Monday, May 31, 2021
প্রথম পাতা - মে সংখ্যা, ২০২১
Saturday, May 29, 2021
সম্পাদকীয় -
ব্লগটি পড়ুন, মতামত জানান, আগামী সংখ্যার জন্য লেখা পাঠান এই আহ্বান রাখি । অচিনপাখি পরিবারের পক্ষ থেকে সকলকে শুভেচ্ছা জানাই ।
সাহিত্যে থাকুন, সৃষ্টিতে থাকুন, সৃজনশীলতায় থাকুন
সুমন্ত কুন্ডু
অনলাইন সম্পাদক
* * * * *
সূচিপত্র
অচিনপাখি
ষষ্ঠ সংখ্যা, নবম বর্ষ, মে- ২০২১
কবিতা
পবিত্র সরকার * ভবানীপ্রসাদ মজুমদার * নির্মলেন্দু গুণ * কালীকৃষ্ণ গুহ * অসীম সাহা * দেবদাস আচার্য * তরুণ মুখোপাধ্যায় * মিলনকান্তি বিশ্বাস * হাননান আহসান * চৈতন্য দাশ * তৈমুর খান * গৌতম মুখোপাধ্যায় * বিষ্ণুপদ বালা * বিজয়া দেব * রবীন বসু * মৌমিতা দেসেনগুপ্ত * অমর চক্রবর্তী
ছড়া
জগদীশ মন্ডল * বদ্রীনাথ পাল * দীপক জানা * অষ্টপদ মালিক * সুজন দাশ * মানস দেব * কৃষ্ণ চন্দ্র সর্দার * স্বপন গায়েন * মৃত্যুঞ্জয় হালদার * রতন বসাক * প্রদীপ সামন্ত * সুপ্রকাশ আচার্য * দেবপ্রিয় হোড়
কবিতা
চিত্তরঞ্জন সাহা চিতু * আবদুস সালাম * দেবাশীষ মুখোপাধ্যায় * জয়ীতা চ্যাটার্জি * গৌতম হাজরা * দেবাশিষ পাল * দালান জাহান * সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় * সব্যসাচী পন্ডা
অণুগল্প
উপেক্ষিৎ শর্মা * প্রবোধ চন্দ্র দাস * স্বর্ণব দত্ত * শুভঙ্কর ঘোষ * অমিত কুমার জানা * শ্রেয়া বাগচি * রুচিরা দাস
কবিতা
অর্পিতা মান্না * দীপঙ্কর সরকার * তীর্থঙ্কর সুমিত * বদরুদ্দোজা শেখু * রথীন পার্থ মন্ডল * সর্বানী বন্দ্যোপাধ্যায় * অভিষেক ঘোষ * অভিনন্দন মাইতি * সজল সিনহা * সুমা আইচ হাজরা * লিপি মুখার্জী * উত্তম কুমার পুরকাইত * বিকাশ মন্ডল * নূরনেহার বেগম * হামিদুল ইসলাম * কৌশিক চক্রবর্তী * ইপ্সিতা বিশ্বাস * উদয়ন চক্রবর্তী * মহাসিজ মন্ডল * শরণ্যা মুখোপাধ্যায় * শ্যামাপ্রসাদ লাহা * দিলীপ পাল * শিবানী বাগচী * জ্যোতির্ময় শীল * কৃপাণ মৈত্র * রিয়া ভট্টাচার্য *
সম্পাদকত্রয়ীর লেখা
সুমন্ত কুন্ডু * মণিকা চক্রবর্তী * ধর্মেন্দ্র বিশ্বাস
লিমেরিক কবিতা - পবিত্র সরকার
দুটি লিমেরিক
শুভেচ্ছা
সাল-তারিখ তো ম্যাজিক জানে না--হোক না পয়লা, কী নববর্ষ ।
প্রার্থনা করে কিছুই মেলে না--ইচ্ছাপূরণ, কিংবা হর্ষ ।
পুরোনো বছর যেতে বা না-যেতে
তবু শুভেচ্ছা নিই মাথা পেতে ;
নতুন বছর যা করে করুক-- তৃপ্ত, ক্ষুণ্ন, মৃত, বিমর্ষ ।
দামি হয়
সূর্যটি ঢলে, আয়ু বেড়ে চলে, পুরোনো বছর নাগাল ছাড়ায় :
পরের প্রভাতে নব-বৎসর আলগোছে তার মুখটি বাড়ায় ।
সময়ের এই দৌড় ভীতিকর,
তবু জল চায় আমার শিকড়,
সঞ্চয় কমে, এ জীবন তাই প্রতিদিন তার মূল্য বাড়ায় ।
লিমেরিক - ভবানীপ্রসাদ মজুমদার
ঝিকমিক লিমেরিক
এক
বিদঘুটে এক বিজ্ঞানী, যার নিবাস এখন ইমফলে,
মাটিতে ডিম ফুটেই খোয়াব দেখেন গাছে ডিমফলে !
নিয়েই পাতা নিম-সিম-
খান তিনি রোজ হিমসিম
ভাত-রুটি নয়, দিন কাটে তার সিমবিচি আর নিমফলে !
দুই
স্বনামধন্য গবেষক এক থাকে জাপানের ওসাকায়,
ফল না খেয়ে দিনরাত রোজ শুধুই ফলের খোসা খায় !
দেখেই এসব দৃশ্য
বলে হেসে তার শিষ্য
ফলের চেয়েও বেশি ভিটামিন মেলে স্যার শাখা-প্রশাখায় !
কবিতা - নির্মলেন্দু গুণ
মুঠোফোন
পাগলী আমার ঘুমিয়ে পড়েছে,
মুঠোফোন তাই শান্ত ।
আমি রাত জেগে দিচ্ছি পাহারা
মুঠোফোনের এই প্রান্ত ।
আহা, পাগলী যদি তা জানতো !
