বন্ধন
নিচের বেসমেন্টের ঘর থেকে শব্দ ভেসে আসছে খট, খট, খটাং। ওনার মেয়ে লিপির ফিজিকাল থেরাপি চলছে। অনিমেষ চোখ বুজে সোফায় বসে ছিলেন। তিন মাস হল বিয়ের ঠিক এক সপ্তাহ আগের গাড়ির দুর্ঘটনাটা লিপিকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছে। সারাজীবন ওই ভাবেই থাকতে হবে ওকে। ওর বিয়েটা ভেঙ্গে গেছে। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার পাত্র আনন্দ রাজি হয়নি বিকলাঙ্গ একজনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে। অথচ আনন্দই নিউ ইয়র্কে লিপির সাথে এনগেজমেন্টের পার্টিতে আজীবন ভালবেসে যাওয়ার বড়বড় বুলি আওড়েছিল। বলেছিল ‘উই উইল বি টুগেদার ইন সিকনেস অ্যান্ড ইন হেলথ’। গতকাল খবর পেয়েছেন যে সে রমানাথ ব্যানার্জীর মেয়ে রুনাকে বিয়ে করছে। লিপির তো আর কোনদিন বিয়ে হবে না, পঙ্গু মেয়েকে আর কে বিয়ে করবে?
দরজায় বেল পড়তে অনিমেষ উঠে দরজা খুলতে গেলেন। ওনার স্ত্রী রেখা লিপির সঙ্গে বেসমেন্টে আছে, বেলের শব্দ শুনতে পাবে না।
দরজা খুলে চমকে উঠলেন অনিমেষ। সেই ছেলেটা দাঁড়িয়ে রয়েছে! এই ছেলেটাকে লিপি যখন প্রথম বাড়িতে এনে নিজের বয়ফ্রেন্ড হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল তখন সাঙ্ঘাতিক খেপে গিয়েছিলেন তিনি।
ছেলেটা চলে যেতেই তুলকালাম করেছিলেন। লিপিকে বলেছিলেন, “একে অ্যাফ্রো তার ওপর ক্রিসচান! ওই ছেলে কিনা আমার, মানে অনিমেষ ভট্টাচার্যর জামাই হবে! কখনো না!”
লিপি শুধু বলেছিল, “বাবা, নিক আমাকে সত্যি ভালবাসে, সেটাই যথেষ্ট নয় কী? ওর গায়ের রঙ বা ধর্ম কী তাতে কী যায় আসে? তাছাড়া ও একটা ভাল চাকরিও করে!”
অনিমেষ ওর কোন কথা শোনেননি, চিৎকার করে বলেছিলেন, “সত্যভূষণ চ্যাটার্জীর ছেলে আনন্দর সঙ্গে তোমার বিয়ে পাকা করে ফেলেছি আমি। অন্য কাউকে বিয়ে করতে চাইলে এ বাড়িতে থাকতে পারবে না তুমি আর তোমার কলেজের মাইনে দেওয়াও বন্ধ করে দেবো আমি!”
প্রচন্ড প্রতিবাদ করেছিল লিপি কিন্তু শেষমেশ অনিমেষের জেদের সামনে হার মেনে নিয়ে নিক নামের অ্যাফ্রো মার্কিনি ছেলেটার সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য হয়েছিল।
“আমি ভিতরে আসতে পারি?” নিক জিজ্ঞেস করল।
“এসো, লিপি তো...”
“আমি জানি ওর এখন থেরাপি চলছে। আমি আসলে আপনার সাথেই কথা বলতে এসেছি আজ,” মুক্তোর মতন ধবধবে সাদা দাঁতগুলো বার করে অমায়িক একটা হাসি হাসল নিক।
“কী বলবে তাড়াতাড়ি বলো,” লোকের সহানুভূতি আজকাল অনিমেষকে বেশ বিরক্ত করে।
“আমি লিপিকে বিয়ে করতে চাই মিস্টার ভট্টাচারিয়া। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওর সব দায়িত্ব নিতে চাই। আশাকরি আপনি আর আপনার স্ত্রী মত দেবেন।”
“লিপিকে বিয়ে?” অনিমেষ যেন আকাশ থেকে পড়লেন, “তুমি জানো ওর...”
ওনার মুখ থেকে কথাটা ছিনিয়ে নিয়ে ছেলেটা বলল, “আমি সব জানি। লিপি আর ওর ডাক্তারের সঙ্গে কথা হয়েছে আমার। আমি লিপিকে ভালবেসেছি মিস্টার ভট্টাচারিয়া। ইন সিকনেস অ্যান্ড ইন হেল্থ! ও যখন সুস্থ ছিল তখন তো আপনারা আমাকে সুযোগ দিলেন না তাই ও যখন অসুস্থ তখনই সই !”
No comments:
Post a Comment