শহরের ইতিকথা
তখন নতুন নতুন চাকরি । হোক না কম মাইনের । এটাই যেন ধেড়ে বয়সের পাখনা । আজন্ম মফস্বলে থাকা মেয়ের বাইরে বেরনোর সময় । চোখ মেলে দেখার সময় কিভাবে জানার বাইরে অজানারা থাকে । তারপর জানার এক্তিয়ারে ঢুকে আরো কিছু অজানার সৃষ্টি করে।
বাড়ীর বাইরে, নতুন শহরে, নতুন মানুষের মাঝে, নতুন বিছানায় দিব্যি ঘুম আসতো। আসলে, আমার কাছে বাড়ী মানে কেবলই একটা চেনা দালান, চেনা গন্ধ আর জন্ম থেকে দেখে আসা মানুষগুলো নয়। তখন আর অ্যালার্ম লাগত না, বাথরুম ধরার তাড়নাই ঘুম ভাঙিয়ে দিত। অফিস যেতাম। রোবট সাজার অভিনয় করে যেতাম সারাটা দিন শুধু সন্ধে হবার আশায়। মাঝখানের একটা ছোট্ট সময় প্রাণভরে দেখে নেওয়া বিগ সিটির ছোটছোট জীবনযাপন। অফিসের বাইরের ঝালমুড়ি কাকার সাথে স্কুলের চটপটি দাদুকে আলাদা করতে পারতাম না। দুজনেই একই রকম ভাবে লাল গামছা দিয়ে ঘাম মুছে মিষ্টি করে হেসে হাতে তুলে দিত। পেয়ারাওয়ালার ছেলের ক্লাসে ওঠার গল্পটাও যেন অনেকবার শোনা। আসল শহর শুরু হত রাত নটার পর। স্যালারি পেয়ে যেদিন সেজেগুজে বড় রেস্তোরাঁয় ঢুকতাম, সেদিন। সেখানে পান থেকে চুন খসতেই দিত না কেউ। তখন আমিই রাজা। সুস্বাদু চেলো কাবাব খাবার পরও যদি ওয়াক্ থু করে উগড়ে দিতাম সেই বড় শহর মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকতো আমার সামনে। অথচ, ভেতর ভেতর চলত ফুচকাওয়ালা রাজুদার গল্প, পেয়ারাদাদার ছেলের অংক ক্লাস। আমিও সুযোগ বুঝে ওপরটায় চাপিয়ে নিতাম ম্যাচিং জামার সাথে জাঙ্ক জুয়েলারি। তারপর, মাসের শেষে ওড়নার আড়ালে মুছে নিতাম রোবটের যন্ত্রণা।
বুঝলাম গ্রামে গঞ্জে শহরে, কোত্থাও মানুষ থাকে না। সময় ভেদে মানুষই হয়ে ওঠে এক একটা গ্রাম বা শহর। কখন ভেতর ভেতর সবুজ হয়ে উঠবো আর কখন একটা কংক্রিটের মোড়া খটখটে রাস্তা সেই তফাৎ বুঝতে বুঝতেই শহর আমায় ভুলে গেল, আমি ভুললাম না ।
তিনটে বছর পেরিয়ে গেল, শহর আমার ভেতরে বাড়ে আমার প্রিয় মফস্বলের হাত ধরে। আজ আমার শহরে এসেছে মহামারী, ছেড়ে আসা বিগসিটিতে দামামা বাজছে যুদ্ধের। মহামারী আর যুদ্ধে মধ্যে কোন তফাৎ নেই, যেমন তফাৎ ছিল না পেয়ারাওলার ছেলে আর আমার পাড়ার রাজুদার ।
Lekhika ke dhonyobad erokom ekta sundor lekha upohar deoar jonno.
ReplyDelete