আমিই দিই না জানতে ।
কবির প্রেম তো এরকমই হয়,
পান্তা ফুরোয় নুন আনতে ।
কবিতা - কালীকৃষ্ণ গুহ
অচেনা
একবছর আগে যে প্রশ্নগুলি করেছিলাম
সেই প্রশ্নগুলিই করলাম আবার ।
একই উত্তর পেলাম ।
প্রত্যাশিত সব উত্তর ।
সবাই বলল তাদের শরীরের ভালোমন্দের কথা
ছেলেমেয়েদের কথা
নিজের নিজের কর্মজীবনের কথা
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কথা ।
একই প্রশ্ন আবার কেন করলাম ?
এতদিনের চেনা মানুষজন সব, তবু
কেন তাদের অচেনা মনে হলো ?
নিজের অতীতকেও কেন যে মনে হয় আশ্চর্য,অচেনা !
চাঁদনি কেদারের এই রাত
নানা প্রশ্ন মনে আসে ।
আমাদের পুনর্মিলন ছিল একটি আবহমান নদীর ধারে ।
স্রোতের পাশে বসে কথা বলছিলাম আমরা ।
সেই উৎসব থেকে ফিরে এসে দেখেছিলাম
যুবকযুবতিরা নির্জন একটা রাস্তার ধারে বসে গান বাঁধছে ।
কৃতজ্ঞতা : বাংলাভাষা
কবিতা - অসীম সাহা
ইচ্ছে
ফুলের বনে ফুল ফুটেছে
ডাকছে গাছে পাখি
এমন দিনে ঘরের ভেতর
কেমন করে থাকি ?
মন ছুটে যায় মাঠ পেরিয়ে
অনেক দূরের দেশে
ইচ্ছে করে আকাশ জুড়ে
ডানায় থাকি ভেসে ।
ইচ্ছে করে যাই হয়ে যাই
রঙিন প্রজাপতি
ফুলের বনে হারিয়ে গেলে
হয় কি কোনো ক্ষতি ?
মন তো কোনো বাঁধ মানে না
মন ছুটে যায় দূরে
মনের পাখায় ভর করে তাই
এলাম বিশ্ব ঘুরে ।
কবিতা - দেবদাস আচার্য
চিরজাগ্রত আলো
আঁধার, আমি যা বুঝি
এক লুকানো আলোর
অহংকার
সেই অহংকারকে আমি
মনে-প্রাণে আলো করে
মিশিয়ে নিয়েছি
অন্ধকারেই ঘর সাজিয়েছি
আমার দেহ-মনের সব দরজা-জানালা খুলে
নিবিড় আঁধার ঢুকে যায়, আর
আমি অন্ধকারকেই
আলো বলে বরণ করেছি
আমার জীবনের আলোর রেখাগুলি
সেই অনিবার্য অহংকারে
দেখি, ভেসে যায়
ভেসে যায়
কৃতজ্ঞতা : বাংলাভাষা
কবিতা - তরুণ মুখোপাধ্যায়
যে তুমি নিরুত্তর
১.
কোথায় গিয়েছ তুমি নির্জন রাতে
নিরালা বারান্দায়
তোমাকে অচেনা, বিদেশিনী লাগে -
সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে তুমি সুদূরিকা
রাতের তারায় ভাসাও মন
শূন্য হাতে আমি ফিরি প্রেমের কাঙাল !
২.
নিঃঝুম সন্ধ্যায় একা ছাদে তুমি
সিলুয়েট ছবির মতন-
কতদূরে আছো ? কত কতদূরে ?
ছুঁতেও পারি না ।
কাকে চাও ? কাকে চাও একান্তে,
গোপনে, স্বপ্নে ?
আমার দুরাশা তোমার দরজায়
পড়ে আছে ধুলোমাখা
পাপোষের মতো !
কবিতা - মিলনকান্তি বিশ্বাস
যমুনায়
১
রাধাকৃষ্ণের প্রিয় যমুনায় -
ভেসে চলে যায় করোনার লাশ,
আধপোড়া কেউ, কেউ-বা আংশিক
চলছে সবাই শবযাত্রায় ।
২
ডোমেরা গিয়েছে কোয়ারিন্টাইনে
চুল্লিরা সব নিদ্রা মগন,
চারিদিকে শুধু মৃত্যুর মিছিল
কেউ নেই তাই শবদাহনে ।
৩
শবের এই ভাসান যাত্রার -
অবসান হোক এবার,
রাধাকৃষ্ণের প্রিয় যমুনা থেকে
উঠে আসুক জগন্নাথের নবকলেবর !
কবিতা - হাননান আহসান
খেদ
এই মেঠোপথ
এই বেড়াধার
এই ঘেঁটুফুল--গন্ধ চিনি
কতকাল সেই হুহু বাতাস
গায় মাখিনি গায় মাখিনি !
এই এঁদোপাড়
এই পুকুরের
এই পানাবন--কলমি চিনি
কতকাল সেই মনোহরণ
গায় মাখিনি গায় মাখিনি !
এই মেজো বউ
এই ঠাকুরাল
এই কাকিমার--সোহাগ চিনি
কতকাল সেই জমজমে রং
গায় মাখিনি গায় মাখিনি !
এই পাড়াগাঁয়
এই সবুজের
এই রাখালের গাইকে চিনি
কতকাল সেই উত্তেজনা
গায় মাখিনি গায় মাখিনি !
এই সোঁদাময়,
আদাড়বাদাড়
এই পরাপর সবাই চিনি
কেন যে ছাই এতাবৎকাল
গায় মাখিনি গায় মাখিনি !
