Saturday, April 24, 2021

প্রথম পাতা - নববর্ষ সংখ্যা

 




নববর্ষ ! জীর্ণ পুরাতনকে ভেঙে নতুনের আহ্বান । আশা নতুন দিনের, আলো নতুন সভ্যতার, উচ্ছ্বাস নতুন জীবনের । নবউদ্দীপনার উন্মাদনায় বসন্ত হাওয়াও তার শেষটুকু মাধুর্য্য ঢেলে দিয়ে যায় বর্ষবরণের গানে ।

কিন্তু  ‘ এ কোন সকাল !  রাতের চেয়েও অন্ধকার !’ –

অতিমারি আক্রান্ত আমাদের এ সাধের পৃথিবীতে আজ কিসের এই অশুভ দুর্বিপাক । বিশের বিষে নীলকণ্ঠ পৃথিবী কি একুশেও রোগমুক্ত হবে না ?  প্রচেষ্টা, পার্থনার পরেও আমরা অনিশ্চিত । রবি ঠাকুরের স্ফুলিঙ্গ কবিতার সেই দুর্ভাবনার দিনই কি –

‘নববর্ষ এল আজি

দুর্যোগের ঘন অন্ধকারে ;

 

পুরাতন জীর্নতাকে ছুঁড়ে ফেলে যখন আমারা নতুন করে বাঁচার উদ্যোগ নিচ্ছি তখনই আবার ছন্দপতন । নতুন করে বিষ বাতাসের হাওয়া, নতুন করে মৃত্যুমিছিল ।

এই দুর্দিনে আমরা হারালাম আমাদের অবিভাবক তথা প্রাণের মানুষ, হৃদয়ের বড় আপন কবি শঙ্খ ঘোষকে । আমারা ভারাক্রান্ত, আমরা অশ্রুসজল, আমরা উদ্বিগ্ন । অচিনপাখির সমস্ত কবিতা সংকলন ওনার স্বর্ণস্পর্শে ধন্য । ওনাকে হারাবার এই বিহ্বলতা আমাদের বর্ষবরণের মুক্ত আকাশে এক কালো মেঘের ছায়া প্রলম্বিত করেছে ।

তবুও নতুনের আহ্বান স্তব্ধ হওয়ার নয় । জরা, ব্যাধি, মৃত্যুগ্রস্থ এই পৃথিবীতেও তবু থামেনি গান, থামেনি কণ্ঠ, থামেনি কলম । নতুনের আহ্বান, নতুন আশার আলো, নতুন জীবনের শপথ আর সেই  উদাত্ত উচ্চারণ–

মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,

অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা ।


  করোনাকালের দুঃসময়ের সাথে লড়াই করেও আমাদের সাহিত্য-শিল্প-সৃষ্টির এই দুর্নিবার দায়িত্ব পালনে স্থির থাকতে হবে । অচিনপাখি পরিবার এক সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে । তাই আমাদের সৃষ্টির এই আয়োজন,  উদযাপনের এই সমারোহ,  বর্ষবরণের এই আহ্বান ।

অচিনপাখি পত্রিকার প্রিন্টেড সংখ্যার পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমেও ব্লগ বা ই-ম্যাগাজিন-এ আমরা প্রতিমাসেই সাধারণ ও বিষয়ভিত্তিক সংখ্যা করতে আগ্রাহী । সকলকে অচিনপাখি পরিবারের সাথে যুক্ত হওয়ার, ব্লগ পড়ার, লেখা পাঠানোর, সমালোচনা ও মতামতপ্রদানের অনুরোধ জানানো হচ্ছে ।

আমারা আশা রাখি ‘সবার পরশে পবিত্র করা এই তীর্থনীড়ে’ আবার জেগে উঠবে নতুন পৃথিবী, নতুন আনন্দ । অচিনপাখি পরিবারের পক্ষ থেকে সকলকে জানাই শুভ নববর্ষ ১৪২৮!  

সুস্থ থাকুন,   সাহিত্যে থাকুন,   সৃজনশীলতায় থাকুন   



সূচি 

শঙ্খ ঘোষ স্মরণে 

কবিতা-ছড়া  -

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী  *পবিত্র সরকার  * নির্মলেন্দু গুণ  * অসীম সাহা * তরুণ মুখোপাধ্যায়  * সুধীর দত্ত  * মিলনকান্তি বিশ্বাস  * সিদ্ধার্থ সিংহ  * চৈতন্য দাশ  * অনীশ ঘোষ  * বিজনকান্তি বণিক  * বিজয়া দেব  * পার্থপ্রতিম বিশ্বাস  * স্মরজিত বিশ্বাস  * হাননান আহসান 

 অণুগল্প - 

কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়  * অনন্যা দাশ  * মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়  * দীনমহাম্মদ শেখ  * মৌ দাশগুপ্ত  * হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়  * সঞ্জয় গায়েন

