Monday, April 19, 2021

অণুগল্প - কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়


 

সাপ


    রান্নাঘরে রুটি করছিল মঞ্জুলা । আজকাল বিকেল বিকেলই রাত্রের রুটি তরকারিটা করে রাখে সে । ফলে আয়েস করে টিভির সিরিয়ালগুলো দেখা যায় ।

    যদিও ঠান্ডা খাবার নিয়ে মাঝেমধ্যেই অনুযোগ করে তপন, তবে মঞ্জুলা তাতে খুব একটা কান দেয় না ।

    বাড়িতে বাজার খুব একটা নেই আর । বড়োজোর কাল সকাল পর্যন্ত চলবে । গতবছর লকডাউন থেকেই এটা নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে তপনের, সপ্তাহে একদিন বাজার । কালই তপনকে বাজারে পাঠাতে হবে । আপাতত আজ রাতটা কুমড়োর তরকারি দিয়েই চালিয়ে নিতে হবে, মঞ্জুলা ভাবছিল ।

    ঠিক সেই সময় চিৎকারটা শুনতে পেল সে । “সাপ, সাপ” বলে বাইরে চেঁচিয়ে উঠেছে কেউ । কোনরকমে গ্যাসটা নিভিয়ে দিয়ে একদৌড়ে উঠোনে বেরিয়ে এসে মঞ্জুলা দেখল, বাইরে বেশ লোক জড়ো হয়ে গেছে । পাশের বাড়িটাই পালেদের । ভিড়টা ওদের বারান্দার সামনে । তার মানে ওখানেই কিছু ঘটেছে । ভিড়ের মধ্যে দু-একজনের হাতে লাঠিও আছে । সবাই মিলে কৌতূহলী চোখে পালেদের বারান্দায় উঁকিঝুঁকি মারছে । তাহলে কি বারান্দায় সাপ ঢুকেছে নাকি ? সেটা অসম্ভব কিছু নয় । সামনের চলনরাস্তার উল্টোদিকেই একটা পাঁচিলঘেরা বাগান আছে সামন্তদের । যত রাজ্যের আগাছায় ভরা । সেখান থেকে আসতেই পারে । কিন্তু এই ভরা বিকেলে ? কে জানে ! তবে এটাও ঠিক, ওরা তো আর মানুষের মতো সকাল বিকেল বোঝে না!

    কিছুক্ষণের মধ্যেই সাপটাকে আবিষ্কার করে ফেলল ওরা । এমন কিছু বিষধর সাপ নয় । এত মানুষের সাড়া পেয়ে ভয়েই আধমরা হয়ে গিয়েছিল । তবু নির্দয়ের মতো তাকে লাঠিপেটা করে মেরে ফেলা হল । সবাই বলাবলি করল, পোড়াতে হবে । নাহলে আবার বেঁচে যাবে ওটা । তাই কাগজ জ্বেলে রাস্তার ওপরেই সাপটাকে পুড়িয়ে ফেলা হল ।

    মঞ্জুলা এই পোড়ানোটা দেখতে পারেনি । তার আগেই ঘরে চলে এসেছিল । এসব ও দেখতে পারে না । সন্ধেবেলা টিভি দেখতে দেখতে ভাবছিল, কখন তপন অফিস থেকে ফিরবে, আর ও তাকে কান্ডটা শোনাবে ।

    রাত ন’টা নাগাদ তপন ফিরল । বলল, পেটটা ভার আছে, আজ আর খাবে না । একটু অবাকই হল মঞ্জুলা । এরকম তো খুব একটা করে না তপন ! যদিও গত মাসখানেক যাবৎ তপনের কিছু কিছু আচরণে মঞ্জুলা অবাক হচ্ছে । একটু যেন অন্যরকম, একটু যেন অস্বাভাবিক । কিন্তু রাত্রে খায়নি, এমন তো কখনও হয়নি !

    তপন বাথরুমে ঢুকতেই মঞ্জুলা তপনের ফোনটা হাতে তুলে নিল । পাসওয়ার্ড জানাই ছিল । খুলে এদিক ওদিক দেখতে দেখতেই একটা ঝাঁকি । হোয়াটস্‌অ্যাপে একটা মেসেজ । তপন বোধহয় উত্তেজনার মাথায় ডিলিট করতে ভুলে গেছে । মানসীর মেসেজ । তপনের অফিস কলিগ । আজ সন্ধের পর সাউথ সিটি মলে দেখা করার আমন্ত্রণ ।

    মঞ্জুলা ফোনটা হাতে নিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল । ওর মনে হচ্ছিল, পালেদের বাড়িতে নয়, একটা বিষধর সাপ ওর ঘরেই এসে ঢুকে পড়েছে ওর অলক্ষ্যে ।



No comments:

Post a Comment