কবিতা - চৈতন্য দাশ
মুখ
কোনো একদিন এক শুভক্ষণে
সাক্ষাতে পেয়েছিলাম এক শ্রীময়ী
মুখ,
যে মুখের পবিত্রতায় মুছে যায়
মনের আরশিতে প্রতিবিম্বিত শত
দুখ ।
সে মুখের ললিত অভিব্যক্তি
যেন বড়ো বংশ-ঘরানার
পরিচয়,
সে মুখ জানে দুঃখ-যন্ত্রণার
পাহাড়-শৃঙ্গ সড়ক করতে
জয় ।
সে মুখে ছিল না কুটিল মুখোশ
ছিল না জটিল ময়লা
কালো,
এমন মুখ যে চলার পথের
আঁধার সরিয়ে জ্বালায়
আলো ।
কবিতা - তৈমুর খান
নিশিবেলায়
পাখির মতো ক্লান্ত দিন
চলে যায়
যেতে যেতে ডাকে
ডাকার সংকেতে
নিভে যায় আলো
আঁধারের চুলগুলি জড়াই
প্রিয়ার মতন চোখেমুখে
কবিতা - গৌতম মুখোপাধ্যায়
অফুরান সংকল্পের ধ্বনি
ঝড়ের দিনে আমাকে পাশে পাবে, আমার অফুরান ধ্রুবমন ।
চিন্তার অন্ধকার জ্যোতিষ্ক দিন দিতে পারে না ।
অনেক প্রলয় আসবে আমাদের স্বপ্নের নীড়ে
অনেক সাধনায় প্রলেপ মুছে দেওয়ার আরদ্ধ বীজ,
অর্জন করতে হবে বিশ্বাসের প্রত্যয়ী পথে ।
আমি সংকল্পের গায়ে কৃতঘ্ন রক্ত বহন করতে শিখিনি ।
প্রতীজ্ঞা আমার ভীষ্মের মতো মেঘবাহ ।
হাত ধরো, মনে প্রত্যয়ী সকালের মৈত্রী আলো
জান্তব অরন্যপথে নীল প্রজাপতির নক্ষত্রজল ।
কবিতা - বিষ্ণুপদ বালা
প্রিয় ছেঁড়া গামছা
মা-বাবা, ভাই-বোন মিলে
পার্বতীর সংসার আমাদের ।
সবাই কিছু না কিছু করি-
লাল-নীল-সবুজ যুদ্ধ ।
শেষ নেই ইঁদুরের সাথে
চোখ রাঙানি বিনিময় ধানের গোলায় ।
মায়ের সঙ্গে বাবার, ভাইয়ের সঙ্গে দাদার
বোনের সঙ্গে দিদির মৌন অভিমান ।
তবে দারিদ্রবিদ্যুৎ যতই ঝলকাক
সকলের চোখ মুছি এক ছেঁড়া গামছায় ।
কবিতা - বিজয়া দেব
ঈশ্বরের কান্না
যে শিরাবহুল হাতটি এগিয়ে আসছে সামনের দিকে,
তার করতলে একটি দেশের মানচিত্র ।
যে আকাঙ্ক্ষিত হাতটি এগিয়ে এল সামনের দিকে,
তার করতলে শিকড় - উন্মূল
বৃক্ষের ছায়াচিত্র ।
যে ভিক্ষাজীবী হাতটি এগিয়ে আছে সামনের দিকে
তার করতলে আগুন - আভা,
হিংসাশ্রয়ীর রৌরবতান ।
হাত তো একটি নয়,
অনেক অনেক হাতের সমবায়ে যে হাতটি এগিয়ে আছে সামনের দিকে
তার করতলে বিভূতিভূষণের
আরণ্যক ছবি,
গুহামানবের তৈলচিত্র-
মহাশূন্যতার প্রতীকী আলোয়
তাকে চিনে নিতে ভুল হলো বলে দুঃখী ঈশ্বরের কান্না
আজ বৃষ্টিধারার ভেতর
একাকী ঝরে পড়ছে ।
কবিতা - রবীন বসু
অস্বাভাবিক
মেঘলা মেদুর দিন বিকেলের দিকে
চলে গেছে সোজা রাস্তা বহমানতায়
দু'পাশে সবুজ গাছ, ছায়া পাশটিতে
লিখে রাখে অন্যকিছু ভগ্ন মমতায় ।
সযত্ন আগ্রহ নিয়ে হাঁটে লোক হাটে
কেনাকাটা করে কিছু, কিছু ভুলে যায়
ফেরার তাড়াতে দ্রুত নেমে আসে মাঠে
যে বাড়ি গিয়েছে ছেড়ে ফিরতে সে চায় ।
কী স্মৃতি পিছনে আছে ? কত মহোৎসব
আয়োজন কাঁপে নাকি বেদনার ভার
যতটা গভীরকে খায়, তত পরাভব
সব আজ জড়ো হবে নদীটির পার ।
ওপারে অনন্ত আছে অদৃশ্য ম্যাজিক
কী খেলা দেখায় দেখি, সে অস্বাভাবিক ।
কবিতা - মৌমিতা দে সেনগুপ্ত
বিরহগাথা
কিছু চাওয়ার আগেই, দিয়েছিলে;
দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ -
কিছু বলার আগেই, বুঝেছিলে;
অথৈ ধারাপাত -
বিপুল জলরাশি হয়ে বুকে
আছড়ে পড়ার আগেই, রেখেছিলে;
তোমার একান্ত পাঁজরে ---
তারপরেও রাখা হল না
হাতের ওপর হাত !
Thursday, May 27, 2021
কবিতা - অমর চক্রবর্তী
জীবন-কথা
১
ফুলগুলি কুড়িয়ে নিলাম ধুলো থেকে
জীবন কে করবো সমর্পণ
হাত শূন্য হয়ে গেল দিতে দিতে
অন্তরঙ্গ হ'ল না আবাহন ।
আসলে কেউ হতে চায় না
দুঃখী মানুষের দূরের লন্ঠন....