কবিতা-ছড়া  -

স্বপনকুমার বিজলী  * শিবানী বাগচী  * গৌতম মুখোপাধ্যায়  * প্রণবকুমার চক্রবর্তী  * শম্ভুনাথ কর্মকার  * সোমা ধর ঘোষ  * শক্তিপদ পন্ডিত  * বিকাশ দাস  * সুমিত বেরা * প্রদীপ মন্ডল  * এস কবীর  * বিশ্বজিৎ হালদার  * মৌসুমি চট্টোপাধ্যায় দাস  * মণিকা চক্রবর্তী  * ধর্মেন্দ্র বিশ্বাস * সুমন্ত কুন্ডু 



প্রচ্ছদ -  জয়ন্ত বর্মন 

সম্পাদনা - ধর্মেন্দ্র বিশ্বাস ও মণিকা চক্রবর্তী 

অনলাইন সম্পাদনা - সুমন্ত কুণ্ডু 








Thursday, April 22, 2021

শঙ্খ ঘোষ স্মরণে

 


                                          ( ৫ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৩২ - ২১ শে এপ্রিল, ২০২১ ) 


    করোনাকালের এই দুঃসময়ে বাংলাসাহিত্য জগতে আরও এক ইন্দ্রপতন । ২১ শে এপ্রিল, ২০২১ অমৃতলোকে পাড়ি দিলেন কবি, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক তথা জ্ঞানপীঠ পুরস্কার প্রাপ্ত সাহিত্যিক, অবিভাবক শ্রী শঙ্খ ঘোষ । অচিনপাখি পত্রিকা প্রকাশন তাঁর আশির্বাদধন্য । হলদে পাখির ডানা, একশো কবিতা সংকলন, শারদ সংখ্যা সবেতেই ওনার লেখার স্পর্শে আমাদের সংকলন সমৃদ্ধ হয়েছে । ওনাকে হারানোর বেদনায় অচিনপাখি পরিবার শোকাহত । 

    নববর্ষ সংখ্যাতেও তাঁর একটি কবিতা আমরা প্রকাশ করছি । কবির নশ্বর দেহ লোকান্তরিত হয় কিন্তু তাঁর কবিতা, তাঁর ভাষা, তাঁর ব্যঞ্জনা, তাঁর সৃষ্টির অমৃতসুধা আজীবনের, তা অমরত্ব উত্তীর্ণ ।

    অচিনপাখি পরিবার কবির বিদেহী আত্মার চির অক্ষয় শান্তি কামনা করে । তিনি আজীবন আমাদের হৃদয় মন্দিরে পূজিত হবেন ।  



দায়বদ্ধ

শঙ্খ ঘোষ

 

স্বপ্নের ভিতরে ঘোর জলোচ্ছ্বাস। কী কথা সে বলে ?

জাগরণে কোনো সাড়া নেই ।

বছর বছর জুড়ে শালবনে শালবনে শিকড়ে শিকড়ে মাথা খুঁড়ে

জেগে ওঠে প্রেতদল, জ্যোৎস্নায় ভাসিয়ে দেয় স্বরঃ

দায়বদ্ধ আমরা শুধু মৃত্যুর কাছেই ।




নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ।



শপিং মল্‌-এ


মল্‌ময় অজস্র পণ্য ভারী কায়দা করে

সাজানো রয়েছে।

তার ভিতরে কোনটা তুমি চাও ?

যেটা চাও, সেটা নইলে সত্যি কি তোমার

সংসার অচল হয়ে যাবে ?

একটু ভেবে দ্যাখো,

অজস্র পণ্যের মধ্যে কোনটা সত্যি-সত্যিই দরকার,

আর কোনটা ছাড়াও জীবন

যেমন চলছিল তেমনই চমৎকার চলে যেতে পারে।

 

কথাটা যাদের বলি, তারা প্রত্যেকেই মাথা নাড়ে,

বলে যে, এটাই খাঁটি কথা।

কিন্তু পরক্ষণে তারা, সম্ভবত অভ্যাসবশত,

যে যার ট্রলিতে

তুলতে থাকে চিত্তহারী মোড়কে জড়ানো

সেই সমস্ত মাল,

যার চোদ্দো আনা বাদ দিয়েও জীবন

স্বচ্ছন্দে কেটেছে এতকাল ।




( প্রয়াত কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী'র স্মরণে পূর্ব প্রকাশিত এই লেখাটি স্বত্ত্বাধিকারির অনুমতিক্রমে পুন;প্রকাশিত করা হল ) 



কবিতা - পবিত্র সরকার

 

একদিন

 

একদিন ধরেছিলে হাত ।

বুকের ভিতরের বজ্রপাত

হয়েছিল, তুমি তা শোননি ।

আমি সেই পরাক্রান্ত ধ্বনি

লিখে লিখে অক্ষম কলমে

পৌঁছে গেছি মৃত্যুর সঙ্গমে ।


কবিতা - নির্মলেন্দু গুণ


পলিথিন


অগ্নিতাপে চুলায় উপচে-পড়া

দুধের ফেনার মতো

                গড়িয়ে পড়ছে সময়

আমি টের পাচ্ছি

সময়ের পোড়া মাংসের ঘ্রাণ

 

