Wednesday, May 26, 2021

অণুগল্প - স্বর্নব দত্ত


 আমড়ার আঁটির পুতুল


    গতবারের বসন্তে গিয়েছিলাম বোলপুরের বিখ্যাত সোনাঝুড়ির হাটে, বিকাল তখন সাড়ে পাঁচটা, যেন অন্য জগৎ, অন্য অভিজ্ঞতা, যত দূর চোখ পড়ে শুধু ফাঁকা মাঠ । তার মাঝে দাড়িয়ে রয়েছে সহস্র সোনাঝুড়ি গাছ । লালমাটির দেশ সেজে উঠেছে নানান রঙের বাহারে ।চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছে হাট। নানারকম হাতের কাজের জিনিষপত্রের ভিড়। কোথাও ভিড় জমিয়েছে বাউলের দল তাদের প্রশান্ত কণ্ঠস্বর, একতারার সুর আর মন ভালো করা গানে যেন ফিরে পায় বাংলাদেশের মাটির গন্ধ। 

    আমি পাগলের মত একবার এদিক আবার ওদিক ছুটে যাই কিন্তু যতই দেখি মন যেন ভরে না। জীবনে আমার প্রথম রবীন্দ্রনাথের ভূমি দর্শন। মাদলের সুরে আদিবাসী নারীদের নৃত্য পরিবেশন যেন কবি ভাষায় জন্ম জন্মতরে ভুলিব না। মনে মনে প্রশ্ন করলাম কোথায় ছিলাম এত দিন ? এই প্রকৃতি - মানুষের মিলনক্ষেত্র কোন তীর্থস্থানের চেয়ে কম নয়, অনুভূতিগুলো যেন মনকে নাড়া দিয়ে ওঠে। কি করে যে বিকালটা পেরিয়ে সন্ধে নামতে শুরু করলো বুঝতেই পারলাম না। আস্তে আস্তে কোলাহল কমে এল,বাউলের দলের তখন বাড়ী ফেরার পালা।  সেইদিনের মত বিদায় জানাল অধিবাসীদের দলও,পসারীরা তখন শেষ মুহূর্তের ব্যাস্ততায়। 

    হটাৎ কেউ যেন পিছন থেকে আমার হাত ধরে টানলো, আমি চমকে গিয়ে ঘুরে অবাক হলাম, বছর সাতেকের একটা মেয়ে আমার হাতটা টেনে সুর করে বলল, "দশটা টাকা দাও না, একটা পুতুল নাও না",

    কেমন যেন মায়া হলো মেয়েটার উপর। আমি পকেট থেকে কুড়ি টাকা বের করে বললাম     "ঠিক আছে আমাকে দুটো পুতুল দাও"

    মেয়েটা আমার দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষন, তারপর থলি থেকে দুটো পুতুল বের করে আমার হাতে দিল। হাতে নিয়ে দেখলাম দুটোপাখি। 

    জিজ্ঞেস করলাম "এইগুলো তুই বানিয়েছিস ?"

    মেয়েটা ঘাড় নেড়ে বলল, "হ্যাঁ, এইগুলো আমি বানিয়েছি,আমার মা আমাকে শিখিয়েছে" 

    আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, "তাহলে বল তো দেখি, এই পুতুলগুলো কি দিয়ে বানানো ?", 

    মেয়েটার উত্তরে বেশ অবাক হলাম, সে বলল "আমড়ার আঁটি দিয়ে"

     আমি জিজ্ঞেস করলাম, তার বাড়ী কোথায় ?' 

    দূরে আঙুল দেখিয়ে বলল "ওই দিকে আমার বাড়ী "এই বলে ছুটে চলে গেল।

    আমি অন্ধকারে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারলাম মেয়েটা ঠিক বলেছে, এটা তো সত্যিই আমড়ার আঁটি দিয়েই বানানো । জিনিসটা দেখতে ভারি সুন্দর, মনে মনে ভাবলাম আর কয়েকটা নিলে ভালো হত, ঠিক এই ভেবে পিছনে ঘুরে দেখি মেয়েটা তার দলবল নিয়ে অনেক দূরে চলে গেছে । আমিও তার পিছনে ছুটে যাব ভাব্লাম কিন্তু সোনাঝুরির অন্ধকারে মেয়েটি ততক্ষণে চখের আরালে হারিয়ে গেছে । কিছুটা এগিয়ে গিয়েও ফিরে এলাম । অন্ধকার নামছে ভুবনডাঙ্গার মাঠে । 

    অন্ধকারে কি একটা চোখে পড়ল, মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে দেখলাম, সেই আমড়ার আঁটির একটা পুতুল পড়ে আছে মাটিতে। হয়তো মেয়েটার থলি থেকে পড়ে গিয়েছে । আমি সেটা যত্নসহকারে তুলে নিয়েছিলাম । মনে মনে সেইদিন ভেবেছিলাম সত্যিই হয়তো প্রকৃতির সাথে দেখা হয়েছিল আমার, কারণ ভালোবেসে যেটা চেয়েছিলাম, সেটাই সেইদিন ফিরে পেয়েছিলাম। আজও পুতুলগুলো আমি আমার বইয়ের আলমারিতে রাখা আছে, আর অনুভূতিগুলো মনের আলমারিতে ।




No comments:

Post a Comment