আমার প্রত্যাশার আকাশ মেঘলা হয়ে আছে
আরও মেঘলা হতে থাকে !
২
কাথার মধ্যেই ফুল ছড়ানো আছে
খুঁজে নিন—
সে সুশ্রুষা-পত্র হাতে তুলে দেয়
আমি খুঁজতে খুঁজতে তাকে পেয়ে
ডাকি : সই, ও সই
সে দু'হাত বাড়ায় বৃক্ষ হয়ে জড়ায়
আমি বুক থেকে ফুলের গন্ধ পাই
তারপর দু'জনে বৃক্ষজন্ম কামনা করি ।
Wednesday, May 26, 2021
ছড়া - জগদীশ মন্ডল
ক্ষমতার কথা
কারো ক্ষমতা মানান সই
কারো দেখিয়ে দেবার,
কেউ ক্ষমতা কাজে লাগায়
দরিদ্র মানব সেবার ।
আবার কেউ ক্ষমতা দেখায়
অনেক বাহুবল,
অহংকারে পতন আনে
খারাপ ফলাফল ।
ক্ষমতা নেই কাজটি করার
দম্ভ আছে ভারি,
দেশের সেবা করলে যেনো
মহান হতে পারি ।
ক্ষমতা আছে সব জীবের
শক্তি নিজের মাঝে,
মুক্ত মনে সেই ক্ষমতাটি
লাগাই দশের কাজে ।
ক্ষমতা নিয়ে বড়াই নয়
অহং হোক দানে,
থাকবে টিকে সে সব কাজ যা
মানব কল্যানে ।
ছড়া - বদ্রীনাথ পাল
গাঁয়ের মাটি
যেইখানেতে আকাশ-মাটি করছে খেলা একসাথে -
শুকতারাটি গল্প করে মাটির সাথে ভোর রাতে -
বনপলাশীর পদাবলী রোজ দেখা যায় প্রান্তরে -
সে যে আমার গাঁয়ের মাটি, সুবাস মাখায় অন্তরে ।
শাপলা-শালুক ভরা দিঘি ঠিক যেখানে ঢেউ খেলে -
ফুলের বাগে ফুলকলিরা ঠিক যেখানে চোখ মেলে -
ভোরবেলাতে আজান শুনি, সন্ধ্যা হলেই শাঁখ বাজে -
সে যে আমার গাঁয়ের মাটি, মায়ের সমান সব কাজে ।
ছড়া - দীপক জানা
ফুলের মিনতি
কোন সে অচিনপাখি
ঘরের পাশে একটা গাছে
করছে ডাকাডাকি ।
চোখ চলে যায় গাছে ।
পাতার ফাঁকে ফুলের ঝাঁকে
জানলার খুব কাছে ।
ফুল যা বলে জানি ।
সেই ভাষাটাই বলে আমার
হৃদয়ের ধূপদানি ।
সুগন্ধ এক ওঠে ।
শান্তি ছাওয়া পবিত্রতায়
সুরের সে ফুল ফোটে ।
পাখি বসলে পরে
ফুল পাতারা একটু নুয়ে
খুব মিনতি করে -
পবিত্র সেই স্থানে
জীবানুর ঘায় ঝরল যারা
স্মরণ কোরো গানে ।
ছড়া - অষ্টপদ মালিক
কানাই মাস্টার
বিশ্বকবির সেই কবিতা
পড়েছি 'মাস্টার- বাবু'
বেড়ালছানা মানুষ হলো না
কানাই মাস্টার হলেন কাবু ।
বিড়ালছানা মানুষ হলে
কানাই মাস্টার হত খুশি
সহজাত স্বভাব তার
এমন সে দুষ্টু পুশি ।
আমাদেরও বেড়ালছানার মতো দশা
বাঁচার পথ নাই
মানুষ হবার আশিস বাণী
কবির কাছে চাই ।
ছড়া - সুজন দাশ
সুখ
সবাই তো চায় সুখি জীবন
সুখের ছোঁয়ায় বাঁচতে,
সেই প্রদীপের আলোর নীচে
খুশির নাচন নাচতে ।
সুখ হলো এক অচিন পাখি
কেমনে নাগাল পাইরে !
এই আসে সে এই চলে যায়
দৃষ্টি সীমার বাইরে ।
সুখ মনে হয় মরিচিকাই
কচুর পাতার জল যে,
ধরতে গেলে ফসকে বেরোয়
কেমনে যে পাই তল যে !
সুখের স্বপন মন কাননে
কল্পলোকের আয়না,
কালকে যেটাই সুখ ভেবেছি
আজকে তা আর চাই না ।
প্রয়োজনের তাগিদ এলেই
পাল্টে যে যায় রুপ তার !