আমি সমুদ্রসমূহের ওপর

আমার আস্থা রেখেছিলাম

ভেবেছিলাম এই ধরিত্রীকে

শেষতক রক্ষা করবে সমুদ্র


কিন্তু আমার অন্তরাত্মা

আজ কেঁপে উঠলো ভয়ে

যখন সমুদ্রের তলদেশে

আবিষ্কৃত হলো পলিথিন


আমি ভাবতেও পারিনি,

মানুষের লোভের মলিন হাত

সর্বংসহা এই পৃথিবীর

এতোটাই গভীরে ঢুকেছে



কবিতা - অসীম সাহা

 

এই রাতে অন্ধকারে


অন্ধকারে একটি প্রদীপ জ্বলে আমার এই জীর্ণ কুঁড়েঘরে ।

বাইরে গভীর রাতে আর্তনাদ করে ওঠে মৌসুমী হাওয়া;

আমি তার প্রতিধ্বনি টের পাই কম্পমান আলোর শিখায় ।


সংকীর্ণ সময়ের সুতোর ওপর দিয়ে যে রকম হেঁটে যায়

ক্ষুদ্র পিপীলিকা – আমিও তেমন করে লঘু পায়ে হেঁটে যাই

উপকুলে, গভীর অরণ্য-পথে ভীত আর সন্ত্রস্ত হরিণ ;

আকস্মাৎ চরাচর ডুবে যায় অন্তহীন জমাট আঁধারে ।


এই রাতে অন্ধকারে তুমিও কি জেগে আছো একা ?   



Monday, April 19, 2021

কবিতা - তরুণ মুখোপাধ্যায়

 

পরকীয়া


ঝরা বকুলের সাথে আমার মিতালি

তুমি সন্দেহ করোনি,

এমনকি সাদা শিউলিদের নিয়ে মেতে ওঠা

                                তাও সহ্য করেছিলে ।

কিন্তু বাগানে যেদিন একটা গোলাপ একা

ফুটে উঠল, তুমি ছুটে এলে –

জানালে কঠোর স্বরে : ও’গোলাপ

                                কখনও ছোঁবে না ।



কবিতা - সুধীর দত্ত


 ভিক্ষু

 

অগ্নিকে মুহুর্তগুলো দেওয়া হয়নি, শুধু

বেঁচেছি যান্ত্রিক, দিনগত

ক্ষয় হয় না সব পাপ, খিন্ন শরীরে

শুকিয়ে গিয়েছে নদী

বন উপবনময় শুধু জলরেখা ।

 

প্রাচীন গুঁড়ির মতো শষ্পহীন এই ওষ্ঠ ।

যেন বনদেবতার ভ্রমে

বাড়িয়ে ধরেছে শ্বেত পাথরের বাটি, অনায়াসে

পদ্মের করোটি খুলে ভিক্ষুকে করেছ তথাগত ।

তাই অনাহত

জাগে সর্পচূড়া ; কামখচিত আকাশে

করাঙ্গুলি ছুঁয়ে থাকে ভুমিস্পর্শমুদ্রায় তোমাকে  



কবিতা - মিলনকান্তি বিশ্বাস

 

নির্বাচন একুশ অথবা কোভিড উনিশ


গ্রীষ্মের রাতের অন্ধকারে –

বড়ো কচুপাতাটি ঘোমটা টেনে বসে আছে

অন্য চারাপাতাগুলি ঘিরে আছে তার ।

শীর্ণ শরীরে ক্লান্তির ছাপ

দুচোখে ঘুম নেই –

ঘনঘন হাই তুলছে –

আর মাঝে মাঝে মাথা নাড়াচ্ছে

স্বজনের প্রতীক্ষায় !

হয়তো কোনো বিপদের আশঙ্কায় –

প্রহর ঘুনছে সবাই !

তবুও বড়ো কচুপাতাটি ঘমটা টেনে বসে আছে –

রাতের অন্ধকারে । 


কবিতা - সিদ্ধার্থ সিংহ

 

 

জানালা

 

ঘর বানাচ্ছ, বানাও

মনে করে দুটো জানালা বানাতে ভুলো না।


একটা জানালা দিয়ে ছেলে যাতে উড়ে যেতে পারে

রামধনুর রং মাখতে পারে সারা গায়ে

মেঘের ভেলায় চেপে ভেসে যেতে পারে যেখানে খুশি,

আর অন্য জানালা দিয়ে পা টিপে টিপে এসে

যাতে শুয়ে পড়তে পারে বিছানায়।


ঘর বানাচ্ছ, বানাও

মনে করে দুটো জানালা বানিও।


একটা জানালা দিয়ে এসে

ছেলেকে যাতে বকাঝকা করতে পারো

কষাতে পারো দু'-একটা চড়চাপড়,

আর অন্য জানালা দিয়ে এসে

ঘুমন্ত ছেলের কপালে যাতে চুমু খেতে পারো।


ঘর বানাচ্ছ, বানাও

মনে করে দুটো জানালা বানাতে ভুলো না

আর হ্যাঁ, সেই জানালায় যেন গরাদের কোনও

                                                ছায়া না থাকে...


