Monday, April 19, 2021

অণুগল্প - মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়

 


অভিনয়

 

                                    (১)

    ‘একটা কথা বলার ছিল তোমায় ।’  

    টোস্টে কামড় দিয়ে খবর কাগজের পাতায় চোখ রেখে বলে শান্তনু, ‘যা বলার তাড়াতাড়ি বলো লিসা । একটু তাড়া আছে ।’

    ‘আজকাল সবসময় তাড়া । আগে এমন ছিল না । আরে মশাই, বউয়ের দিকেও একটু নজর দাও ।’

    ‘প্লিজ লিসা । তোমার ন্যাকা-ন্যাকা প্রেমের চক্করে আমি নেই । তাছাড়া আজকে হাসি-মজার মুডেও নেই । অফিসে টেনশন চলছে । কার বরাতে প্রোমোশন জুটবে বোঝা যাচ্ছে না । শুনছি ঋত্বিক ভিতর-ভিতর বসেদের হাত করার চেষ্টা করছে ।’

    ‘তোমার বদলে ঋত্বিক যদি প্রমোশন পায়, তোমার খুব ক্ষতি হয়ে যাবে ?’

    লিসার কথায় শান্তনু হতবাক হয়ে যায় । 

    ‘তোমার মাথা ঠিক আছে তো লিসা ?’

    ‘স্যরি বাবা । তোমার টেনশন কমানোর জন্য মজা করছিলাম ।’

    ‘সিরিয়াস বিষয়ে এমন সিলি মজা ! প্লিজ, বি প্র্যাকটিক্যাল ।’

    ‘বলছি তো স্যরি । এই, আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরবে ? শপিং-এ যেতাম ।’

    ‘শুধুমাত্র আমার পজিশনের জন্য নয়, তোমার এইসব বিলাসিতার জন্যও চাকরিতে প্রমোশনটা দরকার। এইসময় অন্য বউয়েরা তাদের বরের জন্য যা করে তুমিও বরং সেটাই করো ।’

    লিসা কথাটা বুঝতে না পেরে শান্তনুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ।

    রাগে ঝাঁঝিয়ে ওঠে শান্তনু, ‘মাঝেমাঝে এমন ব্ল্যাঙ্ক আইজে দেখো মাথা গরম হয়ে যায় । শপিং-এ না গিয়ে মন্দিরে গিয়ে পুজো দাও ।’

    দরজাটা দুম করে বন্ধ হবার শব্দে তাকিয়ে দেখে লিসা । শান্তনু দরজা টেনে দিয়ে বেরিয়ে গেছে । চোখের জলটা মুছে নেয় লিসা ।

 

                                                                                (২)

 

    শান্তনুর প্রমোশন হয়েছে । লিসা উপহারস্বরূপ সোনার বালা পেয়েছে । সে আদৌ কি এইসব চায় ?

     প্রমোশনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যস্ততা আরও বেড়েছে । ভাল করে খাওয়াদাওয়ারও সময় নেই । তুমুল ব্যস্ততার মধ্যেও শান্তনু একদিন খেয়াল করল, লিসা বেশ পাল্টে গেছে । আগের মতো তার কাছে সময় চায় না । শপিং করা, মুভি দেখতে যাওয়ার কথা বলে না । টেবিলে তার সঙ্গে খায় না ।

    আরও লক্ষ্য করেছে, লিসা আজকাল ফোন নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকে । ফোনে কথা বলে চাপা গলায় । শান্তনু আচমকা সামনে এসে গেলে ফোন কেটে দেয় ।

    দু'বছরের বিবাহিত জীবনে এই লিসাকে দেখেনি । তার লিসা আদুরে, গা ঘেঁষা । কী করে লিসা ফোন নিয়ে ?

    লিসার অনুপস্থিতিতে ফোন চেক করে । কিছু পায় না । মাথাটা আরও গরম হয়ে যায় শান্তনুর । তার মানে লিসা আটঘাট বেঁধে পরকীয়া চালাচ্ছে । সজাগ কিন্তু সাবধানী দৃষ্টি রাখে শান্তনু ।

     সেদিন, রাত প্রায় বারোটা । না ঘুমিয়ে জেগে ছিল শান্তনু । ব্যালকনিতে চাপা স্বরে লিসাকে ফোনে কথা বলতে শোনে । পায়ে-পায়ে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় ।

     লিসা বলছে, ‘ও কাল অফিস বেরিয়ে গেলেই আসছি । কলেজ স্কোয়্যারের শরবতের দোকানে এসো । বাই ।’

 

                                                                                (৩)

 

    প্রতিদিনের মতো নির্দিষ্ট সময়ে বেরিয়ে যায় শান্তনু । অফিসের পরিবর্তে সোজা শরবতের দোকানটার কাছে নিজেকে আড়ালে রেখে অপেক্ষা করে । ঘন্টাখানেক বাদে লিসা আসে । চারপাশে সন্ধানী দৃষ্টি বুলিয়ে দোকানে ঢুকে যায় ।

    আধঘন্টা কেটে যায় । কেউ আসে না । লিসা রাস্তার দিকে পিছন করে বসেছে । আরও আধঘন্টা কেটে যাবার পর লিসা ফোন হাতে নিয়ে কথা বলতে শুরু করে । শান্তনু ধৈর্য হারায় । লিসার টেবিলের পিছনে দাঁড়ায় ।

    লিসা বলছে, ‘তাহলে শেষ পর্যন্ত আসতেই হলো তোমাকে । ন্যাকা প্রেমের চক্করে ফাঁসলে তো ?’ কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গেই নিজের হাতে হালকা টান অনুভব করে শান্তনু । দেখে লিসার মুখে দুষ্টুমির হাসি ।

    ‘কী মশাই, খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলে তো ? ফোন চেক করেও তো কিছু পাওনি । বউয়ের উপর গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে নিজের কাজকর্ম শিকেয় তুলেছ । অথচ এর ওয়ান থার্ড সময় আমাকে দিলে গত দুমাস ধরে এই ড্রামা করতে হতো না ।’

    ‘উফ্‌, পারো তুমি !’

    শান্তনু অনুভব করে চাপা কষ্টটা গলে গিয়ে খুশিতে বদলে যাচ্ছে । 



2 comments:

  1. শেষ দিকে মোচড় টা দারুণ। তবে অণুগল্পের বিষয় একটু জটিল স্তরের হলে ভাল লাগে ।

    ReplyDelete
  2. বাহ্ খুব ভালো লাগলো দিদি।

    ReplyDelete