সুখ না পেয়ে তাইতো আমিই
আর করি না মুখ ভার ।
ছড়া - মানস দেব
সতী
(ইতিহাসের ঘটনা অবলম্বনে রচিত )
রাজা ছেলের বিয়ে দেবেন
রাজ্যে পেটালেন ঢাক ;
পাত্রী চাই সৎ , সুন্দরী
অন্য কিছু নাই বা থাক ।
হাজারো মেয়ে আসলো ধেয়ে
সুন্দরীদের মেলা ;
কাকে তিনি বাছাই করবেন
লাগলো বেজায় ঝামেলা ।
বুদ্ধি করে সবার হাতে
দিলেন ফুলের বীজ ;
যে ফোটাবে সুন্দর ফুল
সেই হবে রাজপুত্রের নিজ ।
একমাস পারে সবাই আসলো ফিরে
নিয়ে সুন্দর ফুল ;
শুধু একটি মেয়ে আনেনি ফুল
এই ছিলো তার ভুল ।
দেখে সবাই অবাক হলেন
একি বোকা মেয়ে ;
রাজার ছেলে খুশি হয়ে
চেয়ে রয় তার দিকে ।
বীজগুলো সব সিদ্ধ ছিলো
সবই ছিলো মৃত ;
যে মেয়েটি ফুল আনেনি
সেই যে সতী প্রকৃত ।
ছড়া - কৃষ্ণ চন্দ্র সর্দার
চাষি
চাষি চলে মাঠের পানে
সাথে লাঙ্গল আছে,
চাষির বউ বলদ দু'টি
লয়ে তারই পিছে ।
আষাঢ় মাসে বৃষ্টি নামে
তৈরী ধানের চারা,
দিচ্ছে দোলা হাওয়াতে
খুশি পাগল পারা ।
নাওয়া খাওয়া ভুলেই যে
মাঠেই কাটবে দিন ,
চষবে মাটি দিয়েই হাল
বাজছে খুশির বিন ।
সারা বছর কাটবে সুখে
উঠলে সোনা ধান,
ভরবে গোলা সুসময়ে
এলেই সে অঘ্রাণ ।
মিলায় হাসি মহাজনের
খপ্পরে যে বাঁধা
চুকিয়ে দেনা সারা বছর
আবার দুঃখ সাধা ।
ছড়া - স্বপন গায়েন
ভরা কোটাল
পাল্টে গেছে জীবনের রঙ
পাল্টে গেছে বোধ
বোধনের গান গাইতে মানা
দেনা কবে হবে শোধ !
অসুস্থ পৃথিবীর কান্না শুনে
থমকে দাঁড়ায় চাঁদ
মানুষ নাকি নরকের কীট
পাতছে নানান ফাঁদ !
ফাঁদে এখন পড়েছে মানুষ
যারা পেতেছিল জাল
সেই জালেতে নিজেরাই আটকে
কেমন হয়েছে হাল !
সোনার হরিণ যায় না ধরা
সবই মায়ার খেলা
মুক্তির পথ জানি না কেউই
আসছে আঁধার বেলা ।
ভরা কোটাল জোয়ারের স্রোতে
ভেসেছে সুখের জীবন
চাঁদের কলঙ্ক মুছতে গিয়ে
লিখেছি নিজের মরণ ।
ছড়া - মৃত্যুঞ্জয় হালদার
কেউ দিল না দাম !
কেউ দিল না দাম
আমার কথার পাখি
একলা কেবল ডাকি
উড়লো সময় ধরে
পুড়লো একাই ঘরে
ঝরিয়ে দুঃখ ঘাম।
কেউ দিল না দাম
আমার চিঠির ভাষা
ইচ্ছে সকল আশা
মরলো আপন মনে
বন্দী ঘরের কোণে
বলল সবাই থাম।
কেউ দিল না দাম
আমার ছুটির কথা
শোরগোলে সেই যা তা
বাতিল ব্যথার বাণে
রুদ্ধশ্বাস প্রানে
উড়িয়ে দিলাম খাম।
ছড়া - রতন বসাক
মুক্তি চাই
মন বলে ভাসি জলে অশ্রু বহে ধারা
মোরে দেখে পাপ থেকে দিও যেন ছাড়া ।
পা'য়ে চুমি প্রভু তুমি ক্ষমা করো চাই
আমি হারা তুমি ছাড়া আর কেহ নাই ।
কভু সুখে কভু দুখে বয়ে যায় ক্ষণ
বসে ঘরে চিন্তা করে ভয়ে কাঁপে মন ।
কী যে করি কারে ধরি মনে চিন্তা বাড়ে
মুখ ঘুরে যায় দূরে বলি গিয়ে যারে ।
একা থাকি তম ডাকি শান্তি পেতে মনে
আমি জানি এও মানি সুখ নেই ধনে ।
জমা কথা বলে তথা মন হয় খালি
যারে দেখি সব মেকি যেন চোরা বালি ।
বই খুলে সব ভুলে কিছু পাতা পড়ি
বুঝে নিয়ে আগে গিয়ে মনটাকে গড়ি ।
সেই মতো যাই ততো কিছু আশা পাই
মোর মনে সব ক্ষণে যাহা আমি চাই ।
আয়ু বাড়ে মন হারে পাপগুলো ভেবে
দুখ ছায় মন চায় ক্ষমা করে দেবে ।
ব্যথা পাই মুক্তি নাই তুমি ছাড়া প্রভু
ফেলে দাও চলে যাও চেয়ে যাবো তবু ।
ছড়া - প্রদীপ সামন্ত
পানকৌড়ি
পানকৌড়ি ডানায় ভেজা নিঝুম দুপুর ডোবা
ভয় ডর নেই ডুবছে কেবল মা বাবা কি বোবা ?
একটুখানি জল ঘাটলেই ওধার থেকে চেঁচায়
নাক ফ্যাচফ্যাচ সর্দিকাশি লঙ্কাবাটা ছেঁচায় ।
হঠাৎ করে চ্যাঁক চ্যাঁকে গা জ্বর আসবে না'কি !