কবিতা - অনীশ ঘোষ

 

সম্পর্ক


সম্পর্কেরা ছিঁড়ে গেছে দীর্ণ কাগজের মতো

পড়ে আছে কিছু তার তেজস্ক্রিয় উদ্গার

রাত্রি গভীর হলে বিছানায় নেমে আসে তারা

গ্রাস করে একটি কবিতার যত জন্মভার ।

এ ছবি রচিত হলে বিভ্রান্ত নাবিক নতজানু

স্মৃতির ক্ষতের হাতে সঁপে দেয় বিষাদের তীর

ধূলিমলিন সম্পর্কেরা তীক্ষ্ণ হাসাহাসি করে

ভিতরে ও বাহিরে জমে কিছু নাবালক ভিড় !



কবিতা - চৈতন্য দাশ

 

স্থিতিশীল

  

তুমি আসলেই বসন্তগানে গজাবে নতুন পাতা,

বৈশাখী ফুলেরা ফুটেই বলবে খোলরে খেরোর খাতা 

খালি ডাল জুড়ে সবুজ পোশাকে দাঁড়াবে নতুন সেনা,

তুমি মুখ তুলে তাকাবেই জানি, সে মুখ কতই চেনা 


তুমি তাকালেই উপচে পড়বে ডায়েরির সাদা পাতা,

সবই তখন কাব্য-কবিতা লিখি না যতই যা তা 

যমজ তারার প্রকট আলোয় ভরবে অন্ধকূপ,

আসবে সান্ধ্য শঙ্খধ্বনি উড়িয়ে গন্ধধূপ


তোমার চোখের ওঠানামাতেই বিশ্ব-সৃষ্টি-লয়,

বন্ধ করলে ঘটে যায় যেন ঢাউশ বিপর্যয়

তাকিয়ে থাকবে যেমন তাকায় পাহাড়ি শিকারি চিল,

তোমার সঙ্গে তামাম বিশ্ব থাকবেই স্থিতিশীল 



কবিতা - বিজনকান্তি বণিক

 

আমার গাঁয়ে


একটি চড়াই ধান কুটে খায়

বাড়ির উঠোন কোণে

একটি দোয়েল গাছের শাখে

নিজের বাসা বোনে ।


একটি শালিক নাচের তালে

তাধিনাধিন চলে

আরেক শালিক গাছের ডালে

কিচিরমিচির বলে ।


একটি বকে ঝিলের পাশে

দাঁড়িয়ে আহার গিলে

হাঁড়িচেচা চেঁচায় যখন

চমকে ওঠে পিলে ।


একটি ঘুঘু ঘুতঘুতিয়ে

ডাকছে গাছের প'রে

একটি হলুদ মিষ্টি পাখি

কুটুম কুটুম স্বরে ।


আরেক পাখি ডালিম গাছে

ডাকছে কুটুম আয়

গাছ-গাছালির ছায়ায় ঘেরা

আমার সোনার গাঁয় ।



কবিতা - বিজয়া দেব

 

নববর্ষ

 

অস্তে গিয়েছে সূর্য,

তীক্ষ্ণ লালিমায় ভরে গেছে দিগন্তের ঈপ্সিত আয়োজন ।

 ফুল পাখি আকাশের নম্রপ্রকাশে শুনি নবীনের আবাহনী, শুভ্রতার গান ।

 

যদিও জীবন আজ গোধূলিবেলার ছবি এঁকেছিল ভালোবেসে,

গুপ্তকীট ছিন্ন করেছে তা সূক্ষ্ম নখরে ।

দেখেছ কি মিছিলে, জনসমাগমে বক্রদৃষ্টি কীটের কৌশলী খেলা ?

 দেখতে পেয়েছ তাকে ? দেখোনি ?

 এতগুলো কুশলী চোখ ধোঁয়াশার মগ্ন গানে রক্তলাল

হোলি খেলেছে বিপুল ।

 

তবু তো প্রকৃতি সেজে ওঠে, আনন্দ আপন তার,

তবু আবাহনে সাজে গৃহকোণ,

মঞ্চের পেছনের অন্ধকারে বসে থাকে সূত্রধার,

পুরনো ভরসার স্থল বটবৃক্ষের মতো ।



কবিতা - পার্থপ্রতিম বিশ্বাস

 

