহাকালের ডাক ।
দেশের জন্য জীবন দেওয়া          গর্বে ভরে বুক
সূর্যের মতো তেজে ভরা             ভারত সেনার মুখ ।

কবিতা - তাপস বৈদ্য


বক্ষবিদারী

কষ্টের দাবানল শুধু সেনা-ছাউনি জানে
সামরিক সরঞ্জামে তারা কত থাকে ভালো
হাসিমুখ মেয়েটির স্মৃতি ভেসে এলে গানে
পাথরও বোঝে শোক কত কঠিন ও কালো ।

পেটের দায় বড়ো বেশি খোঁচা দেয় রোজ
কীভাবে নাছোড় লাগে কাঁটাতারের আঁচড়
দূরভাষে কাছে এলে ঘরের টুকরো খোঁজ
হা-হুতাশ করে ওঠে বুকের তীব্র মোচড় ।

অন‍্যায়ের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু ছেলেবেলা থেকে
হাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে খেলে নিশাচর
মন-পাখি প্রাণ-পাখি গুমরায় মুখ ঢেকে
দায়িত্ব মানে না কে আপন আর কে বা পর ।

আচমকা চলে গেলে শুধু প্রশ্ন জাগে কেন
যেকোনো বিদায়গাথায় সবকিছুই দামী
কফিন বাহক সেনাবন্ধুরা মৃতমূর্তি যেন
বিউগলে সকরুণ বাজে বুকের সুনামী ।

কবিতা - জগদীশ মণ্ডল


বীর জওয়ান

দেশের জন্য শহীদ হলেন
বাংলার দুটি বীর
শ্রদ্ধা জানাই ভক্তি ভরে
নীচু করি শির ।

ঊনপঞ্চাশ জোয়ান মেরে
বানায় মৃত্যুপুরি
আত্মঘাতী জঙ্গি তোদের
এ কোন বাহাদুরি ।

কাপুরুষ তোরা তাই জানাই
ধিক তোদের শত ধিক
চেয়ে দেখ বীর জোয়ানের জয়
জয়গাথা চারিদিক ।

দেশ পাহারায় মৃত্যু হল
মহৎ তাদের প্রান
ইতিহাস হবে একদিন ঠিক
শহীদের বলিদান ।

আর কত প্রান বিনিময়ে
কাশ্মীর শান্ত হবে
বীর জোয়ানের কড়া পাহারায়
স্বদেশ শান্ত রবে ।

কবিতা - এস কবীর


ভূস্বর্গের রক্ত-বিলাপ

আমি দিয়েছিলাম রক্তিম গোলাপ
ভালোবাসার নৈসর্গিক সুখ
তুমি ফিরালে রক্ত-বিলাপ
এখনো সারেনি তোমার সন্ত্রাসের অসুখ !

ফাগুনের বিকেলে ঝরালে ঝলসানো আগুন
দিলে, রক্ত-ভেজা টিউলিপ উপহার
আজ তবে আতঙ্কিত ভূস্বর্গের দ্বার !

কলঙ্কিত প্রেমের-দিন, শোকস্তব্ধ পুলওয়ামার
দিকে-দিকে প্রেম হীন, বিবেক হয়েছে ছাড়খার !

বীর শহিদের আত্মত্যাগে আর কতদিন
তুমি 'ব্রুটাস' হবে রক্তাত্ব কাশ্মীর ?
চেয়ে দেখো - বিষ-ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে
প্রিয় ঝিলামের তীর !

মূর্খের রাজ্যে বাস করে স্বর্গের হাতছানি চাও ?
অপুরুষ 'ফিদায়ঁ'-এর হীন নীতি ছেড়ে
বীর সৈনিকের সম্মুখ রনে  লড়তে যাও
চেয়ে দেখো- দিকে-দিকে রিক্ত হাহাকার !
বিতস্তার জলে ভেসে গেল কত শহিদের পরিবার !

কান পেতে শুনো- প্রশ্ন করে 'সোনার তৃণভূমি'
প্রশ্ন করে- সপ্তসিন্ধু'র পারাবার
এ -যুদ্ধ কার? এ- কাশ্মীর কার ?
এ নিশাত বাগ- এ চেরির ফুল ?
এ টিউলিপ গার্ডেন - এ জাফরানী ফুল ?

চেয়ে দেখো- এ চিনা বৃক্ষের আগুন
ধরিয়েছে মুগ্ধ-মনের ফাগুন !

ফিসফিস করে বলে-
এ কাশ্মীর আমার, এ কাশ্মীর তোমার
এ ভারত আমার, এ ভারত তোমার ।
ফিরে এসো নওজোয়ান
ডাকছে তোমায় হিন্দুস্থান ।