জলপট্টি দিতেই থাকে কাজ ফেলে সব কাকী ।
জানলা দিয়ে উদাস হয়ে তাকাই পুকুর ঘাটে
গল্প জুড়ে দিয়েছে সবে কাজ গিয়েছে লাটে ।
দেখছি দুটো পানকৌড়ি নামল আবার জলে
ডুবডুব ডুব ডুব সাঁতারে চললো জলের তলে ।
চমকে দেখি ঝাপটা দিয়ে উঠল জলে ভেসে
কামড়ে ঠোঁটে কি সাদা এক মাছ ধরল শেষে ।
ছড়া - সুপ্রকাশ আচার্য
আমার কথা
আমার আছে একটা পাহাড়, ছোট্ট নদী মহুলবন,
পলাশছায়া রুক্ষ মাটি, হাটবিলাসি দিন যাপন,
আমার আছে কেন্দুপাতা, বাবুই ঘাসের হাতছানি,
গেরুমাটি, খড় পোড়া রঙ, দেওয়াল জোড়া ফুলদানি ।
তপ্তদিনে গাছের ছায়ায়, পরিশ্রমের ঘাম শুকায়,
ভাঙা বাসা ভাঙবে কি আর, বৈশাখী ঝড় লজ্জা পায়,
বৃষ্টি আসে, কাঠের উনুন, মেঘগুলাকে গাল পাড়ে,
তবু রাখাল ঝুমুর শোনায়, বুনোফুলের আবদারে,
দুর্গাপূজা নেই বলে কি কাশফুল আর ফুটবেনা,
পদ্ম তুলে ভিনগাঁয়ে দেয়, ঢাকি মেটায় মা- র দেনা ।
ধান না হলে হয়না পরব, শীত কাটে তাই উৎসবে,
মূলনিবাসীর সুরের ধারা বইছে আপন গৌরবে,
শুধুই কি আর পলাশ ফোটে, কুসুমগাছের পাতাও লাল,
নাব্য তো নয় আমার নদী, ছৌ মুখোশের পালক পাল ।
ছড়া- দেবপ্রিয় হোড়
বোধ
মারণ খেলায় মেতেছে আজ প্রকৃতি,
না জানি কখন কার জীবনের ইতি ।
মাস্কবন্দী মুখ আর ঘরবন্দী জীবন,
বাসযোগ্য পৃথিবীর আশায় দিনযাপন ।
এবার পরিত্রাণ পেলে নাও শপথ,
পাল্টে নেবে জীবনধারণের গতিপথ ।
সব খেলারই আছে শুরু আর শেষ,
সকলে একত্রে লড়ো ভুলে বিদ্বেষ ।
কবিতা - চিত্তরঞ্জন সাহা চিতু
মে দিবসের ডাক
সাতান্ন সালের শিকাগো শহর নৃশংসতার নাম,
জীবন দিয়েছে কাতারে কাতারে জানাই লাল সালাম ।
আটঘন্টার ন্যায্য দাবিতে রাজপথ হয় লাল,
ইতিহাস হয়ে আজও তো আছে সাতা্ন্নর কালো সাল ।
সেদিনের সেই শকুনের দল মিছিলে চালায় গুলি,
শহীদ হলো এগারো শ্রমিক সেই দুঃখ কি ভুলি ।
বিচারের নামে প্রহসন করে ছ'জনের দেয় ফাঁসি,
স্তম্ভিত শ্রমিকের দল, হতবাক বিশ্ববাসি ।
লাল চক্ষু ভয় করেনি আগুন জ্বলেছে দেশে,
মাথানত করে শকুনের দল দাবি মানে তারা শেষে ।
সেদিন থেকে সারা বিশ্বে মে দিবসের ডাক,
খেটে খাওয়া লোক খাটুনির শেষে ন্যায্য পাওনা পাক ।
কবিতা - আবদুস সালাম
মে দিবসের চিত্র কল্প
লাল আগুন ছড়িয়ে আছে দিগন্ত থেকে দিগন্তে
শ্রমিক দিবসে আজ শ্রমিক হাসার দিন
শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা মঞ্চ কাঁপান
ঘনঘন শ্লোগান ওঠে মেদিবস জিন্দাবাদ
রাত খসে পড়ে রৌদ্রপুকুরে
তপ্ত জলে সিদ্দ হয় মানবিক মুখ
ইঁট ফাটা রোদে মিশে ঘামের গন্ধ
হৃৎপিণ্ড চিরে জমা রাখি ক্লেদ
নেতিবাচক প্রহসন জড়ো মঞ্চে
ক্রমশ হেঁটে চলেছি সমাধি প্রান্তরে
সময়ের কাছে রেখে যাবো সমাধিহৃদয়
বৌয়ের আঁচলে বেঁধে দিবো হেমলক বিষ
বহুজাতিক রান্না ঘরে কোনো আনাজপাতি নেই
থরে থরে সাজানো দেশিবিদেশী পানীয়
ইউনিয়নের নেতারা মসজিদ -মন্দিরে ঘটায় বিষ্ফোরণ
রণহুংকারে কেঁপে ওঠে মানবিক ভিত
পাড়ার মোড় থেকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায় শ্রমিকের লাশ
কবিতা - দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়
ইমনহীন অনুলেহ
বৃষ্টিনদীর পাড়ে আবার দেখা
সেই গালে টোল হাসি
আলুলায়িত কেশ
কপালে লাল টিপ
সিঁথির সিঁদুর শুধু প্রাক্তন ও বর্তমানের মাঝে দাঁড়িয়ে
না-বলা কথারা মুখর
তোমার প্রেমরাহিত্যের সংলাপে
চোখের তারায় বৈচিত্রের দাপাদাপি
বিবর্ণ মলিন শরীরে অনেক না-পাওয়ার ইতিহাস
বোঝা গেল তোমার বর্তমান
তোমারই অন্তর্লীন প্রশ্নে মুখর
সুখের লাগি তোমার উড়ান
আফশোষের অতল গহ্বরে
আমার প্রশ্নরা উঁকি দিলে
তোমার আনত চোখেই উত্তর
অধরা সুখের ঠিকানায় আলিপ্ত
একবুক বিষাক্ত বাতাস
কবিতা - জয়ীতা চ্যাটার্জী
আদর
আমার আদরের কোনো জন্ম নেই মৃত্যুও নেই তেমন,
এই ভালোবাসার আদর আমি শরীরে নিয়ে জন্মেছিলাম ।
এর কোনো ডাকনাম নেই, নেই কোনো ছদ্মনাম
আগুনকে আলো ভেবে ছুঁয়ে যায়, পুড়ে যায় আলোর আঁচে,
অন্ধকারে মিশে যায় আদর ।
শুধু তোমায় দেখা সহজ বলে তুমি আমার জন্ম কবচ ।
ভালোবাসাকে ভালোবেসে ধীরে ধীরে যাচ্ছি চলে
আমার আদরের কোনো জন্ম নেই, মৃত্যুও নেই বলে ।
কবিতা - গৌতম হাজরা
দাবানল
বনে নয়, দাবানল দেখি ওই গৃহস্থের কোণে
হানাহানি, দাপাদাপি, নিষ্ঠুর রক্তপাত
আরও কত কি যে
যা দেখে ভয়ে কাঁপে একই ধরিত্রীমা ।
চিরসবুজ দেশে এ কোন পতনের ক্ষতমুখ ?