বৃষ্টিমেয়ে


মাঝে মধ্যে বুকের ভেতর কেমন যেন নীল হয়ে আসে

এলোমেলো হয়ে যায় নদীজল, মগ্ন আলপথ ।

চৈত্রবাতাস বলেছিল, দ্বার ভেঙে দেবে

রোদবারান্দায় এনে দেবে সমস্ত আকাশ ।

হাঁটতে হাঁটতে তলিয়ে যাই বালুময় নিশির

চিত্রিত চরাচরে ।

তবুও কে যেন ডুব দেয় মেঘকুয়াশায়

বৃষ্টিমেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সামনে কোথাও, বলল

ফুল তুলেছো কোনওদিন কিম্বা হলুদ ।

আমার মনে পড়ে যায় ভাঙা ইস্কুল বাড়ির কথা

বাদাম গাছের পাশে লণ্ঠন বারান্দায়

নীল লাল বহুরুপী, বাইশে শ্রাবণ ।

তারপর বৃষ্টি নামে এক বৃত্ত থেকে আরেক বৃত্ত জুড়ে

বৃষ্টিমেয়ের লালটিপ ধুয়ে যায়

ধুয়ে যায় এলোমেলো চুল, চিত্রিত হলুদ ।

 

বনের সমস্ত ছায়া মেঘে রোদবারান্দায় হাত রাখি, ফুল ছুঁই

বালুময় চরাচরে একটু একটু করে জেগে ওঠে

এক ভোর ভোরের হলুদ ।



কবিতা - স্মরজিত বিশ্বাস

 

নববর্ষ

 

আমাদের ওই লড়াইটা থাক ওদের জন্য তোলা

আমাদের সেই বড়াইটা আজ বিশ্রী রকম ঘোলা

পাকের মাঝে বিপন্ন প্রায়, চারদিকে খুন জখম

আমরা এখন শ্রেণীহারা পথ গিয়েছি ভুলে

ডাইনে বামে সামনে পিছে বিষের ফণা তুলে

এগিয়ে আসে মানব-বিনাশ বিপদ হাজার রকম।


আমাদের কেউ কোথাও নেই অন্যরকম ভালো

জীবন থেকে উধাও এখন ছন্দ গীতি তালও ।

মিথ্যে কেবল সময় খরচ আবোল তাবোল হাঁটা

আমাদের সেই খুব সাধারণ জীবন গেছে মুছে

পরের ব্যথায় হৃদয় উজাড় কান্না গেছে ঘুচে

যে যার মতো সাজাই বাসর নেহাত সাদামাঠা ।


আমরা পারি ফুল ফোটাতে রঙিন ফাগুন ছাড়া

আমরা পারি উষর মাঠে গড়তে সবুজ পাড়া

মেঘের থেকে বাদল এনে ভয়াল সাগর দিতে

দূষণ দানব বিনাশ করে আকাশ দেবো নীল

পরস্পরের পরান জুড়ে গান গাবে কোকিল

দেব শিশুরা আসবে নেমে বিমল পৃথিবীতে ।


হাতটা ধরো তন্দ্রা তাড়াও চোখের আরাম থেকে

কালিমা সব বিদায় করো হৃদয় জাহাজ ছেকে

ভালো থাকার ফসল ফলাও ফেরাও সরল হর্ষ

লড়াইটা হোক অশুভ সব বিনাশকারীর সাথে

সুসভ্যতার পরম নিবাস বানাও শ্রমের হাতে।

সফল ধারার মিহিন আলোয় ভাসবে নববর্ষ ।



কবিতা - হাননান আহসান

 

আলোকমালা

 

মা যে আমার চিনের প্রাচীর

বিঘ্নবিহীন জীবনতারা

আমাজনের ইচ্ছেখুশি

নির্মীয়মাণ স্রোতের ধারা।

 

মা যে আমার দূর গগনে

ভাস-মালিকা মেঘের কুচি

দিনদুপুরে নিদাঘ রাতে

হিমালয়ের শুভ্র শুচি।

 

মা যে আমার কাঠপুতুলি

ছেলেবেলার খেলনাবাটি

আগলে রাখা স্বপ্নময়ী

নিঙড়ানো রং সোঁদামাটি।

 

মা যে আমার স্মৃতির পাতা

মন্দ-ভালো আদরমাখা

গাছ-শিকড়ে সঞ্জীবনী

শরীর জুড়ে সবুজ আঁকা।

 

মা যে আমার ইষ্টসাধন

দূর অদূরে আলোকমালা

রূপকথাপুর যাদুর ছোঁয়া

একফালি চাঁদ সোনার থালা।



অণুগল্প - কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়


 

সাপ


    রান্নাঘরে রুটি করছিল মঞ্জুলা । আজকাল বিকেল বিকেলই রাত্রের রুটি তরকারিটা করে রাখে সে । ফলে আয়েস করে টিভির সিরিয়ালগুলো দেখা যায় ।

    যদিও ঠান্ডা খাবার নিয়ে মাঝেমধ্যেই অনুযোগ করে তপন, তবে মঞ্জুলা তাতে খুব একটা কান দেয় না ।

    বাড়িতে বাজার খুব একটা নেই আর । বড়োজোর কাল সকাল পর্যন্ত চলবে । গতবছর লকডাউন থেকেই এটা নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে তপনের, সপ্তাহে একদিন বাজার । কালই তপনকে বাজারে পাঠাতে হবে । আপাতত আজ রাতটা কুমড়োর তরকারি দিয়েই চালিয়ে নিতে হবে, মঞ্জুলা ভাবছিল ।

    ঠিক সেই সময় চিৎকারটা শুনতে পেল সে । “সাপ, সাপ” বলে বাইরে চেঁচিয়ে উঠেছে কেউ । কোনরকমে গ্যাসটা নিভিয়ে দিয়ে একদৌড়ে উঠোনে বেরিয়ে এসে মঞ্জুলা দেখল, বাইরে বেশ লোক জড়ো হয়ে গেছে । পাশের বাড়িটাই পালেদের । ভিড়টা ওদের বারান্দার সামনে । তার মানে ওখানেই কিছু ঘটেছে । ভিড়ের মধ্যে দু-একজনের হাতে লাঠিও আছে । সবাই মিলে কৌতূহলী চোখে পালেদের বারান্দায় উঁকিঝুঁকি মারছে । তাহলে কি বারান্দায় সাপ ঢুকেছে নাকি ? সেটা অসম্ভব কিছু নয় । সামনের চলনরাস্তার উল্টোদিকেই একটা পাঁচিলঘেরা বাগান আছে সামন্তদের । যত রাজ্যের আগাছায় ভরা । সেখান থেকে আসতেই পারে । কিন্তু এই ভরা বিকেলে ? কে জানে ! তবে এটাও ঠিক, ওরা তো আর মানুষের মতো সকাল বিকেল বোঝে না!

    কিছুক্ষণের মধ্যেই সাপটাকে আবিষ্কার করে ফেলল ওরা । এমন কিছু বিষধর সাপ নয় । এত মানুষের সাড়া পেয়ে ভয়েই আধমরা হয়ে গিয়েছিল । তবু নির্দয়ের মতো তাকে লাঠিপেটা করে মেরে ফেলা হল । সবাই বলাবলি করল, পোড়াতে হবে । নাহলে আবার বেঁচে যাবে ওটা । তাই কাগজ জ্বেলে রাস্তার ওপরেই সাপটাকে পুড়িয়ে ফেলা হল ।

    মঞ্জুলা এই পোড়ানোটা দেখতে পারেনি । তার আগেই ঘরে চলে এসেছিল । এসব ও দেখতে পারে না । সন্ধেবেলা টিভি দেখতে দেখতে ভাবছিল, কখন তপন অফিস থেকে ফিরবে, আর ও তাকে কান্ডটা শোনাবে ।

    রাত ন’টা নাগাদ তপন ফিরল । বলল, পেটটা ভার আছে, আজ আর খাবে না । একটু অবাকই হল মঞ্জুলা । এরকম তো খুব একটা করে না তপন ! যদিও গত মাসখানেক যাবৎ তপনের কিছু কিছু আচরণে মঞ্জুলা অবাক হচ্ছে । একটু যেন অন্যরকম, একটু যেন অস্বাভাবিক । কিন্তু রাত্রে খায়নি, এমন তো কখনও হয়নি !

    তপন বাথরুমে ঢুকতেই মঞ্জুলা তপনের ফোনটা হাতে তুলে নিল । পাসওয়ার্ড জানাই ছিল । খুলে এদিক ওদিক দেখতে দেখতেই একটা ঝাঁকি । হোয়াটস্‌অ্যাপে একটা মেসেজ । তপন বোধহয় উত্তেজনার মাথায় ডিলিট করতে ভুলে গেছে । মানসীর মেসেজ । তপনের অফিস কলিগ । আজ সন্ধের পর সাউথ সিটি মলে দেখা করার আমন্ত্রণ ।

    মঞ্জুলা ফোনটা হাতে নিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল । ওর মনে হচ্ছিল, পালেদের বাড়িতে নয়, একটা বিষধর সাপ ওর ঘরেই এসে ঢুকে পড়েছে ওর অলক্ষ্যে ।



অণুগল্প - অনন্যা দাশ



বন্ধন

 

    নিচের বেসমেন্টের ঘর থেকে শব্দ ভেসে আসছে খট, খট, খটাং ওনার মেয়ে লিপির ফিজিকাল থেরাপি চলছে অনিমেষ চোখ বুজে সোফায় বসে ছিলেন তিন মাস হল বিয়ের ঠিক এক সপ্তাহ আগের গাড়ির দুর্ঘটনাটা লিপিকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছে সারাজীবন ওই ভাবেই থাকতে হবে ওকে ওর বিয়েটা ভেঙ্গে গেছে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার পাত্র আনন্দ রাজি হয়নি বিকলাঙ্গ একজনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে অথচ আনন্দই নিউ ইয়র্কে লিপির সাথে এনগেজমেন্টের পার্টিতে আজীবন ভালবেসে যাওয়ার বড়বড় বুলি আওড়েছিল বলেছিলউই উইল বি টুগেদার ইন সিকনেস অ্যান্ড ইন হেলথ গতকাল খবর পেয়েছেন যে সে রমানাথ ব্যানার্জীর মেয়ে রুনাকে বিয়ে করছে লিপির তো আর কোনদিন বিয়ে হবে না, পঙ্গু মেয়েকে আর কে বিয়ে করবে?