হারিয়ে যাচ্ছে দেখি আমাদের জন্ম ইতিহাস
ঘাড়ের কাছে শুনি কারো যেন বেপরোয়া উল্লাস,
দিনান্তের বুকফাটা আর্তনাদ আর দীর্ঘশ্বাস ।
দাবানল, দাবানল, দাবানল
চতুর্দিকে দাউদাউ করে ওঠে বাতাস খলবলে
দূরে দাঁড়িয়ে দেখে একা মহাকাল
পালক জনমকে আজ বলো কিভাবে স্বভাবে ফেরাবে !
কবিতা - দেবাশিষ পাল
ইতি ইয়োকাস্তে
বুঝলাম তোমার ট্রাজেডি দৈববাণী ঘটিয়েছে ইয়োকাস্তে;
কিন্তু,
এতো ঘোর কলিকাল দৈব যে এখন দুর্দৈব ।
তবে কেন ? লালসার শ্যেনদৃষ্টি থেকে নিষ্কৃতি নেই,
চার থেকে চল্লিশ কিংবা আট থেকে আশির !
মৃত্যুর পর, উঁচু বেদীতে মাল্যদান,
মোমবাতি মিছিল, মাথা নিচু করে নীরবতা, আর !
মিনিট খানের ভাষণ ; ব্যস্ এটুকু ই?
নিচু মাথা কি উঁচু হবেনা ? চোখ কি ঝলসে উঠবে না ?
নাকি, সেই সোনার কাঁটায় সমাজের চোখও আজ অন্ধ !
অয়দিপাউস এর তবু তিন-ই ছিল: লজ্জা-ঘৃণা-ভয় ।
তাই, সে নিজেকেই করেছে অন্ধ ।
কিন্তু এখন ,যৌবনোদ্দীপ্ত দ্বিপদের তিন-ই লুপ্তপ্রায় ।
তাই আজ প্রয়োজন, মহাশ্বেতার সেই কৃষ্ণা 'দ্রৌপদী'র;
যাদের 'বানিয়ে আনা'র পরেও দেখে ভয় পাবে সমাজ।
মর্দিত স্তনের ধাক্কার সামনে দাঁড়াতেও ভয় পাবে,
সেনানায়কের মত এ সমাজের কু-পুরুষেরা।
হবে সন্ত্রস্ত, জুবুথুবু, জাড্যতা করবে গ্রাস, পাবে ভীষণ ভয় ঘটবে ইতি।।
কবিতা - দালান জাহান
জাল
নদীর নীরবতার ব্যাখ্যা জানেন দীপেন মাঝি
কিন্তু আমি অন্য কারণে
মোহন জেলের কাছে যাই ।
জালের মতো ছিদ্র চাদর গায়ে জড়িয়ে
মোহন আমাকে দেখায় তার ছেঁড়া-ফাঁড়া জাল ।
জলহীন মাছের জীবন সংসারে
ঠান্ডা বালিতে ঘুমায় জমাট অন্ধকার
গাঙের হাড়ভাঙা বাতাসে শুকায়
মোহন ভাবীর শীতল সীসার মতো শীত ।
মোহন বলেন, বাফে মরার আগে কয়ছিলো
"শীত আর জাল সেলাই করাই জেলেদের ধর্ম"
কিন্তু আমার মন চায়
কোদাল দিয়ে কুপিয়ে-কুপিয়ে
জালটাকে টুকরো টুকরো করে
হাঁটু জলে নেমে চিৎকার করে বলি
আমার কোন জাল নেই , আমার কোন শীত নেই ।
কবিতা - সৌমিত্র চট্টোপাধায়
সন্তুষ্টি
বিদ্ধ হয়ে আছে মেঘের আড়ালে, অপ্রাসঙ্গিক
রোগ শোক ক্ষয় ক্ষতি জীবনের সমৃদ্ধি
অন্তর্গত ক্ষোভ
মেঘনাদ নয়, স্থবির প্রকৃতি
এখানে ওখানে সম্মিলিত ভাবনা, প্রতিরোধ
মগজে অনুর্বর ধান বুনে যায় ক্লান্ত পদাতিক
অন্ধকারের পূর্বাভাষে আলো খোঁজে
তারই মাঝে সংশয়ে ঘেরা অবোধ নিয়মে
পরবশ
দুঃখপ্রধান ভালোবাসার নিভৃত প্রানে
বহন করে যাওয়া
স্বাদহীন আত্মরতি...
কবিতা - সব্যসাচী পন্ডা
রাই
তোমার ব্যস্ততার ভিতর ভরে দিই স্বল্পতম ভালোবাসা।
মরণের এ প্রান্তে যেটুকু ভালোলাগা ছিল,
চাওয়া ছিল যেটুকু
সব সাজিয়ে রাখি আসন্ন বর্ষার কুলুঙ্গিতে।
কোন এক চান্দ্রমাসে,
কুয়াশা ভেজা সমস্ত দিন পেরিয়ে
সব আলো নিভিয়ে...