    দরজায় বেল পড়তে অনিমেষ উঠে দরজা খুলতে গেলেন ওনার স্ত্রী রেখা লিপির সঙ্গে বেসমেন্টে আছে, বেলের শব্দ শুনতে পাবে না

    দরজা খুলে চমকে উঠলেন অনিমেষ সেই ছেলেটা দাঁড়িয়ে রয়েছে! এই ছেলেটাকে লিপি যখন প্রথম বাড়িতে এনে নিজের বয়ফ্রেন্ড হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল তখন সাঙ্ঘাতিক খেপে গিয়েছিলেন তিনি 

    ছেলেটা চলে যেতেই তুলকালাম করেছিলেন লিপিকে বলেছিলেন, “একে অ্যাফ্রো তার ওপর ক্রিসচান! ওই ছেলে কিনা আমার, মানে অনিমেষ ভট্টাচার্যর জামাই হবে! কখনো না!” 

লিপি শুধু বলেছিল, “বাবা, নিক আমাকে সত্যি ভালবাসে, সেটাই যথেষ্ট নয় কী? ওর গায়ের রঙ বা ধর্ম কী তাতে কী যায় আসে? তাছাড়া একটা ভাল চাকরিও করে!”

    অনিমেষ ওর কোন কথা শোনেননি, চিৎকার করে বলেছিলেন, “সত্যভূষণ চ্যাটার্জীর ছেলে আনন্দর সঙ্গে তোমার বিয়ে পাকা করে ফেলেছি আমি অন্য কাউকে বিয়ে করতে চাইলে বাড়িতে থাকতে পারবে না তুমি আর তোমার কলেজের মাইনে দেওয়াও বন্ধ করে দেবো আমি!”

    প্রচন্ড প্রতিবাদ করেছিল লিপি কিন্তু শেষমেশ অনিমেষের জেদের সামনে হার মেনে নিয়ে নিক নামের অ্যাফ্রো মার্কিনি ছেলেটার সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য হয়েছিল

    আমি ভিতরে আসতে পারি?” নিক জিজ্ঞেস করল

    এসো, লিপি তো...”

    আমি জানি ওর এখন থেরাপি চলছে আমি আসলে আপনার সাথেই কথা বলতে এসেছি আজ,” মুক্তোর মতন ধবধবে সাদা দাঁতগুলো বার করে অমায়িক একটা হাসি হাসল নিক

    কী বলবে তাড়াতাড়ি বলো,” লোকের সহানুভূতি আজকাল অনিমেষকে বেশ বিরক্ত করে 

     আমি লিপিকে বিয়ে করতে চাই মিস্টার ভট্টাচারিয়া যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওর সব দায়িত্ব নিতে চাই আশাকরি আপনি আর আপনার স্ত্রী মত দেবেন

    লিপিকে বিয়ে?” অনিমেষ যেন আকাশ থেকে পড়লেন, “তুমি জানো ওর...”   

    ওনার মুখ থেকে কথাটা ছিনিয়ে নিয়ে ছেলেটা বলল, “আমি সব জানি লিপি আর ওর ডাক্তারের সঙ্গে কথা হয়েছে আমার আমি লিপিকে ভালবেসেছি মিস্টার ভট্টাচারিয়া ইন সিকনেস অ্যান্ড ইন হেল্! যখন সুস্থ ছিল তখন তো আপনারা আমাকে সুযোগ দিলেন না তাই যখন অসুস্থ তখনই সই !” 



অণুগল্প - মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়

 


অভিনয়

 

                                    (১)

    ‘একটা কথা বলার ছিল তোমায় ।’  

    টোস্টে কামড় দিয়ে খবর কাগজের পাতায় চোখ রেখে বলে শান্তনু, ‘যা বলার তাড়াতাড়ি বলো লিসা । একটু তাড়া আছে ।’

    ‘আজকাল সবসময় তাড়া । আগে এমন ছিল না । আরে মশাই, বউয়ের দিকেও একটু নজর দাও ।’

    ‘প্লিজ লিসা । তোমার ন্যাকা-ন্যাকা প্রেমের চক্করে আমি নেই । তাছাড়া আজকে হাসি-মজার মুডেও নেই । অফিসে টেনশন চলছে । কার বরাতে প্রোমোশন জুটবে বোঝা যাচ্ছে না । শুনছি ঋত্বিক ভিতর-ভিতর বসেদের হাত করার চেষ্টা করছে ।’

    ‘তোমার বদলে ঋত্বিক যদি প্রমোশন পায়, তোমার খুব ক্ষতি হয়ে যাবে ?’

    লিসার কথায় শান্তনু হতবাক হয়ে যায় । 

    ‘তোমার মাথা ঠিক আছে তো লিসা ?’