চিরাচরিত চাঁদ সাক্ষী,
শরীরের সব ইমারত খুলে নির্জন চরাচরে
তারপর তোমায় ডেকে নেওয়ার পালা
আমার মন জোছনার কদম ফুলের ঘরে।
অণুগল্প - উপেক্ষিৎ শর্ম্মা
গল্প তৈরীর কারিগর
এক পত্রিকা সম্পাদক ঘোষণা করলেন, অমুক দিন প্রাতঃভ্রমণ পার্কে ভোরে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে কূয়াশা ঢাকা একটা ছায়ামূর্তি দেখতে পাওয়া যাবে। এই ছায়ামূর্তি নিয়ে একটা রহস্য অণুগল্প প্রতিযোগিতার জন্য লেখা আহ্বান করা হচ্ছে।
গল্প লেখার নেশায় সেদিন আমিও ভোর হবার আগেই সেই প্রাতঃভ্রমণ পার্কে হাজির। ভোরের আলো ফোটেনি তখনও। দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে কূয়াশা ভেদ করে একটা ছায়ামূর্তি ভেসে উঠছে। প্রচণ্ড আগ্রহ আর উত্তজনা নিয়ে ছায়ামূর্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। পেছনে হিসহিস হুমহুম আওয়াজ। ফিরে তাকালাম। গিজগিজ করছে মানুষ। বিভিন্ন চেহারার বিভিন্ন বয়সের মহিলাপুরুষ। গল্প লেখার ঝোঁকে বা আহ্লাদে জড়ো হয়েছে সবাই । শ’দুয়েক মানুষের একটা জটলা। ভোরের প্রাতঃভ্রমণ পার্ক গমগম করছে গল্প তৈরীর মৌতাতে। সকলেই উঁকিঝুকি মারছে, ‘দেখি, দেখি ছায়ামূর্তিটা। একটু দেখতে দিন না। আরে মাথাটা সরান না’
সকলেই উত্তেজিত। সকলেই রোমাঞ্চিত। দেখতে দেখতে কূয়াশা কেটে আকাশ পরিষ্কার হয়ে এল। সূর্য উঠল ঝকঝকিয়ে।
সকালের আলো ফুটতেই ছায়ামূর্তি উধাও। আস্তে আস্তে মানুষজনও ফাঁকা। সবাই চলে গেছে। এখন একটা বেঞ্চে বসে গল্পের প্লটটা একটু ঝালিয়ে নেব ভাবছি। পেছনে বেঞ্চে দেখি তখনও একজন মাঝবয়সী গল্পকার ঝিম মেরে বসে আছে। ঘুম জড়ান শুকনো মুখ, উদাস চাউনি, ঢিলেঢালা পাজামাপাঞ্জাবী, গায়ে একটা বড় চাদর, রোগা আর ফর্সা। পাশে বসতেই ভারি এবং ভরাট গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
- গল্পের খোঁজে ?
- হ্যাঁ । আপনি ?
- আমিও। কাল রাত থেকে জেগে বসে আছি ।
- কেন ?
- ওই ছায়ামূর্তিটার রহস্য জানতে ।
- জানতে পারলেন ?
- হ্যাঁ পেরেছি ।
- রহস্যটা কী মশাই ?
- ওটা কোন ছায়ামূর্তিই নয় ।
- তাহলে, তাহলে ওটা কী ?
- ওটা, ওটা আমাদের সম্পাদক, গল্প তৈরীর কারিগর…
অণুগল্প - প্রবোধ চন্দ্র দাস
রোজগেরে গিন্নী
এক ভদ্রমহিলার শখ হল তার নিজের একটা হাতে আঁকা ছবি (পোট্রেট ) তৈরী করাবেন। বেশ খোঁজাখুঁজি করে খবরের কাগজএর বিজ্ঞাপন দেখে একজন নামকরা চিত্র-শিল্পীর কাছে গিয়ে হাজির হলেন। তিনি শিল্পীকে বললেন যে, পোট্রেটে যেন তার গলাতে একটা সুন্দর হীরের নেকলেস এঁকে দেন, (যদিও ওনার গলায় কোন হার বা নেকলেস ছিলো না )।
চিত্রশিল্পী কৌতুহলী হয়ে কারন জিজ্ঞেস করাতে ভদ্রমহিলা তার নেকলেশ আঁকানোর কারণটি স্পষ্ট করে ব্যক্ত করেন । ভদ্রমহিলার উত্তর শুনে চিত্রশিল্পী অবাক হয়ে যান ।
ভদ্রমহিলা বললেন ;
— যদি আমি মারা যাই, আমার স্বামী আবার অবশ্যই বিয়ে করবে, এটা আমি একশো শতাংশ অবধারিত বলতে পারি।
তার নতুন বউ যখন ফটোতে আমার ছবিটা দেখবে, নিশ্চই তার মনে প্রশ্ন জাগবে যে ঐ নেকলেসটা কোথায় গেলো ? সে তখন ওটা খুঁজতে যাবে। গোটা বাড়ি তোলপাড় করে ফেলবে। আলমারি, বাক্স, এমনকি লকারও চেক করতে যাবে। কোথায়ও খুঁজে না পেয়ে স্বামীকে জবাব্দিহি চাইবে, নেকলেসটা কোথায় ?
আমার স্বামী আর তার নতুন বৌয়ের মধ্যে এই নিয়ে তুমুল বাক বিতন্ডা বাধবে। আর তখনই আমার আত্মা একটু একটু করে শান্তি পেতে থাকবে।
আমি এত ঘুরে ঘুরে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করি সংসারের জন্য, আর উনি শুধু আমার পেছনে লেগে থাকে আর টিপ্পনি করা ওর বরাবরের স্বভাব। এবার বুঝবে কত ধানে কত চাল।
— এই চালটা হলো আমার অন্তিম চাল, মতলব- কিস্তিমাত্ ।