    ‘স্যরি বাবা । তোমার টেনশন কমানোর জন্য মজা করছিলাম ।’

    ‘সিরিয়াস বিষয়ে এমন সিলি মজা ! প্লিজ, বি প্র্যাকটিক্যাল ।’

    ‘বলছি তো স্যরি । এই, আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরবে ? শপিং-এ যেতাম ।’

    ‘শুধুমাত্র আমার পজিশনের জন্য নয়, তোমার এইসব বিলাসিতার জন্যও চাকরিতে প্রমোশনটা দরকার। এইসময় অন্য বউয়েরা তাদের বরের জন্য যা করে তুমিও বরং সেটাই করো ।’

    লিসা কথাটা বুঝতে না পেরে শান্তনুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ।

    রাগে ঝাঁঝিয়ে ওঠে শান্তনু, ‘মাঝেমাঝে এমন ব্ল্যাঙ্ক আইজে দেখো মাথা গরম হয়ে যায় । শপিং-এ না গিয়ে মন্দিরে গিয়ে পুজো দাও ।’

    দরজাটা দুম করে বন্ধ হবার শব্দে তাকিয়ে দেখে লিসা । শান্তনু দরজা টেনে দিয়ে বেরিয়ে গেছে । চোখের জলটা মুছে নেয় লিসা ।

 

                                                                                (২)

 

    শান্তনুর প্রমোশন হয়েছে । লিসা উপহারস্বরূপ সোনার বালা পেয়েছে । সে আদৌ কি এইসব চায় ?

     প্রমোশনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যস্ততা আরও বেড়েছে । ভাল করে খাওয়াদাওয়ারও সময় নেই । তুমুল ব্যস্ততার মধ্যেও শান্তনু একদিন খেয়াল করল, লিসা বেশ পাল্টে গেছে । আগের মতো তার কাছে সময় চায় না । শপিং করা, মুভি দেখতে যাওয়ার কথা বলে না । টেবিলে তার সঙ্গে খায় না ।

    আরও লক্ষ্য করেছে, লিসা আজকাল ফোন নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকে । ফোনে কথা বলে চাপা গলায় । শান্তনু আচমকা সামনে এসে গেলে ফোন কেটে দেয় ।

    দু'বছরের বিবাহিত জীবনে এই লিসাকে দেখেনি । তার লিসা আদুরে, গা ঘেঁষা । কী করে লিসা ফোন নিয়ে ?

    লিসার অনুপস্থিতিতে ফোন চেক করে । কিছু পায় না । মাথাটা আরও গরম হয়ে যায় শান্তনুর । তার মানে লিসা আটঘাট বেঁধে পরকীয়া চালাচ্ছে । সজাগ কিন্তু সাবধানী দৃষ্টি রাখে শান্তনু ।

     সেদিন, রাত প্রায় বারোটা । না ঘুমিয়ে জেগে ছিল শান্তনু । ব্যালকনিতে চাপা স্বরে লিসাকে ফোনে কথা বলতে শোনে । পায়ে-পায়ে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় ।

     লিসা বলছে, ‘ও কাল অফিস বেরিয়ে গেলেই আসছি । কলেজ স্কোয়্যারের শরবতের দোকানে এসো । বাই ।’

 

                                                                                (৩)

 

    প্রতিদিনের মতো নির্দিষ্ট সময়ে বেরিয়ে যায় শান্তনু । অফিসের পরিবর্তে সোজা শরবতের দোকানটার কাছে নিজেকে আড়ালে রেখে অপেক্ষা করে । ঘন্টাখানেক বাদে লিসা আসে । চারপাশে সন্ধানী দৃষ্টি বুলিয়ে দোকানে ঢুকে যায় ।

    আধঘন্টা কেটে যায় । কেউ আসে না । লিসা রাস্তার দিকে পিছন করে বসেছে । আরও আধঘন্টা কেটে যাবার পর লিসা ফোন হাতে নিয়ে কথা বলতে শুরু করে । শান্তনু ধৈর্য হারায় । লিসার টেবিলের পিছনে দাঁড়ায় ।

    লিসা বলছে, ‘তাহলে শেষ পর্যন্ত আসতেই হলো তোমাকে । ন্যাকা প্রেমের চক্করে ফাঁসলে তো ?’ কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গেই নিজের হাতে হালকা টান অনুভব করে শান্তনু । দেখে লিসার মুখে দুষ্টুমির হাসি ।

    ‘কী মশাই, খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলে তো ? ফোন চেক করেও তো কিছু পাওনি । বউয়ের উপর গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে নিজের কাজকর্ম শিকেয় তুলেছ । অথচ এর ওয়ান থার্ড সময় আমাকে দিলে গত দুমাস ধরে এই ড্রামা করতে হতো না ।’

    ‘উফ্‌, পারো তুমি !’

    শান্তনু অনুভব করে চাপা কষ্টটা গলে গিয়ে খুশিতে বদলে যাচ্ছে ।